‘...পড়া বলিতে না পারিলে ছেলেকে বেঞ্চে দাঁড় করাইয়া তাহার দুই প্রসারিত হাতের উপর ক্লাসের অনেকগুলি স্লেট একত্র করিয়া চাপাইয়া দেওয়া হইত।”...
ওরিয়েন্টাল স্কুলে পড়ার অভিজ্ঞতার কথা এ ভাবেই ‘জীবনস্মৃতি’তে জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। নিজেই স্বীকার করেছিলেন, সেখানে তিনি কী শিখেছেন তা আর পরে মনে করতে পারেন না, তবে ‘শাসনপ্রণালী’র কথা তিনি মনে করতে পারতেন বৃদ্ধ বয়সেও।
শুধু এটুকুই নয়। বেতের ছড়ি থেকে কানমলা মোচড়— সবই এক সময় ছিল শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পড়ুয়ারা তাই ভয় পেত ‘মাস্টারমশাই’কে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে পঠনপাঠনের ধরন। সচেতনতা বেড়েছে শিশু মনস্তত্ত্ব বিষয়ে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমশ কমে এসেছে শাস্তির বহর।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে, কোনটি ভাল? শিক্ষকের হাতের বেত কি পড়ুয়াদের শুধু ক্ষতিই করেছে? না কি কড়া শিক্ষকের অভাবে শেষ পর্যন্ত ‘বেয়াদব’ হয়ে উঠছে পড়ুয়ারা?
মাস কয়েক আগে কোচবিহারের এক শিক্ষক গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, সময়ের পরে স্কুল ঢুকতে চাওয়া এক ছাত্রকে বকাবকি করার। এর আগে পূর্ব মেদিনীপুরের এক স্কুলপড়ুয়াদের বকাবকি করায় শিক্ষককে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল এক ছাত্রের বিরুদ্ধে। ২০২৫-এ ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুরের এক ছাত্র ইতিহাস শিক্ষককে গুলি করবে বলে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হাজির হয়েছিল স্কুলে, দাবি এমনই। সেই শিক্ষকও কোনও কারণে তিরস্কার করেছিলেন ওই ছাত্রকে। চলতি বছর শিক্ষক দিবসেও পড়ুয়াদের হাতে শিক্ষক নিগ্রহের ছবি উঠে এসেছে।
তবে এর উল্টো ছবিও দেখা যায়। ২০২০ সালে ব্যাগ তোলাকে কেন্দ্র করে এক ছাত্রকে উইকেট দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল পূর্ব বর্ধমানের এক স্কুলশিক্ষকের বিরুদ্ধে। ২০২২-এ তিন বছরের শিশু ‘দুষ্টুমি’ করছিল বলে চড় মেরে তার গালে পাঁচ আঙুলের দাগ ফেলে দিয়েছিলেন উত্তর ২৪ পরগনার এক বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক।
তা হলে কোনটা ঠিক? কী ভাবে এগোবে আগামী দিনের পড়াশোনা? কী ভাবে পাল্টে গেল শিক্ষকদের পড়ানোর ধরন— কী বলছেন শিক্ষক এবং অভিভাবকেরা?
নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত অভিভাবকেরা মনে করতেন শিক্ষক শাসন করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে তাঁরা সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন শিক্ষকের কড়া মনোভাবকে। মনে করতেন, কড়া শাসনেই শিশুর দৃঢ়চরিত্র গঠন হয়। তবে শুধু নব্বই দশকই নয়, এখনের বহু অভিভাবকই কড়া শাসনকেই সমর্থন করছেন।
যদিও শিক্ষকদের কাছে কড়া শাসনে বাদ সাধছে শিক্ষার অধিকার আইন। বর্তমান শিক্ষকদের একাংশ দাবি করেন, তাঁরাই বরং ভয়ে ভয়ে থাকেন, কোনও পড়ুয়াকে সামান্য বকাবকি করতে গেলেও আশঙ্কা থাকে।
আরও পড়ুন:
অধিকাংশ শিক্ষকই মনে করেন, শিশু মনস্তত্ত্বে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যোধপুর পার্ক বয়েজ় স্কুলের বর্তমান প্রধানশিক্ষক অমিত সেন মজুমদার মনে করেন, “আখেরে ভালই হয়েছে। তবে এই আইনের অপব্যবহার হলে মুশকিল।” এখন তিনি একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক। কিন্তু যখন ছাত্র ছিলেন, বিস্তর বকুনি খেয়েছেন তাঁর শিক্ষকদের কাছে। তাঁর কথায়, ‘‘ছোটবেলায় অনেক মারধর খেয়েছি। এখন ছাত্রদের বকাবকি করলেও সব সময় খেয়াল রাখি, তারা যেন মানসিক আঘাত না পায়।’’ যদিও এখনের বেশ কয়েকজন অভিভাবক এমনটা মনে করছেন না। তাঁদের কাছে শারীরিক আঘাতের চাইতেও মানসিক আঘাত অনেকটা প্রভাব ফেলে দেয় কোনও শিশুর মনস্তত্ত্বে। এক অভিভাবকের কথায়, ‘‘আমরাও ছোটবেলায় অনেক মার খেয়েছি বলেই আজ স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছি। ঠিক-ভুল বিবেচনা করি। এই চেতনা একদিনে আসেনি। শিক্ষকই পারেন একটি শিশুর ভিত তৈরি করতে। ভাল ভাবে বোঝানোর চাইতেও দু’এক ঘা সত্যিই প্রয়োজন।’’
দিনের পর দিন পড়া না করা, সময়ের মধ্যে কাজ না শেষ করা, হাতের মধ্যে সব সময় মুঠোফোনের ব্যবহার কখনওই কোনও শিশুর সার্বিক উন্নতি করতে পারে না। এখন অভিভাবকের কাছেও সময় কম। সকলেই ব্যস্ত থাকেন নিজের কাজের দুনিয়ায়। ফলে সন্তান আদৌ কতটা পড়ছে আর কতটা মুঠোফোন ঘাঁটছে সেই দিকেও তেমন নজর দিতে পারেন না। এক অভিভাবক জানাচ্ছেন, ‘‘আমি ও আমার স্বামী দু’জনেই কর্মরত। ফলে সন্তানকে সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না। আমার কাছে সম্পূর্ণ ভাবে ভরসার জায়গা ওর গৃহশিক্ষক এবং স্কুলশিক্ষক শিক্ষিকারা। সব সময় ভাল ভাবে বুঝিয়ে কাজ হয়না। গভীর কোনও একটা ভুল বার বার বোঝানোর পরেও করতে দেখেছি আমার সন্তানকে। সেখানেই যখন একবার হলেও সেই ভুলের জন্য ‘মার’ জুটেছে তখন সে বুঝতে পেরেছে অন্যায় করছিল, এটা করা যায় না।’’
বছর দশেক আগেও কাউন্সেলিং-এর প্রচলনও খুব একটা ছিল না আগে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে মানসিকতাও। খুব ছোট বয়সেও কাউন্সেলিং প্রয়োজন হতে পারে কোনও পড়ুয়ার। সচেতন অভিভাবক এখন তা করাচ্ছেন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই। সে ক্ষেত্রে একজন শিক্ষকই সব থেকে ভাল কাউন্সেলর হতে পারেন বলে মনে করছেন যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধানশিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্য। তিনি বলেন, ‘‘কোনও শিক্ষকের পড়ানোর ধরন, তাঁর কথা বার্তা, ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে ব্যবহারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মারধর করা কখনোই সমাধান নয়। ধৈর্য হারিয়ে গেলেই মুশকিল হয়ে পরে।’’
প্রায় একই ধারণা পোষণ করেন এক অভিভাবকও। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা ছোট বয়সে কাউন্সেলিং বুঝতাম না। বাবা-মা, বন্ধু এবং শিক্ষকই ছিলেন আমাদের মনের কথা বলার জায়গা। এমনও হয়েছে যে শিক্ষককে চরম ভয় পেয়েছি, মার খেয়েছি। আবার তাঁর কাছে গিয়েই না সব স্বীকার করতাম। তবে এখনকার খুদেদের মন বোঝাটাই মুশকিল হয়ে যায়। তাই বকুনি-মারধরের থেকেও আমার মনে হয় কাউন্সেলিংটাই বেশি জরুরি।’’
অণুপরিবারে বড় হওয়া, প্রযুক্তির উন্নতি, মুঠোফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া বা বিকেলবেলার খেলার মাঠ হারিয়ে যাওয়া— সব কিছুর প্রভাব পড়ছে ছোটদের উপর। ফলে পড়াশোনার ধরনও বদলাতে হচ্ছে, মনে করছেন শিক্ষকেরা। গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষিকা সুদেষ্ণা মৈত্র মনে করেন, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ উগরানোর জায়গা যেন ছাত্রছাত্রীরা না হয়। স্কুলের শিক্ষকদের দায়িত্ব, তাঁরা যেন স্কুলেই পড়ুয়াদের তৈরি করে নেন। সুদেষ্ণা বলেন, “আধুনিক যুগের শিশুরা অনেক বেশি সংবেদনশীল। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বকুনির পরিবর্তে কটাক্ষ শুনতে হচ্ছে তাদের। শিশুদের মন এখন আগের থেকে অনেক বেশি সংবেদনশীল বলেই তারা সহজে আহত হয়।’’ তাই শিক্ষকদেরও এখন আরও অনেক বেশি ধৈর্যশীল হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সুদেষ্ণা।
অভিভাবকদের একাংশ মনে করছেন বোঝানোর পাশাপাশি মাঝে মধ্যে ‘মার’-ও প্রয়োজন রয়েছে। তাই পার্ক ইনস্টিটিউশনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক বাসবকুমার মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, স্কুলে দিনের অনেকটা সময় কাটায় পড়ুয়ারা। জীবন গড়ার মূল স্থানই স্কুল। তাই বোঝানোর সঙ্গে চোখরাঙানি সব মিলিয়েই গড়ে তুলতে হবে পড়ুয়াদের। তবে অবশ্যই আইন এবং শিশুর মনে যাতে কোনও আঘাত না আসে সে বিষয় নজরে রাখা প্রয়োজন।