সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন রাজ্যের এমন প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ ‘নিরুদ্দেশ’! তাঁদের ঠিকানায় গিয়ে খোঁজ পাচ্ছেন না সরকারি আধিকারিকেরা। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বাসিন্দাদের হাতে তুলে দিতে গিয়ে এমনই তথ্য উঠে এল রাজ্যের কাছে। নবান্ন সূত্রে খবর, বিগত সরকারের আমলে তাঁরা সকলে সরকারি সুবিধা পেতেন। কিন্তু বর্তমানে তাঁদের খোঁজ মিলছে না বলে অভিযোগ। তাঁদের যোগাযোগের যে ঠিকানা দেওয়া রয়েছে, সেখানে পৌঁছেও লাভ হয়নি।
সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ্মান ভারত কার্ড বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে গিয়ে বিষয়টি প্রথম নজরে আসে নবান্নের। অনেকে মনে করছেন, বিধানসভা ভোটের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) হয়েছিল। তাতে নাম বাদ পড়া অনেক মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যান। হতে পারে সেই কারণেই তাঁদের হদিস মিলছে না। অনেকে হয়তো বাংলাদেশে চলে গিয়েছেন। কারও হয়তো মৃত্যু হয়েছিল আগেই। তার পরেও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতেন।
এই প্রসঙ্গে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, “স্বাস্থ্যসাথীর পরিসংখ্যান নিয়ে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছি। প্রাথমিক ভাবে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি ধরা পড়েছে। এখনও অনেক বাকি। সময় লাগবে। এখানে ভুয়ো কার্ড, ভুয়ো উপভোক্তা, ভুয়ো ডাক্তারের সই, ভুয়ো হাসপাতাল, ভুয়ো থার্ড পার্টি ইনসিওরেন্সের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। দুর্নীতির হিমশৈলের চূড়া মাত্র দেখতে পাচ্ছেন। আমরা পুরো বিষয়টি নিয়ে ফরেন্সিক অডিট করাচ্ছি।”
১৬ অগস্ট থেকে রাজ্যে চালু হয় কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্যবিমা যোজনা আয়ুষ্মান ভারত। নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে প্রকল্পের তথ্যভান্ডারে নাম থাকলে উপভোক্তারা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট থেকে আয়ুষ্মান ভারতের কার্ড ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। আর যদি সেই তথ্যভান্ডারে নাম না-থাকে, তা হলে সম্ভাব্য উপভোক্তার নাম ২০১৩ সালের জাতীয় খাদ্যসুরক্ষা আইন (তিন রকমের রেশন কার্ড— এএওয়াই, এসপিএইচএইচ, পিএইচএইচ)-এর তথ্যভান্ডারে নাম রয়েছে কি না দেখা হবে। সেখানে নাম থাকলে ই-কেওয়াইসি (বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাইয়ের কাজ) হয়েছে কি না, দেখা হয়।
ই-কেওয়াইসি হয়ে থাকলে কার্ডের জন্য উপভোক্তাকে অপেক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সাইটে গিয়ে স্টেটাস পরীক্ষা করা যাবে। ই-কেওয়াইসি না হলে বুঝতে হবে সমীক্ষা বা যাচাইপ্রক্রিয়ার কাজ শেষ হয়নি। সে ক্ষেত্রে ই-কেওয়াইসি প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। আর যাঁদের নাম জাতীয় খাদ্যসুরক্ষা আইনের তথ্যভান্ডারে নেই, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার জন্য আবেদন করতে পারবেন।
নথি ঠিক থাকলে পরিবারের এক জনের কেওয়াইসি হলেই চলে। যাঁরা পূর্বতন রাজ্য সরকারের আমলে স্বাস্থ্যসাথীর সুবিধা পেতেন, পরে তাঁদের নামই আয়ুষ্মান ভারত এবং মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনায় জুড়ে যায়। এ রকমই বহু নাগরিককে বাড়িতে কার্ড দিয়ে ই-কেওয়াইসি করিয়ে আনতে গিয়েছিলেন সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক এবং আশাকর্মীরা। তা করতে গিয়েই কিছু জনের খোঁজ মেলেনি বলে অভিযোগ। একই ভাবে কিসান ক্রেডিট কার্ড দিতে গিয়েও অনেকের খোঁজ মেলেনি বলে অভিযোগ। তাঁরা আগে রাজ্য সরকারের দেওয়া সুবিধা পেতেন বলেই খবর। তার পরেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ, পূর্বতন সরকারের আমলে সরকারি সুবিধা নিয়ে জালিয়াতি হয়েছে।
আরও পড়ুন:
রাজ্যের বিজেপি সরকারের তরফে আগেই জানানো হয়েছিল, আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলি সরকারি এবং তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস (নগদহীন) চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। ভূমিহীন এবং দিনমজুর পরিবার, তফসিলি জাতি এবং জনজাতিভুক্ত পরিবার, যাঁরা কাঁচাবাড়ি কিংবা এক কামরার বাড়িতে বসবাস করেন, যে পরিবারে ১৬ থেকে ৫৯ বছর বয়সি কোনও রোজগেরে পুরুষ সদস্য নেই, তারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। তবে ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে সমস্ত প্রবীণ নাগরিক এই প্রকল্পের আওতাধীন।
রাজ্যে ৪ কোটি ৪২ লক্ষ মানুষ আয়ুষ্মান ভারতের আবেদন জমা ছিল। তার মধ্যে ৪ কোটি ২৩ লক্ষকে এখনও পর্যন্ত কার্ড পৌঁছোতে পেরেছে সরকার। এক মাসে ১৯ লক্ষ ৫৭ হাজার ৭৯২ জনকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি কার্ড পেয়েছে মুর্শিদাবাদ। ৪৬ লক্ষ ৬ হাজার জন কার্ড পেয়েছেন। তার পরে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা। কলকাতায় ২ লক্ষ ৯৮ হাজার জন কার্ড পেয়েছেন।