জনগণনার কাজে ফের যুক্ত করা হতে পারে শিক্ষকদের। তাঁরা সে কাজে ব্যস্ত থাকলে তার জেরেই পিছিয়ে যেতে পারে ২০২৭ সালের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। ইতিমধ্যেই মাধ্যমিক পিছিয়ে দেওয়ার জন্য স্কুল শিক্ষা দফতরের কাছে প্রস্তাবিত নির্ঘণ্ট পাঠিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। এ বার সেই পথে হাঁটতে চলেছে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদও।
মঙ্গলবার সংসদ সভাপতি অসিতকুমার মণ্ডল জানিয়েছেন, আগামী বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা ১৬ মার্চের পর থেকে শুরু করার কথা ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে। সেই অনুযায়ী নতুন পরীক্ষার নির্ঘণ্ট তৈরির কাজও চলছে।
পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে জনগণনার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা চলতে পারে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। এই কাজে বহু শিক্ষক-শিক্ষিকাকে যুক্ত থাকতে হবে। ফলে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ফেব্রুয়ারিতে মাধ্যমিক পরীক্ষা নেওয়া হলে শিক্ষক সঙ্কট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা। মধ্যশিক্ষা পর্ষদ তাই প্রস্তাব দিয়েছে, পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার।
সূত্রের খবর, পর্ষদের প্রস্তাবিত নতুন সূচি অনুযায়ী মার্চ মাসের প্রথম দিক থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু করার কথা বলা হয়েছে। প্রথম ভাষার পরীক্ষা দিয়ে শুরু হয়ে ১৬ মার্চ পরীক্ষা শেষ করার প্রস্তাব রয়েছে। যদিও এই নির্ঘণ্ট এখনও চূড়ান্ত নয়। স্কুলশিক্ষা দফতরের অনুমোদন সাপেক্ষেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:
এ বার একই কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সূচিতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি অসিতকুমার মণ্ডল জানিয়েছেন, মাধ্যমিকের প্রস্তাবিত সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১৬ মার্চের পর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। সেই অনুযায়ী পরীক্ষার রুটিন তৈরির কাজ চলছে।
তবে পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে শিক্ষকমহলে একাধিক মত উঠে আসছে। একাংশের বক্তব্য, জনগণনার কাজে যদি অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকাকে যুক্ত থাকতে হয়, তা হলে পরীক্ষার সময় তাঁদের পাওয়া কঠিন হবে। পরীক্ষার আয়োজন, পরিদর্শন এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়াই বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
আবার অনেক শিক্ষকই দাবি করছেন, জনগণনার কাজে যুক্ত থাকবেন না এমন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিয়ে পরীক্ষার দায়িত্ব সামলানো যেত। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব ছিল কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের প্রশ্ন, জনগণনার কাজে যুক্ত শিক্ষকদের বাদ দিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করে যথাসময়ে কি পরীক্ষা নেওয়া যেত না?
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “শিক্ষকদের শিক্ষা বহির্ভূত কাজে ব্যবহার করলে সার্বিক ভাবে যে শিক্ষারই ক্ষতি হয়, তা আজ রাজ্যবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। এসআইআর, নির্বাচনের কাজ থেকে শুরু করে জনগণনা— গত এক বছরের অধিকাংশ সময়ই শিক্ষক-শিক্ষিকারা স্কুলের বাইরে থেকেছেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে স্কুল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি পরীক্ষা পিছিয়ে দিতে হচ্ছে।” পাশাপাশি তাঁর দাবি, এর পর শিক্ষার অবনমন ঘটলে তার দায় শিক্ষকদের উপর চাপাতে চাইছে সরকার। এটা অন্যায়।
শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চ সাধারণ সম্পাদক কিংকর অধিকারী অবশ্য বলছেন, “সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সূচি বদলের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তাই আমার দাবি, এমন গুরুত্বপূর্ণ দু’টি পরীক্ষার সূচি না বদলে বরং জনগণনার সূচি বদলানো হোক। না হলে পড়ুয়াদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। ওরা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে পড়াশোনার উপর প্রভাব পড়বে। শিক্ষক হিসেবে সেটা আমরা মেনে নিতে পারি না।”
পরীক্ষা পিছোনোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখন স্কুল শিক্ষা দফতর এবং সংশ্লিষ্ট পর্ষদ ও সংসদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা।