Advertisement
E-Paper

আকাশে আয়না বসিয়ে রাত্রিবেলা রোদ্দুর বিক্রি করতে চায় মার্কিন স্টার্ট আপ সংস্থা! শুরু বিতর্ক, উদ্বেগে পরিবেশবিদেরা

মহাকাশে বিশাল আয়না বসিয়ে রাতের অন্ধকারে পৃথিবীতে সূর্যের আলো পৌঁছে দিতে চায় মার্কিন সংস্থা ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’। এই প্রযুক্তি পরীক্ষায় ভারতীয় সংস্থার সঙ্গেও চুক্তি হয়েছে তাদের। প্রকল্প নিয়ে তীব্র আপত্তি পরিবেশবিদদের।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ১৬:২৩
ক্যালিফোর্নিয়ায় হওয়া প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছে ভূপৃষ্ঠে আমদানি করা সূর্যালোকের রূপ কেমন হবে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় হওয়া প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছে ভূপৃষ্ঠে আমদানি করা সূর্যালোকের রূপ কেমন হবে। —ছবি: রিফ্লেক্ট অরবিটাল।

বিদ্যুতের মতো সূর্যের আলোও যদি প্রয়োজনমতো কেনাবেচা করা যেত? শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো লাগলেও বাস্তবে ঠিক এমনই এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার মহাকাশ স্টার্টআপ সংস্থা ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’। মহাকাশে বিশাল আকারের আয়না পাঠিয়ে রাতের অন্ধকারে পৃথিবীর বুকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে নামিয়ে আনতে চায় তারা। মূলত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ উৎপাদন চালু রাখা, বিপর্যস্ত এলাকায় আলো পৌঁছে দেওয়া এবং রাতের উদ্ধারকাজে সাহায্যের লক্ষ্যেই সূর্যালোককে ‘অন-ডিমান্ড’ বা চাহিদাভিত্তিক পরিষেবায় পরিণত করতে চায় সংস্থাটি। ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তির পরীক্ষার জন্য দু’টি রকেট উৎক্ষেপণ করতে ভারতের মহাকাশ সংস্থা ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর সঙ্গে চুক্তিও করেছে তারা। তবে রাতের আকাশ এবং পরিবেশের উপরে এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদেরা।

কী এই পরিকল্পনা?

সংস্থাটির লক্ষ্য, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৪৫ কিলোমিটার উপরে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ১৮ বাই ১৮ মিটারের (প্রায় ৫৯ ফুট ব্যাস) বিশাল আয়না পাঠানো। সূর্য ডুবে যাওয়ার পরেও মহাকাশে থাকা এই আয়নাগুলির অভিমুখ ঘুরিয়ে পৃথিবীর নির্দিষ্ট জায়গায় সূর্যের আলো পৌঁছোনো যাবে। ২০২৭ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে তাদের প্রথম পরীক্ষামূলক উপগ্রহ ‘ইয়ারেন্ডিল-১’ উৎক্ষেপণ করার কথা। প্রাথমিক ভাবে এই আয়নাগুলি পৃথিবীর বুকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আলো ফেলবে। গ্রাহকেরা মোবাইল অ্যাপের একটি বোতাম টিপেই নিজেদের পছন্দের এলাকায় আলোর বরাত দিতে পারবেন। যাঁরা টাকা দিয়ে এই পরিষেবা কিনবেন, তাঁদের এলাকায় আলো ধরে রাখতে মহাকাশে থাকা আয়নাগুলির অবস্থান ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণ করবে সংস্থাটি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশে এমন ৫০ হাজার উপগ্রহ পাঠানো হবে। সংস্থার দাবি, শুরুতে এই প্রতিফলিত আলো পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মতো হবে, তবে উপগ্রহের সংখ্যা বাড়লে তা মাঝ- আকাশের সূর্যের মতো উজ্জ্বল ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ফসলের খেতে আলো দেওয়া, খারাপ হয়ে যাওয়া পথবাতির কাজ চালানো, এমনকি সামরিক অভিযানে সৌরশক্তির জোগান দেওয়ার কাজেও তা ব্যবহার করা যাবে বলে তাদের দাবি।

সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা অঞ্চলের লোন পাইনের কাছে মাউন্ট হুইটনির অদূরে রাত্রে বিশাল মোবাইল লাইট বসিয়ে এই প্রযুক্তির একটি বাস্তব মহড়াও চালিয়েছে সংস্থাটি। স্থানীয় উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যৌথ ভাবে করা সেই পরীক্ষায় মরুভূমির বুকে নেমে আসা তীব্র আলো দেখে চমকে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদেরই এক জন ওই আলোকে ‘চোখধাঁধানো’ বলে বর্ণনা করেছেন। সংস্থার মুখপাত্রের দাবি, রাতের অন্ধকারে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলই তাদের প্রথম গ্রাহক হতে চলেছে এবং জীবন বাঁচানোর কাজে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর, তা দেখাতেই এই মহড়া চালানো হয়েছে।

