নদিয়ার দ্বিজেন্দ্রলাল কলেজের অধ্যক্ষ বাণীব্রত গোস্বামীর বিরুদ্ধে আর্থিক তছরুপের অভিযোগে সরব পড়ুয়ারা। বুধবার সকালে কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ দেখালেন তাঁরা। বাণীব্রতের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে আগেই তদন্ত শুরু হয়েছিল। সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনার দাবিতে বুধবারের বিক্ষোভ। পড়ুয়াদের একাংশের দাবি, কলেজের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপের জন্য ওই রিপোর্ট প্রকাশ করা জরুরি। না হলে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।
কলেজ সূত্রে দাবি, ২৯ মাস কৃষ্ণনগরের ওই কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন বাণীব্রত। এই সময়ের মধ্যে ঢালাও দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ। একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পড়ুয়াদের দাবি, স্কলারশিপের জন্যেও টাকা চাইতেন অধ্যক্ষ। কলেজে একাধিক নির্মাণকাজ হয়েছে তাঁর অনুমোদনে, নির্দিষ্ট টেন্ডার ছাড়াই! ওই কলেজের ৩৫ জন অধ্যাপকের মধ্যে ৩৩ জনই বাণীব্রতের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিলেন এবং গভর্নিং বডির কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তার ভিত্তিতে অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে ছুটিতে পাঠানো হয়। অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখার জন্য গত মার্চ মাসে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে গভর্নিং বডি। তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি, আইনি কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞেরা ছিলেন। তাঁরা রিপোর্ট জমা দিয়ে দিলেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এখনও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে অভিযোগ। তা নিয়েই এ বার পথে নামলেন বিক্ষুব্ধ পড়ুয়ারা। কেন রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না, প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:
অভিযোগ, ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ দেওয়ার নতুন নিয়ম তৈরি করেছিলেন অধ্যক্ষ। জানিয়েছিলেন, যাঁদের উপস্থিতির হার কম, তাঁদের সরকারি স্কলারশিপ পেতে হলে কলেজে ২০০০ টাকা দান করতে হবে। এ নিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে পড়ুয়াদের ক্ষোভ রয়েছে।
ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বুধবার সকাল থেকে উত্তেজনা ছড়ায় দ্বিজেন্দ্রলাল কলেজের সামনে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ প্রস্তুত ছিল। তাই বড় কোনও অশান্তি হয়নি। কেন এখনও রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না? বাণীব্রতের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিশনের অন্যতম সদস্য অলোককুমার ঘোষ বলেন, ‘‘গত মার্চ মাসে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আমাদের লক্ষ্য ছিল অগস্টে রিপোর্ট দিয়ে দেওয়া। নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। রিপোর্ট আমরা সেপ্টেম্বরে জমা দিয়েছি। এখন তা গভর্নিং বডির প্রেসিডেন্ট তথা কৃষ্ণনগর উত্তরের বিজেপি বিধায়ক তারক চট্টোপাধ্যায়ের কাছে রয়েছে। বাকি কথা উনি বলতে পারবেন।’’ তারক আবার জানিয়েছেন, রিপোর্ট পেলেও তা তিনি এখনও খুলেই দেখেননি। তাঁর কথায়, ‘‘আগের সরকারের আমলে বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছিল। তার ভিত্তিতে কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের রিপোর্ট উচ্চশিক্ষা দফতরে জমা পড়বে। তারা সব দিক খতিয়ে দেখে তাদের সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয়কে জানাবে। সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ হবে।’’
বাণীব্রতকে ছুটিতে পাঠানোর পর আপাতত দ্বিজেন্দ্রলাল কলেজের ভারপ্রাপ্ত টিচার ইন-চার্জ অর্চন নন্দী। অভিযোগকারী ৩৩ জন অধ্যাপকের মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি বলেছেন, ‘‘বাণীব্রত গোস্বামী কলেজের মধ্যে অনেক আর্থিক দুর্নীতি করছেন। শিক্ষকদের অসম্মান করেছেন। পড়ুয়াদের আর্থিক ভাবে শোষণ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের পরে এখনও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উনি কলেজের মধ্যে বেডরুম বানিয়ে রেখেছিলেন। সেখানে কী করতেন, আমরা কোনও দিন জানতে পারিনি। বিষয়টা নিয়ে অভিযোগ জানানো হলেও কিছু হয়নি। ২৯ মাসে তিন কোটি টাকার নির্মাণ করেছেন উনি। কিন্তু কোনও নিয়ম মানা হয়নি। নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় টেন্ডারও ডাকা হয়নি। আমরা প্রতিবাদ করলেও আমাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয়।’’
স্কলারশিপের জন্য টাকা তোলার পাশাপাশি অন্য কলেজ থেকে পড়ুয়ারা পরীক্ষা দিতে এলে তাঁদের থেকেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বাণীব্রতের বিরুদ্ধে। অর্চনের কথায়, ‘‘অন্য কলেজের পড়ুয়ারা পরীক্ষা দিতে এলে তাঁদের কারও কারও থেকে নির্দিষ্ট টাকা নিয়ে আলাদা ঘরে বসিয়ে পরীক্ষার বন্দোবস্ত করে দিতেন উনি।’’ বাণীব্রত আবার ফিরে আসতে পারেন, আশঙ্কায় অধ্যাপকেরা। অর্চনের বক্তব্য, ‘‘তদন্ত কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছে, সেই রিপোর্ট আমরা অভিযোগকারীরা হাতে পাইনি। আমরা ভয় পাচ্ছি উনি আবার ফিরে আসতে পারেন। এমন দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ যেন আর ফিরে না আসেন।’’ বাণীব্রতের সঙ্গেও এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি কিছু বলতে চাননি। প্রশ্ন শুনে কেবল বলেন, ‘‘আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না।’’