দীর্ঘ সংঘাতের পর অবশেষে বাণিজ্যিক সমঝোতার পথে হাঁটল আমেরিকা ও চিন। হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর ৩০০০ কোটি ডলারের একটি শুল্কচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বাণিজ্য কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস জানিয়েছে যে, এই নতুন চুক্তির ফলে আমেরিকার কৃষিজাত পণ্য, কাঠ এবং প্রসাধনীর মতো রফতানি হওয়া পণ্যগুলি চিনে সুবিধা পাবে। অন্য দিকে, চিনের ছোট যন্ত্রপাতি, খেলনা এবং সাজসজ্জার সামগ্রী আমেরিকায় রফতানির ক্ষেত্রেও অনুকূল শুল্ক ছাড় পাবে। চিনের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, কুয়ালালামপুরে হওয়া আগের আলোচনার ফলাফলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্যই এই নতুন বাণিজ্য কাউন্সিল তৈরি করা হচ্ছে।
২০১৫ সালের পর এই প্রথম ওয়াশিংটন সফরে গেলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই সফরে দুই দেশ তাদের বর্তমান ‘বাণিজ্য বিরতি’র মেয়াদ আরও দু’মাস বাড়াতে সম্মত হয়েছে। মার্কিন অর্থ সচিব স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, এই বাড়তি সময় বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্যে কাজ করার জন্য দুই দেশকে অতিরিক্ত সুযোগ দেবে। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প এবং জিনপিংয়ের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা ধরে বৈঠক হয়। এর পর নৈশভোজে যোগ দেন তাঁরা, যেখানে সরকারি উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন অ্যালফাবেটের সিইও সুন্দর পিচাই, মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাদেলা, এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং এবং ওপেন এআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান।
বৈঠকে দুই রাষ্ট্রনেতাই আমেরিকা-চিন সম্পর্কে স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার উপর জোর দিয়েছেন। শি জিনপিং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে “উইন-উইন কোঅপারেশন”-এর ডাক দিয়ে বলেছেন প্রতিযোগিতাকে একটি উপযুক্ত সীমার মধ্যে রাখা উচিত।
‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর বদলে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’
বাণিজ্যের পাশাপাশি ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা এআই নিয়েও একটি নতুন স্তরের আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছেন তাঁরা। এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও ঝুঁকি— উভয় দিক নিয়েই আগামী নভেম্বরে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা হবে। এআই সংক্রান্ত কোনও ঘটনা ঘটলে আধিকারিকদের মধ্যে যোগাযোগের একটি নতুন মাধ্যমও তৈরি করা হবে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এখন থেকে ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর বদলে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি ব্যবহার করার পক্ষে ট্রাম্প ও জিনপিং একমত হয়েছেন।
বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির বাইরেও, ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন’ (অ্যাপেক) এবং ‘জি-২০’-র মতো বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলি আয়োজনের ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা ও চিন। ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, দুই রাষ্ট্রনেতাই আগামী দিনে একে অপরের দেশে আয়োজিত বৈঠকে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। এ ছাড়াও ঠিক হয়েছে, আন্তর্জাতিক জলপথে কোনও একক দেশ বা সংস্থা নিজের ইচ্ছেমতো ট্রানজ়িট টোল বা কর বসাতে পারবে না।
শুল্কযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও ধারাবাহিক সংঘাত
বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার ফলেই এই শুল্কযুদ্ধের সূত্রপাত। আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি, চিনের বাণিজ্যনীতি এবং মেধা-স্বত্ব সংক্রান্ত বিষয়গুলিকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে ২০১৮ সাল থেকে চিনা পণ্যের উপর ধারাবাহিক ভাবে শুল্ক চাপাতে শুরু করে আমেরিকা। এর জবাবে চিনের তরফেও মার্কিন পণ্যের উপর পাল্টা শুল্ক চাপানো হয়। চিন আমেরিকার এই পদক্ষেপকে ‘একতরফা’ বলে আখ্যা দেয় এবং জানায় এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের নিয়মের পরিপন্থী। বেজিং কিছু বিরল খনিজের রফতানি নিয়ন্ত্রণ এবং গুটিকয়েক মার্কিন সংস্থার উপর নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থাও গ্রহণ করে।
আরও পড়ুন:
এর পর দুই পক্ষের মধ্যেই দফায় দফায় শুল্ক বৃদ্ধি এবং পাল্টা পদক্ষেপ চলতে থাকে। মার্কিন কংগ্রেসের ‘কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস’-এর একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চিন আমেরিকার থেকে যা আমদানি করে তার চেয়ে অনেক বেশি রফতানি করে। ফলে আমেরিকার উপর শুল্ক চাপানোর জন্য চিনের কাছে পণ্যের সংখ্যা কম। এই কারণেই বেজিং রফতানি নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার সংক্রান্ত বিধিনিষেধের মতো অশুল্ক (নন-ট্যারিফ) পদক্ষেপগুলি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।
২০২৫ সালেও এই সংঘাত অব্যাহত ছিল। আমেরিকা বার বার চিনা পণ্যের উপর শুল্ক বাড়িয়েছে এবং চিনও মার্কিন আমদানির উপর চড়া শুল্ক বসিয়ে জবাব দিয়েছে। সেই সময়ে চিন আমেরিকার পদক্ষেপকে “দাদাগিরি ও জবরদস্তি” বলে আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। বলেছিল, ওয়াশিংটন শুল্ক বৃদ্ধি অব্যাহত রাখলে তারাও পাল্টা কঠোর ব্যবস্থা নেবে।