পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলির পাঠ্যসূচিতে এ বার জায়গা পেতে চলেছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। অন্য দিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সংগঠিত সিঙ্গুর আন্দোলন প্রসঙ্গ পাঠ্যবই থেকে মুছে ফেলা হবে। সোমবার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যালয় ‘মিত্র ইনস্টিটিউশন’-এ আয়োজিত একটি কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে এই ঘোষণা করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘পাঠ্যবইতে অবশ্যই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানের প্রসঙ্গ থাকা উচিত। আর যাঁরা টাটাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েছেন, তাঁদের উল্লেখ থাকা উচিত নয়। আমি স্কুলশিক্ষামন্ত্রী, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী এবং তাঁদের সচিবদের এই বিষয়ে অনুরোধ করেছি। আগামী দিনে যে সিলেবাস কমিটি গঠিত হবে, তাদের কাছে আমি এই আবেদন ও প্রস্তাব রাখব।’’ তিনি আরও স্পষ্ট করে দেন, পাঠ্যসূচিতে কী থাকবে তা শেষপর্যন্ত সিলেবাস কমিটিই ঠিক করবে, কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা নয়। তিনি ভবানীপুরের বিধায়ক হিসেবে কেবল এই আবেদনটুকু রাখছেন। মুখ্যমন্ত্রী যখন এই প্রস্তাবের কথা বলছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গেই উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন এবং উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর স্কুলের পাঠ্যবইতে যুক্ত করা হয়েছিল তাঁর সিঙ্গুর আন্দোলন। সেই আন্দোলনের উল্লেখ পর্বেই রয়েছে, সিঙ্গুর থেকে টাটাগোষ্ঠীর বিতাড়ন পর্ব। শ্যামাপ্রসাদের পর্ব যুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই মমতার সিঙ্গুর আন্দোলন বাদ দেওয়া হবে স্কুলের পাঠ্যবই থেকে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
আরও পড়ুন:
বিগত সরকারের সমালোচনা করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘আগের সরকার এই বিষয়গুলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা ও অবহেলা করে গিয়েছে। মিত্র ইনস্টিটিউশনের এই ভবনটি একটি হেরিটেজ বিল্ডিং। রাজ্যে হেরিটেজ কমিশন গঠিত হলে আমি এই ভবনটিকে হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করব। কারণ, বিগত সরকার হেরিটেজ কমিশনই তুলে দিয়েছিল।’’ ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িটি সংরক্ষণের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ওই বাড়িটির মালিকানা বর্তমানে একটি ট্রাস্টের অধীনে রয়েছে। তবে রাজ্য সরকার হুগলির জিরাটে একটি জমি কিনে চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যেখানে শ্যামাপ্রসাদের নামাঙ্কিত একটি আধুনিক লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হবে।
পাশাপাশি, নিজের বিধায়ক তহবিল থেকে মিত্র ইনস্টিটিউশনের উন্নয়নের জন্য ২৫ লক্ষ টাকা অনুদান ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি মনে করিয়ে দেন, ১৯০৬ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত শ্যামাপ্রসাদ এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন এবং ১৯২৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত স্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন। তাই তাঁর ১২৫তম জন্মজয়ন্তীতে এই স্কুলের প্রতি বর্তমান সরকারের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ব্যবহৃত সামগ্রী এবং স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য রাজ্য সরকার ইতিমিধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। মুখ্যমন্ত্রী এবং মুখ্যসচিব-সহ রাজ্য সরকারের ১০ জন প্রতিনিধি এবং সমাজের আরও ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে এই কমিটি তৈরি হয়েছে। এই কমিটির কাজের জন্য রাজ্য বাজেটে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এমনকি ঝাড়খণ্ডের মধুপুরে শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি সংরক্ষণের জন্য সেই রাজ্যের সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
অন্য দিকে, কাঁথিতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় পালিত হয়েছে শ্যামাপ্রসাদের ১২৫তম জন্মদিবস। সেখানে মূর্তিতে মাল্যদান করার পর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর ছোট ভাই তথা কাঁথির বিজেপি সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী দাবি করেন, শ্যামাপ্রসাদের কর্মকাণ্ডের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। রবিবার হুগলির বলাগড়ের জিরাটে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটেবাড়িতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন রাজ্যের মন্ত্রী সুমনা সরকার। মন্ত্রী বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করব। মোগল সাম্রাজ্য আর চলবে না ইতিহাসের পাতায়। ইতিহাসের পাতায় থাকবে সনাতন সাম্রাজ্য।’’ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাতি বাণীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘পাঠ্যপুস্তকে আনা সম্পূর্ণটাই সরকারি বিষয়। এখানে আমাদের কোনও ভূমিকা থাকবে না। সরকার যেটা মনে করবে সেটাই হবে। তবে শুধু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নন, তাঁর ভাইদের নামগুলোও যেন থাকে। বিভিন্ন দিক থেকে দীর্ঘ দিন ধরে তাঁরা বাংলায় বঞ্চিত হয়েছিলেন।’’