জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ রাজ্যে সম্পূর্ণ ভাবে চালু হয়নি গত কয়েক বছরে। গত মে মাসে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর নতুন বিজেপি সরকার ঘোষণা করেছিল, এ বার হুবহু এই নীতি মেনেই এগোবে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা। তার পরই স্কুলশিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে নানা সংস্কারের ভাবনা শুরু হয়েছে।
সেই লক্ষ্যে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাঠ্যক্রম, পঠনপাঠন এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সামঞ্জস্য আনার কাজ শুরু হয়েছে। তৈরি হয়েছে টাস্ক ফোর্স। গত অগস্টে রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রম ও কারিকুলাম সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করা হয়। ইতিমধ্যেই সেই কমিটি কাজ শুরু করেছে। কমিটির মূল লক্ষ্য, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ অনুসরণ করে এমন একটি পাঠ্যক্রমের কাঠামো তৈরি করা, যা রাজ্যের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় একই রকম পাঠ্যক্রম তৈরি করা হবে। গোটা রাজ্যে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
কী কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে?
জানা গিয়েছে, পঠনপাঠনের পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও কিছু পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। পাঠ্যক্রমে আসতে চলেছে পরিবর্তন। সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে এক সূত্রে বাঁধার চেষ্টা করা হলেও স্বাধিকারে হস্তক্ষেপ করা হবে না বলে দাবি। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পাঠ্যক্রমে নিজেদের মতো কিছু পরিবর্তন করতে পারবে।
পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলক ভারতীয় জ্ঞানচর্চা
নতুন পাঠ্যক্রমে ভারতীয় জ্ঞানচর্চা বা ‘ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’ (আইকেএস) অন্তর্ভুক্ত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে ভারতের প্রাচীন জ্ঞানচর্চা, ঐতিহ্য এবং চিন্তাধারাকে যুক্ত করা হবে।
আরও পড়ুন:
যেমন অর্থনীতি পড়ার ক্ষেত্রে চাণক্যের অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই ভাবে গণিতের ক্ষেত্রে বৈদিক গণিত এবং ভারতের প্রাচীন গণিতচর্চার বিভিন্ন পদ্ধতি পড়ানো হবে। সাহিত্যেও যুক্ত হবে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য।
কমিটির দাবি, আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ভারতীয় জ্ঞান ও ঐতিহ্যের সংযোগ তৈরি করাই এর লক্ষ্য। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির পাঠ্যক্রমের মধ্যেই এই জ্ঞানচর্চাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানা যাচ্ছে। ফলে ভারতীয় জ্ঞানচর্চা শুধুমাত্র একটি পৃথক বিষয় হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবেও গুরুত্ব পেতে চলেছে।
বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা
নতুন পাঠ্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ইন্টার্নশিপ এবং স্কিল বেসড লার্নিং বা দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার উপর। এত দিন রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা থাকলেও তা বাধ্যতামূলক ছিল না। নতুন কাঠামোয় ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন পড়ুয়ারা। শুধু পুঁথিগত শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ব্যবহারিক দিক এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের উপরও জোর দেওয়া হবে।
চার বছরের স্নাতক ও অনার্স উইথ রিসার্চ
জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী চার বছরের স্নাতক (অনার্স) এবং অনার্স উইথ রিসার্চ কোর্স চালুর বিষয়টিও নতুন পাঠ্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজ্যের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কোর্সগুলি কার্যকর করার বিষয়ে উদ্যোগী হচ্ছে রাজ্য। চার বছরের স্নাতক পাঠক্রমের পাশাপাশি গবেষণামুখী শিক্ষার প্রসার ঘটানোই এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য। এর ফলে স্নাতক স্তর থেকেই গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা এবং উচ্চশিক্ষায় গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে ২০-৩০ শতাংশ পরিবর্তনের স্বাধীনতা
রাজ্যের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় যাতে প্রস্তাবিত পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে, তা নিশ্চিত করতে চাইছে সংশ্লিষ্ট কমিটি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে কিছুটা স্বাধীনতাও দেওয়া হবে। টাস্ক ফোর্সের তৈরি পাঠ্যক্রম ও কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্কের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পরিবর্তন করতে পারবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি।
অর্থাৎ, মূল কাঠামো অভিন্ন থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি নিজেদের মতো করে কিছু বিষয় সংযোজন, পরিবর্তন বা বিন্যাস করতে পারবে। তবে অধিকাংশ পাঠ্যক্রম যাতে একই কাঠামো অনুসরণ করে, সে দিকে নজর থাকবে কমিটির।
তৈরি হচ্ছে অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি
শুধু পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম নয়, কোন কোর্সে কত ক্রেডিট থাকবে, সেই ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্কও তৈরি করছে কমিটি। স্নাতক স্তরের বিভিন্ন কোর্সের ক্রেডিট নির্ধারণ, পাঠ্যক্রমের বিন্যাস এবং শিক্ষার কাঠামোয় সামঞ্জস্য আনার বিষয়টি এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পড়াশোনার কাঠামো ও ক্রেডিটের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বজায় রাখা সম্ভব হবে।
উচ্চশিক্ষা দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এবং বিভিন্ন স্তরে পরামর্শ ও আলোচনা করেই এই কাজ এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন টাস্ক ফোর্সের এক সদস্য। সব মিলিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ অনুসরণ করে রাজ্যের উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রমে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে চলেছে। অভিন্ন পাঠ্যক্রম, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, চার বছরের স্নাতক কোর্স, গবেষণামুখী পাঠক্রম এবং ভারতীয় জ্ঞানচর্চার অন্তর্ভুক্তি— এই বিষয়গুলিই নতুন শিক্ষাকাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হতে চলেছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ বাস্তবায়নের স্বার্থে উচ্চশিক্ষা দফতর দ্বারা গঠিত টাস্ক ফোর্সের পাঠ্যক্রমের কাঠামো তৈরির কমিটিতে রয়েছেন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কল্লোল পাল। তিনি বলেন, “রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় শিক্ষানীতির বাস্তবায়নের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সেখানে ইন্টার্নশিপের পাশাপাশি ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্ক, ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের বাস্তবায়ন সহ নানা দিক নিয়ে আলোচনা চলছে। পাঠ্যক্রমেরও পরিবর্তন করা হচ্ছে।”