রাজ্যে পালাবদলের পরে স্কুলশিক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই দীপক বর্মন উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন যে, কোনও স্কুলে শিক্ষক রয়েছেন তো পড়ুয়া নেই, কোথাও পড়ুয়া রয়েছে তো পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। দ্রুত সেই পরিস্থিতি ঠিক করতে হবে বলেও জানান তিনি। এ বারে সেই কাজ শুরু করল স্কুলশিক্ষা দফতর।
ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের মধ্যে সামঞ্জস্য আনার জন্য ‘সারপ্লাস’ শিক্ষকদের বদলির নির্দেশ দিল স্কুলশিক্ষা দফতর। প্রাথমিক স্তর থেকে এই কাজ শুরু হচ্ছে। এর ফলে অনুপাতের সামঞ্জস্য আসার পাশাপাশি পাকাপাকি ভাবে বহু স্কুলে তালাও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা। এর বিরুদ্ধেই সরব হয়েছেন শিক্ষকেরা। বিরোধী শিক্ষক সংগঠনের দাবি, পড়ুয়াশূন্য স্কুলগুলিকে পুনরায় চালু করার জন্য উদ্যোগী হওয়ার পরিবর্তে সরকার যে ভাবে স্কুলগুলিকে পাকাপাকি বন্ধ করে দিচ্ছে, সেটা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। স্কুল বাঁচাতে বিজেপি শিক্ষক সেল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দ্বারস্থ হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
স্কুলশিক্ষা দফতর সূত্রের খবর, ২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী প্রতি ৩০ জন পড়ুয়ার জন্য ১ জন করে শিক্ষক থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ, এই অনুপাত রাজ্যের বহু স্কুলেই মানা হয় না। গ্রামাঞ্চলে এমনও স্কুল রয়েছে, যেখানে ব্যাপক পরিমাণে শিক্ষকের ঘাটতি পঠনপাঠনে প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ। একই ভাবে অন্য স্কুলে এক জন পড়ুয়া না থাকলেও, শিক্ষকেরা রয়ে গিয়েছেন। এই ‘সারপ্লাস’ বদলির ফলে সেই সমস্যা মিটবে বলে আশা সরকারের।
কী ভাবে হবে এই বদলি?
দফতরে এক কর্তা জানান, ওই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদগুলিকে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে বিগত সরকারের মনোনীত পদাধিকারীদের সরে যেতে বলা হয়েছিল। তাই রাজ্যের প্রায় সব সংসদের সভাপতির পদ শূন্য। নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে সেই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন প্রাথমিক স্তরের জেলাস্কুল পরিদর্শকেরা। যেহেতু তাঁদের কাজের পরিধি নির্দিষ্ট জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, সে কারণে এই বদলি হবে একেবারেই জেলাস্তরে। অর্থাৎ স্কুলের পরিবর্তন হলেও শিক্ষক বা শিক্ষিকা বর্তমানে যে জেলায় কাজ করছেন, বদলি হবেন ওই জেলারই অন্য কোনও স্কুলে।
আরও পড়ুন:
যদিও দফতর সূত্রের খবর, খাতায়-কলমে অর্থাৎ বাংলার শিক্ষা পোর্টালে স্কুল ও শিক্ষকের যে তথ্য দেওয়া রয়েছে, বাস্তবে তা কিছুটা ভিন্ন। কী রকম? পোর্টালে যেখানে দেখানো হয়েছে যে, যেখানে স্কুল পড়ুয়াশূন্য অথচ শিক্ষকেরা রয়েছেন, সে ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শিক্ষকদের অন্য স্কুলে পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে এই ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চালু ছিল। এ বারে তাতে সরকারি সিলমোহর পড়তে চলেছে মাত্র। তাঁদের দাবি, কোনও শিক্ষকই বসে বসে বেতন পাননি। তাঁরা অন্য স্কুলে পড়িয়েছেন। ফলে পড়ুয়াশূন্য স্কুলগুলি এমনিতেই বন্ধ ছিল, এ বারে সরকারি ভাবে পাকাপাকি ভাবে বন্ধ হচ্ছে বলে মত শিক্ষামহলের।
এখানেই শিক্ষকেরা বেশ কয়েকটি প্রশ্ন তুলছেন। প্রথমত, পাকাপাকি ভাবে যে স্কুলগুলি বন্ধ হয়ে যাবে, সেগুলিকে সরকার পুনরায় চালানোর জন্য কেন চেষ্টা করল না? সম্প্রতি পার্কস্ট্রিটের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার জানিয়েছিলেন, যে স্কুলে পড়ুয়া নেই, সেগুলি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত কি না সেটা আলোচনা করে দেখতে হবে। তখনই শিক্ষকেরা প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, বন্ধ স্কুলকে নতুন ভাবে চালানোর পরিবর্তে স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার দিকেই যাচ্ছে সরকার? ‘সারপ্লাস’ শিক্ষকদের বদলিকে সমর্থন করলেও তালাবন্ধ স্কুলকে খোলার পরিবর্তে পাকাপাকি ভাবে তালা বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে শিক্ষকেরা।
আরও পড়ুন:
নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রুবশেখর মণ্ডল বলেন, ‘‘দিল্লি, তামিলনাড়ু ও কেরল পারলে, পশ্চিমবঙ্গ কেন পারল না? সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফেরাতে গেলে শিক্ষা দফতর, শিক্ষক ও স্থানীয় পঞ্চায়েত বা পুরসভার মাধ্যমে সমাজের মধ্যে সচেতনতা ও আস্থা বৃদ্ধির চেষ্টা করা যেত। কিন্তু এ ভাবে ‘সারপ্লাস’ বদলির মাধ্যমে স্কুল বন্ধ করার প্রয়াসের বিরোধিতা করছি। প্রায় তিন হাজারের বেশি স্কুল বন্ধ হতে পারে। আগামী সোমবার প্রতিনিধিদল বিকাশ ভবনে যাবে। সরকারকে আমাদের পক্ষ থেকে বিকল্প পথের দাবি জানাব।’’
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘বিগত সরকারের সিদ্ধান্তে কিছু ত্রুটি থাকায় সেই আমলে এই বদলি শুরু হয়নি। কিন্তু দেখতে হবে বদলি যেন বেশি দূরে না হয়। কিন্তু পড়ুয়াশূন্য স্কুলগুলিকে বাঁচানোর বিকল্প পথের সন্ধান করা সরকারের উচিত।’’
বিজেপি শিক্ষক সেলের সহ-আহ্বায়ক পিন্টু পাড়ুই বলেন, ‘‘সরকারের উপরে আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে। সরকার অবশ্যই স্কুলগুলিকে বাঁচাতে চাইবে। আমরা মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হব। চিঠিও লিখব এবং দেখা করার আবেদনও জানাব। স্থানীয় মানুষের মধ্যে সরকারি শিক্ষার প্রতি আস্থা ফেরাতে বিজেপি শিক্ষক সেল সব রকমের কাজ করবে। আমরা এলাকার মানুষের কাছে ঘুরে ঘুরে আবেদন করব। স্কুলগুলিকে বাঁচাতেই হবে।’’
পাশাপাশি শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিঙ্কর অধিকারী বলেন, ‘‘কয়েক দিন আগে উৎসশ্রী পোর্টাল চালু হয়েছে। তার পরে এই ‘সারপ্লাস’ বদলি হলে তো সাধারণ বদলি প্রায় অনিশ্চিত হয়ে গেল।’’