কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কলেজগুলিতে কী ভাবে চলবে পঠনপাঠন, সে বিষয়ে নতুন রূপরেখা তৈরি করতে চাইছেন কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক ভাবে, আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে চার বছরের অনার্স উইথ রিসার্চ কোর্স। কোন কোন কলেজ কোন শর্তে এই পাঠক্রমে পড়ুয়া ভর্তি নিতে পারবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতি থাকবে।
পাশাপাশি, সেমেস্টার অনুযায়ী ক্লাসের সংখ্যা যেন না কম হয়, তা-ও নিশ্চিত করতে চাইছেন কর্তারা। প্রয়োজনে আগামী বছর থেকে কমানো হতে পারে পুজোর ছুটি। সে ক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তারা চাইছেন সরকারি নির্দেশিকা আসুক। না হলে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ করবেন।
সম্প্রতি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসে প্রায় ১৫০টি কলেজের অধ্যক্ষকে নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে এই বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অনার্স উইথ রিসার্চ চালুর যোগ্যতা। কলেজগুলিতে স্নাতক স্তরে অনার্স উইথ রিসার্চ চালুর ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলার উপরে জোর দিচ্ছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
সে ক্ষেত্রে কোনও কলেজের সংশ্লিষ্ট বিভাগে অন্তত দু’জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক না থাকলে সেই বিভাগে অনার্স উইথ রিসার্চ চালু করা সম্ভব হবে না। শিক্ষক গণনার ক্ষেত্রে স্থায়ী শিক্ষক নন, স্টেট এডেড কলেজ টিচার-দেরও (স্যাক্ট) বিবেচনা করা হবে বলে জানা গিয়েছে। এমনকি অধ্যক্ষ নিজেও যদি সংশ্লিষ্ট বিভাগে পিএইচডি-ধারী শিক্ষক হন, তবে তাঁকেও গণ্য করা হবে। অর্থাৎ, শুধু পরিকাঠামো থাকলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগ্য শিক্ষক থাকাও বাধ্যতামূলক।
অধ্যক্ষদের সঙ্গে বৈঠকে উঠে আসে কলেজগুলির পরিকাঠামোগত সমস্যা খতিয়ে দেখার বিষয়টিও। অভিযোগ, বিভিন্ন কলেজে শ্রেণিকক্ষ, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং অন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। সে বিষয়গুলি পর্যালোচনা করা হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে। কলেজগুলির তরফে উচ্চশিক্ষা দফতরে এ বিষয়ে জানানো হবে বলে দাবি।
সেমেস্টার ব্যবস্থায় অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার মেনে চলার বিষয়েও কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে। স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরের অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। সেই সূচি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নিতে হবে কলেজগুলিকে। কোনও ভাবেই পরীক্ষার দিন পিছিয়ে দেওয়া বা স্থগিত রাখা যাবে না। বিশেষত ডিসেম্বর-জানুয়ারি এবং জুন-জুলাইয়ের সেমেস্টার পরীক্ষার নির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলার উপরে জোর দেওয়া হয়েছে।
পুজোর মরসুমে দীর্ঘ দিন পঠনপাঠন বন্ধ থাকার ফলে পড়ুয়াদের ক্ষতি হচ্ছে বলেও অভিযোগ ওঠে। ওই বৈঠকে আলোচনা অধ্যক্ষদের বার্তা দেওয়া হয়েছে, পুজোর ছুটির কারণে কোনও ভাবেই যেন পঠনপাঠন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্তা জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ্যক্রম শেষ করা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্লাস নেওয়া বাধ্যতামূলক। ছুটি দীর্ঘায়িত হলে বা ক্লাসের সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব পড়বে সেমেস্টারের পাঠক্রম সম্পূর্ণ করার ক্ষেত্রে।
সূত্রের খবর, ছুটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত উচ্চশিক্ষা দফতর নিয়ে থাকে। কিন্তু পড়ুয়াদের যেন কোনও ভাবেই সমস্যা না হয় তা সুনিশ্চিত করতে বলা হয়েছে শিক্ষকদের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্তা বলেন, “সরকারের তরফ থেকে এই ছুটি কমিয়ে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি হলে ভাল হয়। না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি পরিবর্তন করে এই পুজোর ছুটি কমানো হতে পারে।”
মনে করা হচ্ছে, লক্ষ্মীপুজোর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কলেজগুলিও খুলে দেওয়া হতে পারে। ফের কালীপুজো-ভাইফোঁটা এবং ছটপুজোর জন্য আলাদা আলাদা ছুটি দেওয়া হবে। একেবারে পঞ্চমী থেকে ভাইফোঁটার পর পর্যন্ত লম্বা ছুটি সেমেস্টার পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই মনে করছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তা।
ক্লাসের সংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কড়া পদক্ষেপ করতে চাইছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তারা। এমনকি তাঁরা চাইছেন, বিজোড় সেমেস্টারের পরীক্ষার সময় যেন জোড় সেমেস্টারের পঠনপাঠন বন্ধ না থাকে। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষার ঘরে পরিদর্শকের দায়িত্ব সামলানোর পর কোনও শিক্ষক যেন কলেজ ছেড়ে চলে না যান, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে অধ্যক্ষকে। পরীক্ষার পর তাঁকে ক্লাস নিতে হবে।
উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়েও কড়া হতে চাইছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ, বহু শিক্ষকই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে অস্বীকার করেন। জানা গিয়েছে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ামক বিভাগ নতুন পোর্টালের মাধ্যমে পরীক্ষক এবং মূল্যায়নকেন্দ্রগুলির উপরে নজরদারি চালাবে। সময় মতো উত্তরপত্র মূল্যায়ন সম্পূর্ণ করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে। সেমেস্টার ব্যবস্থায় পরবর্তী পর্যায়ে উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে পার্ট বি-র নম্বর গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অ্যাসাইনমেন্ট এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন সময়মতো শেষ করার উপরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) সাগরতীর্থ সরকার বলেন, “জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ বাস্তুবায়ন এবং শিক্ষার উত্তরণ প্রসঙ্গে অধ্যক্ষদের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে।”