নিজের স্ত্রীকে অন্য এক যুবকের সঙ্গে থাকতে দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর স্বামী শ্রীকান্ত রায়ের বিরুদ্ধে। খুনের পর রক্তমাখা ধারালো অস্ত্র হাতে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে ধূপগুড়ি থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন নিজেই। ন’মাসের পুরনো সেই খুনের মামলায় বৃহস্পতিবার শ্রীকান্তকে মৃত্যুদণ্ড দিল জলপাইগুড়ি জেলা আদালত। একই সঙ্গে বিচারক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দুই নাবালক সন্তানের ২১ বছর বয়স পর্যন্ত দেখভালের দায়িত্বের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসন এবং ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি-কে (ডিএলএসএ)।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি ধূপগুড়ির রায়পাড়া এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডে। মৃতার নাম সোমা রায় (৩৫)। প্রায় ১৫ বছর আগে শ্রীকান্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। তাঁদের দুই সন্তান রয়েছে। এক জনের বয়স ১৩ বছর এবং অন্য জনের ৭ বছর।
স্থানীয় ও পুলিশি তদন্ত সূত্রে খবর, সোমার সঙ্গে প্রতিবেশী যুবক চিরঞ্জিৎ রায়ের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক তৈরি হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় তা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে সালিশি সভা বসে। অভিযোগ, সেই সালিশি বৈঠকেই শ্রীকান্ত তাঁর স্ত্রী সোমাকে চিরঞ্জিতের সঙ্গে থাকার অনুমতি দেন। এর পর সোমা চিরঞ্জিতের বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করেন।
অভিযোগ, কিন্তু তার কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটে যায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ২৪ জানুয়ারি সকালে ধারালো অস্ত্র নিয়ে চিরঞ্জিতের বাড়িতে ঢুকে সোমার উপর এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করেন শ্রীকান্ত। সেই সময় চিরঞ্জিৎ বাড়িতে ছিলেন না। সোমার চিৎকার শুনে চিরঞ্জিতের মা সুশীলা রায় ছুটে এসে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে, তাঁকেও ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ। গুরুতর জখম অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সোমা। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এরপর খুনের অস্ত্র হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন শ্রীকান্ত। খালি পায়ে রক্তমাখা অবস্থায় প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে যান তিনি। পরে একটি টোটোয় চেপে ধূপগুড়ি থানায় পৌঁছে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর তাঁকে গ্রেফতার করে ধূপগুড়ি থানার পুলিশ।
আরও পড়ুন:
ঘটনার পর ধূপগুড়ি থানায় ২৪ জানুয়ারি মামলা রুজু হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৩২(এ)/১০৩(১) ধারায় তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন এসআই ধনঞ্জয় মজুমদার। পুলিশি তদন্তের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়।
এর পর জলপাইগুড়ি জেলা আদালতে শুরু হয় বিচারপ্রক্রিয়া। মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ ও তদন্তের নথি খতিয়ে দেখার পর বৃহস্পতিবার জলপাইগুড়ির তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালত শ্রীকান্তকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে।
মামলাটি প্রায় ন’মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়ায় দ্রুত তদন্ত এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চার্জশিট পেশের বিষয়টিও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে আদালত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শ্রীকান্তের দুই নাবালক সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তাদের ২১ বছর বয়স পর্যন্ত দেখভালের দায়িত্ব জেলা প্রশাসন এবং ডিস্ট্রিক্ট লিগাল সার্ভিসেস অথরিটিকে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
জলপাইগুড়ি জেলা পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, তদন্তকারী অফিসার এসআই ধনঞ্জয়ের তদন্ত এবং মামলার কার্যকর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মামলাটি দ্রুত বিচারপর্বে পৌঁছোয়। বৃহস্পতিবার আদালতের রায়ের পর ধূপগুড়ির ওই নৃশংস খুনের মামলায় প্রায় ন’মাসের আইনি প্রক্রিয়ারও সমাপ্তি হল।