বিধানসভা ভোটের পরে কালীঘাটের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন দু’জনে। নাম লিখিয়েছিলেন ঋতব্রত শিবিরে। তবে দিন কয়েক হল সুর বোধহয় একটু বদলাচ্ছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁর নেত্রী, ক’দিন আগে প্রকাশ্যে বলেছিলেন উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমান। বীরভূমের হাসনের বিধায়ক কাজল শেখ আবার বিধানসভায় কালীঘাট তৃণমূলের বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁদের ঘরে গিয়ে বিজয়ার মিষ্টি খেয়েছেন। ফল ফলেছে তৎক্ষণাৎ। হামিদুলের বিরুদ্ধে পুরনো মামলায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়েছে কাজল শেখের। তবে কালীঘাট শিবির দু’য়ে দু’য়ে চার করলেও বিজেপির সাফ কথা, এর সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণের কোনও সম্পর্ক নেই। যাঁরা কুকর্ম করেছেন, তাঁদের কর্মফল ভোগ করতেই হবে।
বীরভূম তৃণমূলের জেলা পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি কাজল দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ নিরাপত্তা পেতেন। অভিযোগ, শান্তিনিকেতনে এক বার তাঁকে খুনের সুপারি নিয়ে এসে ধরা পড়েছিলেন দুই বাংলাদেশি। তার পর থেকেই তাঁর নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। সঙ্গে থাকতেন দু’জন নিরাপত্তারক্ষী। কাজল নিজে জানান, বুধবার অগ্রজ বিধায়ক শোভনদেবের সঙ্গে দেখা করে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করার পরেই তাঁর নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হবেন। শুধু তা-ই নয়, বিকেলে তাঁর বাড়ির সামনে গিয়েছিল পুলিশ। ভোটপরবর্তী হিংসা ও অন্যান্য অভিযোগে নানুরের পাপুড়ি গ্রামে কাজলের ভাইপো ফ্লিপ শেখ এবং লয়েড শেখের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাত রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
ঋতব্রত শিবির ছাড়া বা কালীঘাটে ফেরার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা কাজল করেননি। কিন্তু বিধানসভায় শোভনদেবের ঘরে যাওয়ার পরপরই তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। পুলিশের এই সক্রিয়তাও তাঁর ওই পদক্ষেপের পরেই ঘটেছে। কাজল নিজে বলেন, ‘‘জাতিধর্ম নির্বিশেষে দুর্গাপুজোয় বাঙালিরা আনন্দ করে থাকেন। সেই পুজোর পর বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য শোভনদার ঘরে গিয়ে মিষ্টি খেয়ে আমি যদি অন্যায় করে থাকি, তা হলে এমন অন্যায় বার বার করতে চাই। আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই সবসময় ছিলাম, আছি। মমতাই আমার নেত্রী।’’
বীরভূমের রাজনীতিতে কাজলের সঙ্গে অনুব্রত মণ্ডলের দ্বন্দ্বের কথা কারও অজানা নয়। ক্ষমতায় থাকালালীন দু’জনকে সামলে চলার চেষ্টা করতেন মমতা। তবে পুরোপুরি সফল কখনওই হননি। কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার হয়ে অনুব্রত তিহাড়ে চলে যাওয়ার পরে জেলা রাজনীতির দখল অনেকটাই কাজলের হাতে চলে যায়। জামিন পেয়ে ফিরে আসার পরে সেই জমি আর পুনরুদ্ধার করতে পারেননি দিদির আদরের কেষ্ট। কিন্তু ৪ মে-র পরে তিনিও নাম লিখিয়েছেন ঋতব্রত শিবিরে। ফলে কাজল-কেষ্ট কী করে এক ঘাটে জল খান, তা দেখার আগ্রহ ছিল রাজনীতিকদের। মমতার প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য জানিয়ে নিজের রাজনৈতিক যাত্রাপথের বাঁক আরও এক বার বদলালেন কাজল। তাঁর নিরাপত্তা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে বুধবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে যাঁরা দাঁড়াচ্ছেন, বেছে বেছে তাঁদের নিশানা করা হচ্ছে। কাজল শেখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করেছেন। তাঁর বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হয়েছে। সরকার আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকটা কি আপনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি?’’
শোভনদেবের ঘরে কাজলের শুভেচ্ছা বিনিময় নিয়ে যখন বিধানসভার অন্দরে জল্পনা চলছে, তখনই বেসুরো হয়েছিলেন ঋত শিবিরে নাম লেখানো আর এক বিধায়ক। চোপড়ার হামিদুল মমতাকেই নিজের নেত্রী বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। জানিয়ে দেন, চাকুলিয়ার বিধায়কও তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। ঋত শিবিরে যোগ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘‘যে দিন সই করেছিলাম, আলাদা দলের কোনও কথা হয়নি। আমাকে বলা হয়েছিল, দিদির দলেই থাকব। বিরোধী দলের অফিসঘর নেওয়ার জন্য আমরা সই করেছিলাম। পরে শুনেছি অনেকে অনেক রকম কথা বলছেন। আমরা মমতার দল করি। ওঁর প্রতীকেই জিতেছি। ওঁকেই হাই-কমান্ড বলে মনে করি।’’ হামিদুলের এই ‘স্বীকারোক্তির’ পর বৃহস্পতিবার শুভেন্দু রায়গঞ্জের সভা থেকে সরাসরি তাঁকে নিশানা করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পুরনো মামলাগুলির ফাইল খোলার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশকে। লুট হওয়া জমিও পুনরুদ্ধারের বার্তা দিয়েছেন।
শুভেন্দু জানান, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং তার পরবর্তী পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় চোপড়ার বাসিন্দা যাঁরা অত্যাচারিত হয়েছিলেন, নতুন করে তাঁদের অভিযোগ নেবে পুলিশ। জনসাধারণকে নতুন করে থানায় গিয়ে অভিযোগ জানানোর ডাকও দিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন, পরের জনসভা তিনি করবেন চোপড়া এবং ইসলামপুরে। হামিদুলকে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, ‘‘আমি এসপি, ইসলামপুরের ডিআইজি-কে বলে গেলাম, চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমানের বিরুদ্ধে যত মামলা আছে, ফের খোলা হবে। যত জমি লুট হয়েছে, সব উদ্ধার করা হবে। আমি দেখতে চাই, এই জেলায় কত বড় মস্তান আছে, কত বড় বালি চোর, ভুয়ো মাফিয়া রয়েছে।” শুভেন্দুর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন হামিদুল। তাঁর কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী যা বলেছেন, সব ভিত্তিহীন। আমি কারও বাগান দখল করেছি বা জমি দখল করেছি বলে কোনও প্রমাণ তিনি দেখাতে পারবেন না। এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না।’’
হামিদুলের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রসঙ্গেও মুখ খুলেছেন অভিষেক। চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু নিয়ে শুভেন্দুকে পাল্টা কটাক্ষ করেছেন তিনি। ওই পুজো কমিটির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো দেবদীপ অধিকারী যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ। অভিষেক বলেন, ‘‘রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রায়গঞ্জে গিয়ে বলেছেন, এক বিধায়ক, যিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, তাঁর ফাইল খোলা হবে। আগে নিজের ভাইপোর ফাইল খুলুন। নিজের ফাইল খুলুন। নারদা, সারদার ফাইল খোলার ক্ষমতা হবে? নিজের ভাইপোকে জেলে ঢোকানোর ক্ষমতা হবে? সিট তদন্ত করছে। এক বার তলব করে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করা হয়নি।’’
বেসুরোদের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের এই সক্রিয়তাকে তুলোধনা করেছেন কুণাল। তাঁর দাবি, মমতার দলকে ভয় পেয়েই বিজেপি এই কাজ করছে। কালীঘাটপন্থী বিধায়ক বলেছেন, ‘‘পুজোর পর বিধানসভা খুললে সৌজন্য বিনিময় হবে, পরিচিতদের মধ্যে মিষ্টি খাওয়ানো হবে, এগুলো খুব স্বাভাবিক। অমুক মিষ্টি খাইয়েছে বলে তার নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হবে? পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূলকে ভয় পেয়ে, তাঁর দলকে ভাঙার জন্য ঋতব্রতদের ব্যবহার করেছে বিজেপি। পুলিশ-প্রশাসনকে ব্যবহার করা হচ্ছে।’’
দুই বিধায়ক বেসুরো হওয়ায় দল অস্বস্তিতে, মানতে চাননি ঋতব্রত শিবিরের নেতা তথা বিধানসভার বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান। তিনি জানান, হামিদুল তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘হামিদুল আমাদের শিবির থেকে কোথাও যাননি। মুখ্যমন্ত্রী কী বলেছেন, তা নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না। তিনি অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের তদন্ত হবে। কাজল বিধানসভায় এসেছিলেন। আমার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। ওঁকে বলেছি বিধায়ক হিসেবে স্পিকারের কাছে নিরাপত্তার জন্য আবেদন জানাতে।’’
ঋত শিবিরের বেসুরোদের বিরুদ্ধে সক্রিয়তার অভিযোগকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাইছে না শাসকদল। রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, ‘‘তৃণমূল বলে কোনও দল নেই। দলটা নির্মূল। মানুষ ওই কালো দিনগুলো আর মনে রাখতে চায় না। এঁরা এখন প্রাসঙ্গিক হতে নানা রকম উদ্ভট কথা বলছেন। কিন্তু যাঁরা কুকর্ম করেছেন, তাঁরা কর্মফল এড়াতে পারবেন না। মানুষ ভোট দিয়ে রাষ্ট্রবাদী সরকার গঠন করেছে। যাঁরা অন্যায় করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যই মানুষ ভোট দিয়েছে। সুতরাং এঁদের বিরুদ্ধে যে সব আইনানুগ প্রক্রিয়া চলা জরুরি, তা চলবেই।’’