বিহারের পশ্চিম চম্পারন জেলার বাল্মীকি ব্যাঘ্রপ্রকল্প (টাইগার রিজার্ভ) থেকে বাঘিনি এসে পৌঁছোল উত্তরবঙ্গের বক্সায়। আগামী ২ অক্টোবর জঙ্গলের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক ঘেরাটোপে ছাড়া (সংরক্ষণের পরিভাষায়, ‘সফ্ট রিলিজ়) হবে বাঘিনিটিকে। বক্সার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারলে তার ঠাঁই হবে উন্মুক্ত প্রকৃতিতে।
বুধবার বক্সায় শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সরেজমিনে দেখতে যান বনমন্ত্রী মনোজ ওঁরাও। আগামী ২ অক্টোবর বক্সার জঙ্গলে বাঘিনি ছাড়ার আগে বুধবার আলিপুরদুয়ার সার্কিট হাউসে বন দফতর, পুলিশ-সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে গোটা প্রস্তুতি খতিয়ে দেখলেন বনমন্ত্রী মনোজ। বাঘিনিকে নিরাপদে রাখা, তার স্বাস্থ্যপরীক্ষা, রেডিয়ো কলারের মাধ্যমে নজরদারি এবং জঙ্গল লাগোয়া বনবস্তি এলাকার বাসিন্দাদের সচেতন করা নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বনমন্ত্রী বলেন, “আগামী ২ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার সময় বাঘিনিটিকে জঙ্গলে ছাড়া হবে। তার সমস্ত প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব।” তিনি জানান, বাঘিনি ছাড়ার পর মুখ্যমন্ত্রী ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তাদের উদ্দেশে প্রায় ১০ মিনিটের একটি ভাষণ দেওয়ারও কথা রয়েছে তাঁর।
বক্সার এনক্লোজ়ারে বাল্মীকির বাঘিনি। ছবি— বন দফতর সূত্রে পাওয়া।
বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে বুধবার সকালেই বাঘিনিটি এসে পৌঁছয় উত্তরবঙ্গে। হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে পৌঁছোনর পর কড়া নিরাপত্তায় সড়কপথে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের নির্দিষ্ট এলাকায়। ‘গ্রিন করিডর’ তৈরি করে বন দফতর ও পুলিশের কনভয়ের মাধ্যমে জঙ্গলের গভীরে নিয়ে গিয়ে নির্ধারিত এনক্লোজারে রাখা হয় বাঘিনিটিকে। বনমন্ত্রী জানান, বিহারের অতিথি সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছে। তার শারীরিক পরিস্থিতির উপর অষ্টপ্রহর নজর রাখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বাঘিনিটির গলায় রেডিয়ো কলার পরানো হয়েছে। ফলে তার গতিবিধির উপর সারাক্ষণ নজরদারি চালানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘‘কোনও ভাবে বাঘিনীটি যদি জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ের দিকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করে, তা হলে গ্রামে ঢোকার আগেই যাতে বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বাঘিনীটির গতিবিধির উপর সব সময় নজরদারি চালানো হবে।’’
নেপাল সীমান্ত ঘেঁষা বাল্মীকি ব্যাঘ্রপ্রকল্পে টানা কয়েক দিনের অভিযানের পর মঙ্গলবার বিকেলে ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করা হয় বাঘিনিটিকে। বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে একাধিক বার অভিযান ব্যাহত হলেও শেষ পর্যন্ত বনকর্মীদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় সফল হয় অভিযান। এর পর আকাশপথে বাঘিনিকে উত্তরবঙ্গে নিয়ে আসা হয়। বাঘিনিকে বক্সায় আনার এই উদ্যোগকে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখছে বন দফতর। বনমন্ত্রী বলেন, “আমরা খুবই খুশি। আগামী ২ অক্টোবরের এই ঘটনাকে আমরা একটি ঐতিহাসিক দিন এবং ঐতিহাসিক ঘটনা বলেই মনে করছি।”
বক্সার জঙ্গলে অসম এবং ভুটানের দিক থেকে পুরুষ বাঘের আনাগোনা ইতিমধ্যেই ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বলে বন দফতর সূত্রের খবর। সেই কারণেই একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনিকে ছাড়ার আগে নজরদারিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে দফতর। ক্যামেরায় ধরা পড়া ওই পুরুষ বাঘগুলির মধ্যে কোনওটি বক্সা টাইগার রিজার্ভে নিয়মিত প্রবেশ করছে কি না, তা-ও নজরে রাখা হচ্ছে। ফলে বাইরে থেকে পুরুষ বাঘ এনে ছাড়ার আগে স্বাভাবিক ভাবে বাঘের চলাচল কতটা, সেটিও পর্যালোচনা করা হবে। তবে রাজ্য সরকারের এই কর্মসূচি নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন কয়েক জন বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ। তাঁদের বক্তব্য, একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনিকে এ ভাবে নতুন পরিবেশে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে। এক বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘‘এ ভাবে পূর্ণবয়স্ক ওই বাঘিনিকে গিনিপিগের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। যে লক্ষ্য নিয়ে ওই বাঘিনিকে বক্সা টাইগার রিজার্ভে ছাড়া হয়েছে, তা ১০০ শতাংশ ফলপ্রসূ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’’ বনমন্ত্রীর বক্তব্য, এই আশঙ্কার বিষয়গুলি মাথায় রেখেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে গোটা কর্মসূচি রূপায়ণ করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বক্সা ব্যাঘ্রপ্রকল্পে এক সময় বাঘের ভাল উপস্থিতি ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেখানে বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। সরকারি প্রকল্প নথিতে বক্সাকে ‘বাঘের কম ঘনত্বের আবাসস্থল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চতুর্থ সর্বভারতীয় বাঘ গণনায় বক্সায় বাঘের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। পরবর্তী গণনায় অবশ্য একটি বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। এই পরিস্থিতিতে বক্সায় বাঘ ফেরানোর ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হতে পারে এই কর্মসূচি— সরকারি দস্তাবেজে যার নাম— ‘প্রোপোজাল ফর টাইগার অগমেন্টেশন অ্যান্ড সফ্ট রিলিজ অফ টাইগার ইন বক্সা টাইগার রিজার্ভ’। ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৭-২৮— পাঁচ বছরের জন্য এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু বাঘ এনে ছেড়ে দেওয়াই নয়, বাঘের খাদ্যভান্ডার বা শিকারের প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি, উপযুক্ত আবাসস্থল তৈরি, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ বা করিডর উন্নত করা এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত নিয়ন্ত্রণের মতো একাধিক বিষয়ও এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ৫০.৮৩ কোটি টাকা।