বায়ুমণ্ডলের বাধা ও আলোকদূষণ

গত জুলাই মাসে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’ (এফসিসি) আগামী বছর পরীক্ষামূলক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু তার পরেই এর বিরোধিতায় সরব হয়েছেন বিজ্ঞানী ও পরিবেশপ্রেমীরা। ২০২৫ সালের অগস্টে প্রকাশিত একটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় দেখানো হয়েছে, মহাকাশ থেকে প্রতিফলিত সূর্যালোক পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আসার সময় অণু এবং অ্যারোসলের ধাক্কায় চারপাশের আকাশে ছড়িয়ে পড়বে। মাটিতে পৌঁছোনো আলো ফের উপরে প্রতিফলিত হয়ে আবার বিচ্ছুরিত হবে। ফলে নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরেও বিশাল এলাকা জুড়ে সেই আলো ছড়িয়ে পড়বে। হিসাব বলছে, মূল কেন্দ্র থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরেও এর ঔজ্জ্বল্য পূর্ণিমার চাঁদের আলোর চেয়ে বেশি হবে। অর্থাৎ, যাঁরা এই আলোর বরাত দেননি, তাঁদেরও অনিচ্ছাকৃত ভাবে এই আলোর ভোগান্তি পোহাতে হবে।

বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের সমালোচনা

গত অগস্টেই পরিবেশ রক্ষাকারী আইনি সংস্থা ‘আর্থজাস্টিস’-এর মাধ্যমে চারটি সংগঠন এফসিসি-কে এই অনুমোদন পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়েছে। আর্থজাস্টিসের প্রবীণ আইনজীবী জ্যান হ্যাসেলম্যান এই প্রকল্পকে ‘নির্বোধ’ ও ‘পাগলামি’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, “পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের বিবর্তন হয়েছে দিন ও রাতের ছন্দের উপরে ভিত্তি করে। এর সঙ্গে ছিনিমিনি খেলা মোটেই ভাল কাজ নয়। ৫০ হাজার আয়না-উপগ্রহ পাঠানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে আমাদের চেনা রাতের আকাশ চিরতরে হারিয়ে যাবে।”

বিজ্ঞানীদের মতে, পাখি, পোকামাকড় এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীরা খাবার খোঁজা, আশ্রয় ও প্রজননের জন্য দিন-রাতের স্বাভাবিক পরিবর্তনের উপরে নির্ভরশীল। এই ছন্দ নষ্ট হলে বহু প্রজাতির উপরে বিপর্যয় নেমে আসবে। পাশাপাশি মানুষের ঘুমের জৈবিক ঘড়ি (সার্কাডিয়ান রিদ্‌ম) ব্যাহত হয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। ‘আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’ সতর্ক করে জানিয়েছে, টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে সরাসরি ওই প্রতিফলিত তীব্র আলোর দিকে তাকালে চোখেরও ক্ষতি হতে পারে। তা ছাড়া ইলন মাস্কের সংস্থা ‘স্পেসএক্স’ যেখানে পৃথিবীর কক্ষপথে ১০ লক্ষ ডেটাসেন্টার বসানোর পরিকল্পনা করছে, সেখানে এমন হাজার হাজার আয়না-উপগ্রহ যুক্ত হলে রাতের আকাশে তারার দেখা মিলবে না এবং মহাকাশে আবর্জনার পরিমাণও বিপজ্জনক ভাবে বাড়বে।

উষ্ণায়ন ঘিরেও বিতর্ক

রিফ্লেক্ট অরবিটালের যুক্তি, রাতে সোলার প্যানেলে আলো ফেলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালে জীবাশ্ম জ্বালানির উপরে নির্ভরতা কমবে, যা আদতে পরিবেশেরই উপকার করবে। কিন্তু জলবায়ু বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে সূর্যের শক্তির পরিমাণ নিয়ে কাটাছেঁড়া করার ঘোর বিরোধী। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ডেভিড হো বলেন, “বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হওয়াতেই বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে। উষ্ণায়ন কমাতে কেউ কেউ মহাকাশে পৃথিবীর উল্টো দিকে মুখ করে আয়না বসিয়ে সূর্যের আলো ফিরিয়ে দেওয়ার মতো অদ্ভুত প্রস্তাব দিচ্ছেন। আর সেখানে পৃথিবীকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে সেই আয়না পৃথিবীর দিকে ঘোরানোর কথা ভাবা হচ্ছে!”

বিতর্কের মুখে রিফ্লেক্ট অরবিটাল জানিয়েছে, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, জাতীয় উদ্যান এবং বন্যপ্রাণী সমৃদ্ধ এলাকাগুলিকে যাতে এই আলোর আওতার বাইরে রাখা যায়, তা নিয়ে বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাদের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। সংস্থার মুখপাত্রের কথায়, “আমরা নজরদারিকে স্বাগত জানাই। সরকার, বিজ্ঞানী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির থেকে এগিয়ে না গিয়ে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করাই আমাদের দায়িত্ব বলে মনে করি।”

California Sunlight Space News

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy