Advertisement
E-Paper

জেলা পরিষদের ভোটাভুটিতেও ‘রিসর্ট’ রাজনীতি! কংগ্রেসের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ভেস্তে দিয়ে মালদহে বোর্ড গঠন বিজেপির

মঙ্গলবার সভাধিপতি হিসেবে দীপিকা বালার নাম প্রস্তাব করে বিজেপি। ৩০ জন বোর্ড গঠনে সভায় উপস্থিত ছিলেন। দীপিকার নাম প্রস্তাবিত হতেই তৃণমূলের একটা অংশ বিজেপি-কে সমর্থন দেয়।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:৩৯
BJP captures Malda Zilla Parishad with TMC\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\'s support

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

জেলা পরিষদ কার দখলে থাকবে, তা নিয়ে একপ্রস্ত ‘নাটক’ মঞ্চস্থ হল মালদহে। ‘রিসর্ট’ রাজনীতি ঢুকে পড়ল জেলা পরিষদের বোড গঠনেও। কংগ্রেসের সাজানো ছক ভেস্তে দিয়ে মালদহ জেলা পরিষদের দখল নিল বিজেপি। সৌজন্যে তৃণমূলেরই একাংশের সমর্থন।

বিগত কয়েক বছর জাতীয় স্তরে বার বার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ‘রিসর্ট’ রাজনীতি। গড় আগলাতে বার বার দলীয় সদস্যদের ভিন্‌রাজ্যের রিসর্টে নিয়ে তুলেছে কংগ্রেস। সেখানে হাজির হয়েছে পুলিশ। পুলিশের বিরুদ্ধে ‘হুমকি’ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। দলে ভাঙন আটকাতে বিজেপির ‘নাগাল’ থেকে নিজেদের দলের প্রার্থী বা সদস্যদের দূরে রাখতে চেয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু শেষপর্যন্ত কংগ্রেসের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। কংগ্রেসের প্রত্যাশা ভেস্তে দিয়ে পদ্ম ফোটায় বিজেপি। মালদহেও একই ছবি দেখা গেল। অনাস্থা প্রস্তাব, সদস্যদের ভিন্‌রাজ্যে নিয়ে গিয়ে রিসর্টে রাখা, সেখানে পুলিশের হানা, শেষে ভোটাভুটির দিন ভোলবদল!

ঘটনার সূত্রপাত গত জুনে। তৃণমূলের জেলা পরিষদের সভাধিপতি লিপিকা বর্মন ঘোষ এবং সহ-সভাধিপতি আবু তৈয়ব রফিকুল হোসেনের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনেন দলেরই ১৯ জন সদস্য। অনাস্থা প্রস্তাবে সমর্থন দেন কংগ্রেসের পাঁচ সদস্য। ৪৩ আসনের মালদহ জেলা পরিষদে বিজেপির সদস্যসংখ্যা ছিল চার। রাজ্যে পালাবদলের পর দলে ভাঙন শুরু হলে তৃণমূলই কয়েক ভাগে ভেঙে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই শিবির ছাড়াও জেলাভিত্তিকও অনেক ছোট ছোট সমীকরণ তৈরি হয়। ফলে কে মালদহ জেলা পরিষদের সভাধিপতি এবং সহ-সভাধিপতি হবেন, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

কংগ্রেস এবং বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল ওই অনাস্থা প্রস্তাবে। অভিযোগ, নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনাস্থা পরবর্তী তলবি সভা ডাকতে গ়়ড়িমসি করে প্রশাসন। সেই অভিযোগ তুলে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় কংগ্রেস এবং বিক্ষুব্ধ তৃণমূল। আদালত প্রশাসনিক কর্তাদের তলবি সভা ডাকার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ মেনে স্থানীয় প্রশাসন তলবি সভার দিনক্ষণ ঠিক করে। নাটকীয় ভাবে সেই সভার দু’দিন আগে সভাধিপতি এবং সহ-সভাধিপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন লিপিকা, রফিকুল। পদত্যাগের ফলে তলবি সভা আটকে যায়। সেই জটিলতায় আবার আদালতের দ্বারস্থ হন অনাস্থা প্রস্তাবের সমর্থকেরা।

আদালত এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে। সভাধিপতি, সহ-সভাধিপতি নির্বাচনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে জেলা ডিভিশনাল কমিশনারকে নির্দেশ দেয় আদালত। শান্তিপূর্ণ ভাবে বৈঠক যাতে হয়, সে বিষয়ে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, সকল সদস্য যাতে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করার নির্দেশও ছিল আদালতের। সেই মতো মঙ্গলবার জেলা পরিষদে ভোটাভুটি ছিল।

বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সদস্যদের নিয়ে মালদহের জেলা পরিষদ নিজেদের দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে কংগ্রেস। মোট ২৪ জন সদস্যকে মালদহ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ঝাড়খণ্ডে। সেখানে পাকুড়ের এক রিসর্টে রাখা হয় তাঁদের। গত ৩ অক্টোবর সেখানে পুলিশি অভিযান হয়। কংগ্রেস চেয়েছিল ২৪ জন সদস্যের সমর্থনে বোর্ড গঠন করতে। সভাধিপতি পদটি মহিলা সংরক্ষিত। কংগ্রেস এবং বিক্ষুব্ধ তৃণমূল চেয়েছিল সাগরিকা সরকারকে সভাধিপতি পদে বসাতে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে ২৪ জনকে নিয়ে ‘ছক’ তৈরি করেছিল জেলা কংগ্রেস। পুরো ‘অপারেশন’টি তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন কংগ্রেসনেত্রী মৌসম বেনজির নুর। কংগ্রেস ঠিক করেছিল বোর্ড গঠনের দিন ২৪ জনকে নিয়ে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করবে।

তবে কংগ্রেসের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় বোর্ড গঠনের আগেই। সোমবার গভীর রাতে ট্রেনে করে ওই ২৪ জনকে নিয়ে মালদহে যান কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরী। তবে ট্রেন মালদহ স্টেশনে ঢুকতেই বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের তিন সদস্য— শামসুল হক, ফজলু হক এবং রফিউল ইসলামকে আটক করে পুলিশ। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার হিসাবে ধাক্কা খায় কংগ্রেস এবং বিক্ষুব্ধ তৃণমূল শিবির। নতুন করে রণনীতি তৈরি হয়। কংগ্রেসের অভিযোগ, সুষ্ঠু ভাবে সব সদস্যেরা যাতে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। তবে পুলিশ কোনও কারণ না-দেখিয়েই আটক করছে। বিক্ষোভ দেখায় কংগ্রেস। তবে তার মধ্যেই মঙ্গলবারের ভোটপর্ব শুরু হয়ে যায়।

মঙ্গলবার সভাধিপতি হিসেবে দীপিকা বালার নাম প্রস্তাব করে বিজেপি। ৩০ জন বোর্ড গঠনের সভায় উপস্থিত ছিলেন। দীপিকার নাম প্রস্তাব হতেই লিপিকা শিবির বিজেপিকে সমর্থন দেয়। তার পরেই সভা বয়কট করে কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছে। শাসকদল বিজেপির ইশারায় বেআইনি কাজ করেছে বলেও অভিযোগ। কংগ্রেস বয়কট করতেই ঘুরে যান বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের সদস্যেরাও। মঙ্গলবারের সভায় উপস্থিত থাকা বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের সদস্যেরা বিজেপি-কে সমর্থন জানান। ফলে বিজেপির প্রস্তাব পাস হয়ে যায়। দীপিকা হন সভাধিপতি। আর লিপিকা পেলেন সহ-সভাধিপতির দায়িত্ব।

প্রাক্তন সহ-সভাধিপতি রফিকুলের বক্তব্য, ‘‘মালদহে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হল, সেটা ভবিষ্যতে স্পষ্ট হবে। জেলার উন্নয়ন অনেক দিন ধরে থমকে আছে। জেলার উন্নয়নের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের ভূমিকাই প্রধান। জটিলতার কারণে গত চার-পাঁচ মাসে জেলায় উন্নয়নের কাজ আটকে গিয়েছিল। জেলার উন্নয়নের স্বার্থে আমরা এই জোটবদ্ধ হয়েছি। রাজ্য বা জেলা নেতৃত্বের কোনও নির্দেশ ছিল না। আমরা সদস্যেরা একত্রিত হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’ কংগ্রেসের দিকে আঙুল তুলেছেন রফিকুল। তাঁর অভিযোগ, ‘‘কংগ্রেস আমাদের ভাঙার চেষ্টা করেছিল। আমাদের একাংশকে বেআইনি ভাবে ভাঙিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল ওরা।’’ বিজেপির জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘জেলা পরিষদ গঠন করতে আমরা কোনও দল ভাঙাইনি। বিজেপির তরফে প্রার্থী ঠিক করা হয়েছিল, জেলার উন্নয়নের স্বার্থে তৃণমূল তাঁকে সমর্থন করেছে।’’

রাজনৈতিক মহলের মতে, মালদহ কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি। তবে বিগত কয়েক বছরে সেই ঘাঁটির মাটি অনেকটাই আলগা হয়ে যায়। কংগ্রেস যদি তৃণমূলের সমর্থন নিয়ে জেলা পরিষদ গঠন করত, তবে নতুন করে অক্সিজেন পেত হাত শিবির। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই অক্সিজেন কংগ্রেসকে অনেকটাই এগিয়ে রাখতে পারত। তবে ‘অপারেশন’ শেষপর্যন্ত ভেস্তে যাওয়ায় কোতোয়ালি কেন্দ্রিক কংগ্রেসি রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা ব্যর্থ হল বলেই মনে করা হচ্ছে।

Malda Zila Parishad BJP Congress TMC

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy