সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (এসআরএফটিআই) ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ঘিরে রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে বেশ উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এক দিকে, নিরাপত্তার যুক্তিতে পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্তের পক্ষে সওয়াল করছেন এসআরএফটিআই কর্তৃপক্ষ। অন্য দিকে, ক্যাম্পাসে পুলিশি নজরদারির বিরোধিতা করে সরব হয়েছেন পড়ুয়াদের একাংশ। পাশাপাশি, শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষার দাবিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পড়ুয়া, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের উদ্যোগে শুরু হওয়া গণস্বাক্ষর অভিযানে স্বাক্ষরের সংখ্যা ৯,৫০০ ছাড়িয়েছে বলে উদ্যোক্তাদের দাবি।
ক্যাম্পাসে শিক্ষক, কর্মী ও আবাসিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এসআরএফটিআই কর্তৃপক্ষ। রেজিস্ট্রার দীপক কুমার জানিয়েছেন, গত ২৭ অক্টোবর উপাচার্যের দফতরে ভাঙচুর ও নিগ্রহের ঘটনা এবং আচমকা মশাল মিছিলের জেরে ক্যাম্পাসে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোখা এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি রক্ষার জন্যই নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তরফে আরও জানানো হয়েছে, ক্যাম্পাসে সিসিটিভি বসানো সম্ভব না হওয়ায় সাধারণ এলাকায় যাতায়াতের ছবি ও ভিডিয়ো রেকর্ড করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে, প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য সন্তোষ অজমেরা জানিয়েছেন, শিক্ষকেরা পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের বাইরের কোনও মঞ্চে এসআরএফটিআইয়ের প্রতিনিধিত্ব স্থগিত রাখার প্রস্তাবও এসেছে বলে জানা গিয়েছে। তবে এ বছর ইটানগরের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের ৪০ জন পড়ুয়া ও তিন জন শিক্ষককে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ‘ইফি’-তে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অন্য দিকে, ক্যাম্পাসে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ মোতায়েন এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির বিরোধিতা করেছে এসআরএফটিআইয়ের ছাত্র সংসদ। সংগঠনের সভাপতি ব্লসম হাজারিকা ও সহ-সভাপতি শুভমের অভিযোগ, এর ফলে শিক্ষাঙ্গন কার্যত পুলিশি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পরিণত হয়েছে। ইউনিয়নের দাবি, ৩০ জনেরও বেশি শিক্ষক ও কর্মী পুলিশ প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়ে স্মারকলিপি জমা দিলেও কর্তৃপক্ষ তাতে সাড়া দেননি। সাদা পোশাকে পুলিশের নজরদারি, ছাত্রীদের ভিডিয়ো রেকর্ড করা এবং প্রশাসনিক ভবনে চিঠি জমা দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতি তাঁদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। অবিলম্বে পুলিশ প্রত্যাহার এবং ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে ছাত্র সংসদ।
একইসঙ্গে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষাঙ্গনে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষার দাবি উঠেছে। এই বিষয়ে আচার্যের হস্তক্ষেপ চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পড়ুয়া, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একাংশ গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু করেছেন। উদ্যোক্তাদের দাবি, অনলাইন আবেদনে ইতিমধ্যেই ৯,৫০০-রও বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তনী ও শিক্ষাবিদেরা।
আরও পড়ুন:
এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন একটি বার্তা পাঠিয়েছেন বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। স্বাধিকার রক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনে মুক্ত চিন্তার পরিবেশ বজায় রাখার দাবিতে শীঘ্রই শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে বৃহত্তর গণ-কনভেনশনের আয়োজন করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ রাজ্যের এবং দেশের এসআরএফটিআই, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রথম সারির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজেপি ও আরএসএস যে ‘দখলদারি’র রাজনীতি চালাচ্ছে, তা কখনওই কাম্য নয় বলে মনে করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তরুণকান্তি নস্কর। তাঁর কথায়, ‘‘শিক্ষাঙ্গনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হলে জ্ঞানচর্চার মুক্ত পরিসর ব্যাহত হয়। শিক্ষা ও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না করে সরকার কেবল নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা করছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।’’ এই পরিস্থিতিতে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে শীঘ্রই একটি কনভেনশনের আয়োজন করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।