বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করছেন অনেক ভারতীয় পড়ুয়া। তাঁদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই, পড়াশোনার খরচ এবং বৃত্তির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পড়ার সময়ে ‘পার্ট টাইম’ চাকরি করা যাবে কি না এবং ডিগ্রি শেষ হওয়ার পরে কত দিন সেই দেশে থেকে চাকরি খোঁজার সুযোগ পাওয়া যাবে। কানাডা, ব্রিটেন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে আন্তর্জাতিক পড়ুয়াদের জন্য এ বিষয়ে আলাদা আলাদা নিয়ম রয়েছে। কোথাও পড়াশোনার সময় সপ্তাহে নির্দিষ্ট ঘণ্টা কাজের অনুমতি মেলে, আবার কোথাও ডিগ্রি শেষে চাকরি খোঁজা ও কাজ শুরু করার জন্য আলাদা ভিসার ব্যবস্থা রয়েছে।
কানাডা
কানাডায় যোগ্য স্টাডি পারমিটধারী আন্তর্জাতিক পড়ুয়ারা ক্লাস চলাকালীন সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা ক্যাম্পাসের বাইরে কাজ করতে পারেন। নির্ধারিত ছুটিতে পূর্ণ সময় কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কোর্সে ভর্তি থাকা-সহ ভিসার অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়।
পড়াশোনা শেষে যোগ্য পড়ুয়ারা পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিট-এর জন্য আবেদন করতে পারেন। কোর্সের ধরন ও মেয়াদ অনুযায়ী এই পারমিটের মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে।
ব্রিটেন
ব্রিটেনে ডিগ্রি স্তরের যোগ্য পূর্ণকালীন কোর্সে পড়া ভারতীয় পড়ুয়ারা সাধারণত ক্লাস চলাকালীন সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। নির্ধারিত ছুটিতে পূর্ণ সময় কাজের অনুমতি থাকতে পারে। তবে ভিসার শর্ত অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
পড়াশোনা শেষে গ্র্যাজুয়েট ভিসার মাধ্যমে যোগ্য পড়ুয়ারা চাকরি খুঁজতে ও কাজ করতে পারেন। সাধারণ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন করলে দু’বছর থাকার সুযোগ রয়েছে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আবেদন করলে এই মেয়াদ হবে ১৮ মাস। ডক্টরাল ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে মেয়াদ তিন বছর।
অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক পড়ুয়ারা ক্লাস চলাকালীন প্রতি দু’সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। নির্ধারিত ছুটিতে পূর্ণ সময় কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তবে গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স ও ডক্টরাল ডিগ্রির পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য।
পড়াশোনা শেষে টেম্পোরারি গ্র্যাজুয়েট ভিসার আওতায় যোগ্য পড়ুয়ারা কাজ করতে পারেন। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ব্যাচেলর ডিগ্রির পরে সাধারণত দু’বছর, এসটিইএম বিষয়ে ফার্স্ট ক্লাস অনার্স ডিগ্রির পরে তিন বছর, মাস্টার্স ডিগ্রির পরে তিন বছর এবং পিএইচডি-র পরে চার বছর পর্যন্ত থাকার সুযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ভিসার অন্যান্য যোগ্যতাও পূরণ করতে হয়।
আমেরিকা
আমেরিকায় ‘এফ ওয়ান’ ভিসায় পড়া ভারতীয় পড়ুয়ারা সাধারণত ক্লাস চলাকালীন ক্যাম্পাসের ভিতরে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। ক্যাম্পাসের বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রে আলাদা অনুমতি প্রয়োজন। তাই শুধু স্টুডেন্ট ভিসা থাকলেই ইচ্ছামতো বাইরে চাকরি করা যায় না।
ডিগ্রি শেষ হওয়ার পরে যোগ্য পড়ুয়ারা অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং-এর মাধ্যমে সাধারণত ১২ মাস পর্যন্ত নিজেদের পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্কিত কাজে যুক্ত হতে পারেন। নির্দিষ্ট এসটিইএম ডিগ্রিধারীরা শর্ত পূরণ করলে আরও ২৪ মাসের মেয়াদবৃদ্ধির আবেদন করতে পারেন। ফলে তাঁদের ক্ষেত্রে মোট তিন বছর পর্যন্ত কাজের অনুমতি পাওয়া সম্ভব। তবে এই সুযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আবেদনপ্রক্রিয়া ও যোগ্যতা পূরণ করতে হয়।
জার্মানি
জার্মানিতে পড়াশোনার সময়ে আন্তর্জাতিক পড়ুয়ারা বছরে সর্বোচ্চ ১৪০ পূর্ণ দিন অথবা ২৮০ অর্ধেক দিন কাজ করতে পারেন। নির্দিষ্ট শর্তে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজের ব্যবস্থাও রয়েছে।
জার্মানির স্বীকৃত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি শেষ করার পরে যোগ্য আন্তর্জাতিক পড়ুয়ারা দক্ষতাসম্পন্ন চাকরি খোঁজার জন্য সর্বোচ্চ ১৮ মাসের রেসিডেন্স পারমিট পেতে পারেন। এই সময়ে অন্য কাজ করেও জীবিকা নির্বাহের সুযোগ রয়েছে। উপযুক্ত চাকরি পেলে পরবর্তী সময়ে দক্ষ কর্মীর ভিসা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্লু কার্ডের জন্য আবেদন করা যায়। জার্মানির ক্ষেত্রে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ভাষা। কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থায় ইংরেজিতে কাজ করা গেলেও অনেক পেশায় জার্মান ভাষার জ্ঞান প্রয়োজন হয়।
আয়ারল্যান্ড
আয়ারল্যান্ডে যোগ্য আন্তর্জাতিক পড়ুয়ারা ক্লাস চলাকালীন সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। নির্ধারিত ছুটির সময়ে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজের অনুমতি রয়েছে। তবে এই সুবিধা পেতে উপযুক্ত কোর্সে ভর্তি থাকা এবং বৈধ অভিবাসন অনুমতি থাকা প্রয়োজন।
পড়াশোনা শেষে যোগ্য স্নাতকেরা থার্ড লেভেল গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম-এর আওতায় চাকরি খোঁজা ও কাজের সুযোগ পেতে পারেন। সাধারণত যোগ্য স্নাতক স্তরের ডিগ্রির ক্ষেত্রে ১২ মাস এবং নির্দিষ্ট স্নাতকোত্তর বা উচ্চতর ডিগ্রির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৪ মাস থাকার সুযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থান অনুমতির শর্ত পূরণ করতে হয়।
নিউজিল্যান্ড
নিউজিল্যান্ডে যোগ্য কোর্সে পড়া আন্তর্জাতিক পড়ুয়ারা ভিসার শর্ত অনুযায়ী সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৫ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। নির্ধারিত ছুটিতে পূর্ণ সময় কাজের সুযোগও থাকতে পারে। তবে সব কোর্সে এই সুবিধা নেই।
পড়াশোনা শেষে যোগ্যতা ও কোর্সের মেয়াদ অনুযায়ী পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসা পাওয়া যেতে পারে। এই ভিসায় সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত থাকা ও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তবে কোন ডিগ্রি শেষ করেছেন এবং কত দিন পড়াশোনা করেছেন, তার উপর ভিসার মেয়াদ নির্ভর করে।
আরও পড়ুন:
ভারতীয় পড়ুয়াদের কোন বিষয়গুলি নজরে রাখা দরকার?
পার্ট টাইম চাকরির আয় দিয়ে পুরো পড়াশোনার খরচ চালানোর পরিকল্পনা করা ঠিক নয়। কাজ পাওয়া নিশ্চিত নয়। আবার ভিসায় নির্দিষ্ট সময়ের বেশি কাজ করলে অভিবাসন সংক্রান্ত সমস্যা হতে পারে। টিউশন ফি, থাকা-খাওয়া, যাতায়াত, স্বাস্থ্যবিমা এবং জরুরি খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কোর্সের নাম নয়, তার স্বীকৃতি ও পরবর্তী কাজের সুযোগ যাচাই করা ভাল। দেশ বাছাইয়ের সময়ে ডিগ্রি শেষে থাকার অনুমতির মেয়াদ ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের পরিকল্পনা মিলিয়ে দেখা ভাল। একইসঙ্গে বলা যায়, ভিসার নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ নির্দেশিকা দেখে নেওয়া জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক পড়ুয়া সহায়তা কেন্দ্রের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।