অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষে অ-সরলরৈখিক প্রভাব এবং স্ব-অনুঘটন আবিষ্কারের সূত্রে এ বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন ফ্রান্সের অঁরি বরিস কাগান এবং জাপানের কেনসো সোয়াই। মঙ্গলবার এই দুই বিজ্ঞানীর নাম ঘোষণা করেছে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি।
অ্যাকাডেমির প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অ্যামাইনো অ্যাসিডের মতো কিছু অণুর দু’টি প্রতিরূপ পাওয়া যায়। একটি অপরটির প্রতিফলন, যেমন আমাদের দুই হাত। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে নন-সুপারইম্পোজ়েবল মিরর ইমেজ। একটি প্রতিরূপ ডানহাতি (ডি-আইসোমার) এবং অন্যটি বাঁহাতি (এল-আইসোমার)। রসায়নশাস্ত্রে এই বৈশিষ্ট্যকে বলে হোমোকাইরালিটি। গ্রিক ভাষায় ‘হোমো’ মানে সম এবং ‘কাইরাল’ মানে হাত।
আমাদের দেহকোষের প্রোটিনে অ্যামাইনো অ্যাসিডের একটি প্রতিরূপই পাওয়া যায়। অন্যটিকে প্রকৃতিতে প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু পরীক্ষাগারে দু’টি প্রতিরূপ তৈরি হয় সমান পরিমাণে। যাকে বলা হয় রেসমিক মিশ্রণ। কিন্তু ঘটনা হল, আমাদের শরীর কেবল একটি নির্দিষ্ট আইসোমারই গ্রহণ করে। সেটাই ওষুধ প্রস্তুতের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার ‘মিরর’ রূপটি মানবশরীরের জন্য ক্ষতিকর এমনকি প্রাণঘাতী বিষও হতে পারে। কৃত্রিম ভাবে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিরূপ (ডানহাতি বা বামহাতি) তৈরি করার প্রক্রিয়াই হল অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষ।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যদি ২০ শতাংশ বিশুদ্ধ ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক ব্যবহার করা হয়, তবে উৎপাদিত পদার্থটিও ২০ শতাংশ বিশুদ্ধ হওয়ার কথা (একে বলে লিনিয়ার বা সরলরৈখিক প্রভাব)। কিন্তু কাগান দেখান যে, রসায়নে সবসময় এমনটা ঘটে না। তিনি আবিষ্কার করেন, খুব কম বিশুদ্ধ (যেমন মাত্র ১০ শতাংশ বা ২০ শতাংশ বিশুদ্ধ) অনুঘটক (ক্যাটালিস্ট) ব্যবহার করেও বিক্রিয়া শেষে প্রায় ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ এবং একক রূপের (ডি-আইসোমার বা এল-আইসোমার) অণু তৈরি করা সম্ভব।
আরও পড়ুন:
এমন ক্ষেত্রে অনুঘটকের অণুগুলি নিজেদের মধ্যে জোট বেঁধে বিশেষ আচরণ করে, যা বিক্রিয়াতে নতুন মাত্রা দেয়। একেই বলে নন-লিনিয়ার বা অ-সরলরৈখিক প্রভাব। এর ফলে কম খরচে, সহজ পদ্ধতিতে ওষুধ ও অন্য রাসায়নিক তৈরি করা সম্ভব হয়। সাধারণত একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গতি দ্রুত বা মন্থর করার জন্য বাইরে থেকে অনুঘটক যোগ করতে হয়। কিন্তু অটোক্যাটালিসিস হল এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে বিক্রিয়ায় উৎপন্ন পদার্থটি নিজেই নিজের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। জাপানি বিজ্ঞানী সোয়াই এমন একটি বিক্রিয়া আবিষ্কার করেন, যেখানে খুব সামান্য পরিমাণ হোমোকাইরাল অণু (ডানহাতি বা বাঁহাতি অণু) উপস্থিত থাকলেও, সেটি অটোক্যাটালিসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের মতো কোটি কোটি অণু তৈরি করে ফেলে।
অঁরি বরিস কাগানের জন্ম ১৯৩০ সালের ১৫ ডিসেম্বর। বর্তমানে ফ্রান্সের ‘ইউনিভার্সিটি প্যারিস-স্যাক্লে’-র রসায়ন বিভাগের এমিরেটাস অধ্যাপক। তাঁকে অ-সরলরৈখিক অনুঘটক সংক্রান্ত পরীক্ষার পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর আবিষ্কার ওষুধ প্রস্তুতকারক শিল্পের উন্নতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।
কেনসো সোয়াইয়ের জন্ম ১৯৫০ সালে। তিনি জাপানের ‘টোকিয়ো ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স’-এর ফলিত রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক। ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনার (প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা) মূল্যের পুরস্কার সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হবে দুই বিজ্ঞানীর মধ্যে।