শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে শিথিলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে এ বার ‘রিসেট’ বোতাম টিপতে চাইছে ঢাকা। একাধিক কূটনৈতিক সূত্রের খবর, দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বরের শুরুতেই নয়াদিল্লি সফরে আসতে পারেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই দুই দেশের সরকারি স্তরে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ‘দ্য হিন্দু’-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যম।
গত অগস্ট মাসে ভারতে বসে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠক ঘিরে বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মূলত তার পর থেকেই দু’দেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপড়েন দেখা দেয়। তবে সেই বরফ গলাতে ইতিমধ্যেই তৎপরতা শুরু হয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত কয়েক দিনে বাংলাদেশের জলসম্পদ মন্ত্রী মহম্মদ শহিদুদ্দিন চৌধুরী অনি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মেহদি আমিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক মহলের মতে, তারেকের সম্ভাব্য দিল্লি সফরে গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির নবীকরণ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে থমকে থাকা বাণিজ্য স্বাভাবিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি আলোচ্যসূচিতে থাকতে পারে।
আগামী ২১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। অক্টোবরেও তাঁর একাধিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচি রয়েছে। তাই মনে করা হচ্ছে, নভেম্বর বা ডিসেম্বরের কোনও এক সময়েই তিনি দিল্লি আসতে পারেন। এর আগে বিম্স্টেক-এর (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন)-এর প্রধান হিসেবে ব্রিক্স শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। কিন্তু সেই সম্মেলনে ঢাকার তরফে কেউ যোগ দেননি। বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ‘রিসেট’করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। আর সেই কারণে একটি ‘অনুকূল’সময়ে দ্বিপাক্ষিক সফরকেই অগ্রাধিকার দিতে চাইছে ঢাকা। সূত্রের খবর, তারেক নিজেও দ্রুত ভারত সফরে আগ্রহী। তবে দেশের মানুষের কাছে এই সফরের ‘প্রাপ্তি’বা সাফল্য হিসেবে তিনি কী তুলে ধরবেন, তা নিয়ে আগে নিশ্চিত হতে চাইছে ঢাকা।
আরও পড়ুন:
সম্পর্কের এই বরফ গলার ইঙ্গিত মিলেছে গত ১৭ সেপ্টেম্বরও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান তারেক। জবাবে তাঁকে ধন্যবাদও জানান মোদী।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান। তবে হাসিনা জমানাতেও ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল তাঁর দল। দলের অন্দরের খবর, ২০১৮ সালেই তারেক রহমান দলীয় নেতৃত্বকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ভারতের প্রতি বৈরী নীতি থেকে সরে আসার জন্য। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ওই নীতি আদতে ভুল। সেই অনুযায়ী ২০২৪-এর জানুয়ারির নির্বাচনের আগে থেকেই দিল্লিতে দূত পাঠিয়েছিল বিএনপি।
অন্য দিকে, ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট প্রবল গণ-বিক্ষোভের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি জুলাই-অগস্টের আন্দোলনে দমনপীড়নের অভিযোগে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) হাসিনা ও তাঁর সরকারের একাধিক শীর্ষ মন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা শুনিয়েছে। এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল।