নেপালে হড়পা বান বিপর্যয়ে মৃতদেহ উদ্ধারের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে গেল। সে দেশের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ৩৫৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত নেপালের আটটি জেলা থেকে দেহ উদ্ধার হয়েছে। কাদামাটির স্তূপ এবং অন্যান্য ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চলছে। চলছে প্রাণের খোঁজ। সেই সঙ্গে ফের হড়পা বানের আশঙ্কায় ত্রস্ত হিমালয়ের নদী উপত্যকা।
নেপালের রসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীতে বুধবার সকালে আচমকা বান আসে। পাহাড়ের কোলে প্রায় ২০০০ ফুট উচ্চতা থেকে ছুটে আসে কাদামাটি মিশ্রিত নদীর জল। সেই স্রোতের ধাক্কায় খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু। কাদামাটির স্তূপে চাপা পড়ে গিয়েছে আস্ত দোতলা বাড়িও। আট শতাধিক মানুষের কোনও খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন ভারতীয় রয়েছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারত থেকে বহু পর্যটক নেপালে গিয়েছিলেন। গন্তব্য ছিল কৈলাস-মানস সরোবর। কলকাতা থেকে একটি ভ্রমণ সংস্থার উদ্যোগে ৩২ জনের দল গিয়েছিল নেপালে। দেড় দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তাঁদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। যেখানে বান এসেছিল, শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী তাঁরা সেখানেই অভিবাসন দফতরে ছিলেন। এ ছাড়া, বিপর্যয়ের কারণে অনেক পর্যটক নেপালে আটকে পড়েছেন। তাঁদের জন্য উদ্বেগে রয়েছে পরিবার। নেপালের পাশে থাকার বার্তা বুধবারই দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে কথাও বলেন তিনি। ভারতীয় বায়ুসেনা উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছে।
নেপালে কাদামাটির নীচে লোকালয়। ছবি: পিটিআই এবং রয়টার্স।
নেপালে নিখোঁজ ভারতীয়দের সকলে পর্যটক নয়। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, ৭৩ জন কাজ করছিলেন সেখানকার ত্রিশূলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। বৃহস্পতিবার নেপাল এবং চিনে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। পড়শি দেশের উদ্ধারকাজে সব রকমের সাহায্য করছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সবালের কথায়, ‘‘তিব্বতে ২০০ জন ভারতীয় আটকে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৯৫ জন রয়েছেন তিব্বতের ছোট গ্রাম দারচেনে। তাঁরা সীমান্ত পেরিয়ে নেপালে আসার চেষ্টা করছেন। জিলঙে আটকে রয়েছেন চার জন, জ়ুটুলফুকে ৩০ জন। তিব্বতে আটকে থাকা ভারতীয়েরা কোন রাজ্যের বাসিন্দা, তা-ও এখনও জানা যায়নি। এই কঠিন পরিস্থিতিতে নেপালের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে ভারত।’’ সংবাদসংস্থা এএনআই জানিয়েছে, তামিলনাড়ুর ২১ জন এবং ত্রিশূলি প্রকল্পে কর্মরত ৬৩ জনকে উদ্ধার করা গিয়েছে। এখনও যোগাযোগ করা যায়নি ২৯০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে।
আরও পড়ুন:
ফের বানের আশঙ্কা?
সকালে নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ জানায়, নতুন করে হড়পা বানের সম্ভাবনা এই মুহূর্তে নেই। তবে বৃষ্টির কারণে নদীর জলস্তর বাড়তে পারে। কিন্তু বিপর্যয়ের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, নেপাল এবং তিব্বতের সীমান্তে পাহাড়ি ধসের কারণে রুদ্ধ হয়েছে ছোছেন খোলা এবং পুরেপু সাংপো নদীর গতিপথ। তার ফলে সেখানে রাতারাতি সৃষ্টি হয়েছে বিশাল এক হ্রদের। জমে যাওয়া জলের চাপে হঠাৎ পাথর ও মাটির স্তূপের ‘অবরোধ’ ভেঙে গেলে নতুন করে হড়পা বান নামতে পারে বলে বৃহস্পতিবার সতর্কবার্তা দিয়েছে চিন। বলা হয়েছে, আগামী তিন দিনে নতুন তৈরি হওয়া হ্রদে ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমা হতে পারে। এই বিপুল জলরাশির চাপে পাথর-মাটির বাধা চুরমার হয়ে গেলে প্রাণঘাতী জলস্রোত সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা।
নেপালে হড়পা বানে সেতু বিপর্যয়। ছবি: পিটিআই এবং রয়টার্স।
কেন বার বার বিপর্যয়?
বিশেষজ্ঞেরা নেপালে বারংবার বিপর্যয়ের জন্য তার ভৌগোলিক অবস্থানকেই দায়ী করছেন। ভারতীয় এবং ইউরেশীয় পাতের সংযোগস্থলে অবস্থিত নেপাল ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণেই ভূমিকম্পপ্রবণ। এই দুই পাতের মধ্যে নিরন্তর সংঘর্ষ চলছে। প্রতি বছর ভারতীয় পাত গড়ে ৫ সেন্টিমিটার করে ইউরেশীয় পাতের নীচে ঢুকে যাচ্ছে। নেপালেই রয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম নবীন পর্বতশৃঙ্গ। তার ভূতাত্ত্বিক গঠন এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। দুই পাতের সংঘর্ষের ফলে হিমালয়ে এখনও ভূ-উত্থান চলছে, অঞ্চলভেদে এই উত্থানের হার আলাদা। দুই পাতের ঘর্ষণের জেরে প্রতি বছর এভারেস্টের উচ্চতা ৫ মিলিমিটার করে বাড়ছে। এর ফলে ভূত্বকে বিপুল টেকটনিক চাপ সঞ্চিত হয়। কোনও ভূত্বকের শিলা স্তরের ফাটল বরাবর সেই চাপ হঠাৎ মুক্ত হলে ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পের ফলে সেই শক্তিই বাইরে বেরিয়ে আসছে।
আরও পড়ুন:
বিহারে আতঙ্ক
নেপালের ভোটেকোশী নদীতে বুধবারের হড়পা বানের জেরে বিপদসীমা ছুঁয়ে ফেলেছিল বিহারের কোশী এবং গন্ডক নদী। বৃহস্পতিবার গন্ডকের জলস্তর কিছুটা নামলেও কোশীর পরিস্থিতি এখনও আশঙ্কাজনক। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আবার ধস নামলে কোশীতে প্লাবনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিপদ শুধু সেখানেই নয়। নেপাল থেকে বিহারে নেমে আসা নদীগুলোর মধ্যে কোশী একটি কারণে আলাদা— এটি শুধু বন্যা ঘটায় না, গতিপথও পরিবর্তন করতে পারে! বিপুল পলি জমার ফলে নিজের নদীখাত উঁচু করে তুলতে পারে এবং হঠাৎ করে তার বর্তমান গতিপথ থেকে অনেক দূরের এলাকাকেও বিপদের মুখে ফেলতে পারে। ১৯৫৪, ১৯৬৮ এবং ২০০৮ সালে বানভাসি কোশী আংশিক ভাবে গতিপথ বদলেছিল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বিস্তীর্ণ এলাকা। এ ক্ষেত্রেও তাই নতুন করে কোনও বিপর্যয় হলে বিহারকে ভুগতে হতে পারে।
হড়পা বানের পর কাদামাটির স্তূপে আটকে লরি। ছবি: পিটিআই এবং রয়টার্স।
ত্রস্ত অরুণাচল প্রদেশ
নেপালের মতো বিপর্যয় যে কোনও মুহূর্তে নামতে পারে অরুণাচল প্রদেশেও। কারণ, ওই রাজ্যের অদূরে ব্রহ্মপুত্রের উৎস নদী ইয়ারলং সাংপোতে চিন একটি প্রকাণ্ড বাঁধ নির্মাণ করছে। তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে বৃহৎ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। চিন অধিকৃত তিব্বতের মেডোগ এলাকায় যেখানে বাঁধটি তৈরি হচ্ছে, তা অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত থেকে তার দূরত্ব মেরেকেটে ৫০ কিলোমিটার। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই এলাকা অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ। সক্রিয় ভূকম্পন চ্যুতিরেখার উপর জলবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করছে চিন। কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে আরও ঘন ঘন ভূমিকম্প হতে পারে। তা থেকে হড়পা বানও অসম্ভব নয়।
কাদামাটি সরিয়ে উদ্ধারকাজ চলছে। ছবি: পিটিআই এবং রয়টার্স।
চিনের তথ্য গোপন?
নেপালের ভোটেকোশী নদীতে বিপর্যয়ের পর একাংশ চিনের দিকে আঙুল তুলেছে। তাদের দাবি, রাসুওয়াগাড়ি-গিরোং ক্রসিং এবং গিরোং পোর্ট যখন হড়পা বানে বিপর্যস্ত হয়, তখন সেই খবর নেপালকে জানানো উচিত ছিল তাদের। তাহলে নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া যেত। বাঁচানো যেত অনেক প্রাণ। বৃহস্পতিবার সেই বিতর্কে মুখ খুলেছে চিন। নেপালে অবস্থিত তাদের দূতাবাস জানিয়েছে, ‘‘চিনের দিকে বাঁধে বিপর্যয়ের কারণেই নেপালে এই ক্ষয়ক্ষতি বলে যে দাবি, তা ভুয়ো। ২৬ অগস্ট নেপালের দিকেই ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পের মতো হিমবাহে ধসের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কাদার ধস নামে। তার জেরে রাসুওয়াগাড়ি-গিরোং সীমান্ত অঞ্চলে নেপাল এবং চিন, উভয়ের ভূখণ্ডেই বহু মানুষ নিখোঁজ। তাই দোষারোপ করে লাভ নেই। সহযোগিতা করলে মানুষের প্রাণ বাঁচবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- ত্রাণ যেমন পাঠানো হচ্ছে, তেমনই আর্থিক সাহায্যও পাঠানো হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
- বিপর্যস্ত নেপালকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে অনেকেই। বিভিন্ন সংস্থা তো বটেই, ব্যক্তিবিশেষও সাহায্য পাঠাচ্ছেন নেপালে।
- হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপালে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ল। এখনও নিখোঁজ দেড় হাজারের বেশি মানুষ।
-
নিজের এক মাসের বেতন একটি পরিবারকে দেবেন মুখ্যমন্ত্রী! নেপালে নিখোঁজদের পরিজনকে সব রকম সহায়তারও আশ্বাস
-
চিনে নিরাপদ শিবিরে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটকেরা? নেপালে হড়পা বানে নিখোঁজ ৩৭ জনের সন্ধানে নবান্নের দ্বারস্থ পরিবার
-
নিখোঁজদের পরিবারকে ডিএনএ নমুনা দিয়ে যেতে বলল কেন্দ্র! গভীর রাতে তিব্বতে ভূমিকম্প, কাঁপল নেপালও
-
হড়পা বানে ভেসে গিয়েছে খামার, ক্ষতিগ্রস্ত চাষজমি, সব হারিয়ে দিশাহারা নেপালের কৃষকেরা
-
নেপালের হড়পা বানে অনিশ্চিত চিনের স্বপ্নের প্রকল্প, রেলপথে নেপাল এবং তিব্বতকে আর জোড়া যাবে কি? সংশয়ে বেজিং