নেপালে হড়পা বান বিপর্যয়ের এক মাস অতিক্রান্ত। উদ্ধার হওয়া দেহের সংখ্যা ১৪৫১, নিখোঁজ ৫২৮৫, জানিয়েছেন সে দেশের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ)। পশ্চিমবঙ্গের ৩৭ জন বাসিন্দা এখনও নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে ৩২ জন নেপালে গিয়েছিলেন ‘চলো যাই’ নামের এক পর্যটন সংস্থার সঙ্গে। ছিলেন প্রয়াত তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠাও।
সেই সংস্থার কর্ণধার দিব্যজ্যোতি বসু এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘৩২ জন আমাদের সঙ্গে নেপাল গিয়েছিলেন। কেউই ফেরেননি। ৩২টি পরিবারের থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে নেপাল সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনও কারও খোঁজ মেলেনি।’’
নেপাল প্রশাসন জানিয়েছে, ১৪৫১টি দেহ ছাড়া আরও দু’জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর তাঁরা মারা যান। মোট ১৩ হাজার ৭৯৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, শনিবার এমনটাই জানিয়েছে তারা। তাঁদের মধ্যে ১১১৩ জনকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে ২১টি ত্রাণশিবিরে। নুয়াকোটে ১৮৭, রসুয়াতে ৮০৫ ও ধাডিংয়ের শিবিরগুলিতে রয়েছেন ১২১ জন।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ২৬ অগস্ট যে হড়পা বান আছড়ে পড়েছিল, তাতে খড়কুটোর মতো ভেসে যায় উত্তর ও মধ্য নেপালের বহু লোকালয়। হিমালয়ের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে দক্ষিণ দিকে বয়ে চলেছে ভোটেকোশী নদী। সেই নদী বেয়েই নেমে এসেছিল কাদামাটির স্রোত। ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ঘরবাড়ি, গাড়িঘোড়া, রাস্তাঘাট ও সেতু। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তিব্বতে এই বন্যায় প্রাণ দিয়েছিলেন ৪৩ জন। ৫০০ জনের বেশি নিখোঁজ, জানায় চিনের সংবাদমাধ্যম।
আরও পড়ুন:
নেপাল জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১১ হাজার বন্যাবিধ্বস্ত মানুষের হাতে ওষুধপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। আহত সাত জনের চিকিৎসা চলছে। সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃতদেহগুলি শনাক্ত করা। ১৪৫৩টি (দু’জন চিকিৎসা চলাকালীন মৃত) উদ্ধার-হওয়া দেহের মধ্যে ১১২টি দেহ সঠিক ভাবে চিহ্নিত করা গিয়েছে এবং পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ দেহই বিকৃত। পচেগলে শোচনীয় অবস্থা। তাই চোখে দেখে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে নেপাল পুলিশ। ১৩২৯টি ডিএনএ নমুনা জোগাড় করা হয়েছে মৃতদেহ ও দেহের অবশিষ্টাংশ থেকে। নিখোঁজদের পরিবারের থেকে পাওয়া গিয়েছে ২০২৯টি নমুনা। ১৪২১টি চিহ্নিত না-হওয়া দেহ সম্বন্ধে খুঁটিনাটি তথ্য নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটে জমা করেছেন আধিকারিকেরা। মর্গে এতগুলি দেহ রাখার জায়গা না-হওয়ায় ডিএনএ নমুনা জোগাড় করে সুরক্ষিত স্থানে সেগুলি কবর দিয়েছে নেপাল প্রশাসন। নমুনাগুলি যত্ন করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে পরে কোনও ডিএনএ মিললে দেহ সংশ্লিষ্ট পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যায়।
বিপর্যয়ের ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে নেপাল। নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান এখনও থামেনি। প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে দেহ। রাস্তাঘাট ও সেতু মেরামতির কাজ চলছে। জরুরি পরিষেবা যেখানে বিঘ্নিত হয়েছে, তা ফের চালু করার চেষ্টা চলছে। রসুয়া ও ধাডিংয়ের মাঝে ৪০ কিলোমিটার রাস্তা ও ৪১টি সেতু জলের তোড়ে ভেঙে পড়েছে। কাজেই নুয়াকোট ও রসুয়ার মধ্যে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। বিভিন্ন লোকালয়ে যাতায়াতের পথও বন্ধ।
তাই বেশ কিছু অস্থায়ী রাস্তা ও সেতু তৈরি করা হচ্ছে। নেপাল সেনার সাহায্যে দেবীঘাটের কাছে একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। তার ফলে আবার চালু হয়েছে গালছি-বিদুর রাস্তাটি। বেত্রাবতীতে আরেকটি অস্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। সরকার স্যাব্রুবেসীতেও একটি সেতু নির্মাণ করছে। যদিও স্যাব্রুবেসী থেকে রসুয়াগাধী যাওয়ার মূল রাস্তা এখনও পুরোপুরি বন্ধ। আধিকারিকেরা সেখানে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। দ্রুত সেই রাস্তা পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হবে। অক্টোবরের মাঝামাঝি ওই রাস্তায় যানচলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।প্রত্যন্ত জনপদগুলিতে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছোনো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়ার জন্য হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং অস্থায়ী যাতায়াত-ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আকাশপথে পরিবহণের ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত সব এলাকায় একসঙ্গে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
বন্যার পর যেসব জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরা নিখোঁজ হয়েছিলেন, সেসব স্থানেও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো চিলিম এবং আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে বহু মৃতদেহ উদ্ধার করেছে, নিখোঁজদের সন্ধানে এখনও তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নতুন করে ভূমিধসের ফলে বেশ কিছু জায়গায় যান চলাচল বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে।