স্বাস্থ্যসাথী নিয়ে ‘দুর্নীতি’র তদন্ত হচ্ছে বলে আগেই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানালেন, কয়েক দিন ধরে বেনামি চিঠি পাচ্ছেন তিনি। প্রায় সমস্ত প্রেরকের একই অভিযোগ— স্বাস্থ্যসাথীতে দুর্নীতি হয়েছে। ওই সমস্ত চিঠি থেকে প্রাপ্ত তথ্য খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
শারদ্বত দাবি করেছেন, স্বাস্থ্যসাথীর ‘কেলেঙ্কারি’ নিয়ে মুখ খুলতে চেয়ে তাঁকে চিঠি দিয়েছেন রাজ্যের একাধিক নার্সিংহোমের মালিক। বিষয়টি গুরত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের ঘোষণা করেছিল রাজ্যের পূর্বতন সরকার। সেই বছরের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন প্রকল্পের। ২০২০ সাল থেকে রাজ্যের সমস্ত পরিবারের জন্য সর্বজনীন ভাবে ঘোষণা করা হয় প্রকল্পটি। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রত্যেক পরিবারকে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস (নগদহীন) চিকিৎসা বিমার সুবিধা প্রদান করা হত।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু হয়েছে রাজ্যে। আগে যাঁরা স্বাস্থ্যসাথীর সুবিধা পেতেন, তাঁরা সকলে (যোগ্য প্রাপক) কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পাবেন বলে ঘোষণা করে সরকার। শুরু হয় অডিট। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, অডিট করতে গিয়ে প্রচুর ভুয়ো কার্ড এবং ভুয়ো উপভোক্তার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এমন অনিয়মে কিছু সংস্থার যোগসাজশও থাকতে পারে বলে তাঁর ঘোর সন্দেহ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ-ও জানান, ভুয়ো চিকিৎসক, জাল সই, ভুয়ো রিপোর্ট এবং ভুয়ো কার্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের টাকা লেনদেন হয়েছে। ওই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ লক্ষ উপভোক্তার নাম জড়িত থাকতে পারে এবং আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলেও জানিয়েছিলেন শারদ্বত।
আরও পড়ুন:
সেই স্বাস্থ্যসাথী প্রসঙ্গেই রবিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘দুর্নীতি নিয়ে প্রাথমিক তদন্তের রিপোর্ট আমাদের কাছে এসেছে। এখন এই তদন্ত হওয়ার পর বহু জায়গা থেকে বহু নার্সিংহোমের মালিক, বহু উপভোক্তা আমাকে বেনামি চিঠি লেখা শুরু করেছেন। আজই আমি আমার বাড়ির ঠিকানায় দুটো চিঠি পেয়েছি। তাঁরা সবাই বলছেন, স্বাস্থ্যসাথীতে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি হয়েছে। তার প্রমাণ তাঁদের কাছে আছে।’’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক তদন্তের রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্যসাথীর সুবিধা নিয়েছেন বহু ভুয়ো উপভোক্তা। তাঁর কথায়, ‘‘রোগ ভুয়ো, রোগী ভুয়ো। হাসপাতালের বিল ভুয়ো। যাঁরা ধরা পড়েছেন, তাঁদের শো কজ় করা হয়েছে। থার্ড পার্টি ইনসিওরেন্স সংস্থাগুলিকেও শো কজ় করা হয়েছে। শো কজ়ের জবাবে আমরা সন্তুষ্ট নই। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
আরও পড়ুন:
বেনামি চিঠি যাঁরা পাঠিয়েছেন তাঁদের কী করে ধরা সম্ভব হবে? মন্ত্রী বলেন, ‘‘তাঁরা আসলে নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাইছেন না। কিন্তু চিঠিতে যে তথ্য দিয়েছেন তা ঠিক কি না, যাচাই করা হবে।’’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ব্রিটিশ জমানাতেও এ ভাবেই খবর যেত। তখন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ধরিয়ে দেওয়া হত।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করতে কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। তারা স্বাস্থ্যসাথী নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগেরও তদন্ত করছে। কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হবে।