Advertisement
E-Paper

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমেরিকা-ডেনমার্কের ‘ঐতিহাসিক’ সমঝোতা! বরফঢাকা সম্পদের দেশে মার্কিন সেনা-আধিপত্য বাড়ছে

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার জেদের পথ থেকে সরে ত্রিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করতে চলেছে ওয়াশিংটন। বরফ-রাজ্যে যে কোনও ‘শত্রুদেশের’ লগ্নি বা সামরিক ঘাঁটির উপর কার্যত ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা পাচ্ছে আমেরিকা।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:২১

গ্রাফিক : আনন্দবাজার ডট কম।

কিনে নেওয়ার জেদাজেদি আর দখল করে নেওয়ার হুমকি থেকে আপাতত সরে এলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সই হতে চলেছে ‘গ্রিনল্যান্ড’ চুক্তি। আমেরিকার সঙ্গে ডেনমার্ক এবং তাদের স্বায়ত্তশাসিত অংশ গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে সমঝোতা চূড়ান্ত। আসন্ন চুক্তির মূল অংশ দু’টি। এক, আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডে তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করবে। দুই, আমেরিকার কোনও শত্রুদেশকে সেখানে ঘাঁটি বানাতে দেওয়া হবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই প্রথম এই সমঝোতার কথা ঘোষণা করেন তাঁর সমাজমাধ্যম হ্যান্ডলে। পরে ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের তরফেও যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। সব কিছু ঠিকঠাক চললে, আগামী সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার অধিবেশনের সময়েই সই হতে পারে ত্রিপাক্ষিক ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তি।

ট্রাম্প মনে করছেন, ডেনমার্ক ও তার স্বায়ত্ত্বশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে এই চুক্তির মাধ্যমে, কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডে নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত নিরঙ্কুশ করে ফেলল আমেরিকা। যদিও গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সেনার উপস্থিতি নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই এই দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছিল। বর্তমানে অবলুপ্ত সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে আমেরিকার ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর অবশ্য তার সংখ্যা অনেকটাই কমে যায়।

ট্রাম্প এক সময় জেদ ধরেছিলেন আস্ত গ্রিনল্যান্ডটাই কিনে নেবেন, দরকারে সামরিক শক্তিও প্রয়োগ করবেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যে, আমেরিকা জোর করে দখল নিতে এলে গ্রিনল্যান্ডের রানওয়েগুলি বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা পর্যন্ত করে ফেলেছিল ডেনমার্কের সামরিক বাহিনী। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংঘাত চরমে পৌঁছোয়। সে সময় জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিস্ফোরক এবং মজুত রক্ত নিয়ে গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছে গিয়েছিলেন ডেনমার্কের সেনাকর্মীরা। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প আর জোরজবরদস্তির পথে হাঁটেননি।

আমেরিকা কেন এত মরিয়া?

উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চলে গ্রিনল্যান্ড শুধু সামরিক-রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকেই নয়, খনিজ সম্পদের দিক থেকেও ‘অমূল্য’। মোবাইল ফোন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি— আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ‘বিরল খনিজ সম্পদে’ সমৃদ্ধ এই বরফঢাকা দেশ। এত দিন এই সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলিতে বিদেশি লগ্নির উপর কোনও কঠোর নজরদারি ছিল না। বিবিসি এবং রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হল আর্কটিক অঞ্চলে চিন ও রাশিয়ার মতো ‘প্রতিপক্ষ’ দেশগুলির প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। নয়া চুক্তি মোতাবেক, গ্রিনল্যান্ডে ন্যাটো-বহির্ভূত কোনও দেশ সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে পারবে না। এমনকি, এই দ্বীপে কোনও সংবেদনশীল ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হলেও এখন থেকে আমেরিকার আগাম লিখিত অনুমোদন লাগবে। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষদের লগ্নিতে কার্যত ‘ভেটো’ প্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার পেল পেন্টাগন। ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও এই মার্কিন অধিকার অটুট থাকবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৫১ সালের চুক্তি মোতাবেক গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হলেও তাতে প্রতিপক্ষকে রুখে দেওয়ার কোনও নির্দিষ্ট উল্লেখ ছিল না। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় এই দ্বীপে এক ডজনেরও বেশি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছিল। পরে সেগুলি বন্ধ হয়ে যায় এবং টিকে থাকে কেবল উত্তর-পশ্চিমের ‘বিদুফিক স্পেস বেস’। এই চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই সম্প্রতি দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের নারসারসুয়াক-সহ একাধিক পুরনো রানওয়ে ও সামরিক ঘাঁটি ফের চালু করার জন্য সমীক্ষা শুরু করে দিয়েছে মার্কিন সেনা। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁর প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ বা ‘মিসাইল শিল্ড ব্যবস্থা’, যা মূলত চিন ও রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা রুখতে তৈরি, তা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

চুক্তিতে কার লাভ?

নিজের সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ত্রিপাক্ষিক সমঝোতাকে আমেরিকার ‘স্বপ্নপূরণ’ আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, এক প্রকার বিনা খরচেই গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ এবং ‘স্থায়ী’ নিয়ন্ত্রণ পেল আমেরিকা। মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিয়ো একে ওয়াশিংটনের জন্য ‘বিরাট ঐতিহাসিক জয়’ বলে আখ্যা দিয়ে জানান, উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষায় গ্রিনল্যান্ড স্থায়ী ভাবে যুক্ত হল। তবে ট্রাম্পের এই ‘স্থায়ী ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের’ দাবিকে মানছে না ডেনমার্ক। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিয়েলসেনের যৌথ বার্তার সুর বলছে, আর্কটিকের নিরাপত্তায় আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি বাড়লেও, তাঁদের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ থাকছে।

সব মিলিয়ে, এক দিকে ডেনমার্ক ‘এক ইঞ্চি মাটিও না-খুইয়ে’, অন্য দিকে আমেরিকা ‘ন্যাটোর অন্দরে সংঘাত এড়িয়ে’ এই চুক্তি সই করতে চলেছে, যা সব পক্ষের জন্যই এক কূটনৈতিক ‘স্বস্তি’। যদিও আটলান্টিক কাউন্সিলের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এবং পেন্টাগনের প্রাক্তন কর্তা ইমরান বায়োমি মনে করেন, এই চুক্তিতে আমেরিকার নতুন কোনও বড় প্রাপ্তি নেই। ন্যাটো জোট ও ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত না-করেই নিছক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে আমেরিকা এই দাবিগুলি আগেই আদায় করতে পারত।

US in Greenland Trump Denmark

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy