নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যোগ দেওয়ায় অভিনেতা ইমরান খানকে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করল বম্বে হাই কোর্ট। সোমবার আদালত তাঁকে মনে করিয়ে দেয়, তিনি আমেরিকার নাগরিক এবং ‘ওভারসিজ় সিটিজ়েন অফ ইন্ডিয়া’ (ওসিআই) কার্ডধারী। তাই ভারতীয় নাগরিকদের মতো রাজনৈতিক অধিকার এ দেশে তাঁর নেই। একই সঙ্গে আদালত প্রশ্ন তোলে, কোনও ভারতীয় নাগরিক যদি আমেরিকায় গিয়ে একই ধরনের প্রতিবাদে অংশ নেন, তা হলে তাঁর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হত!
আমির খানের ভাগ্নের উদ্দেশে বিচারপতিদের বেঞ্চ বলে, “আপনি একজন ওসিআই কার্ডধারী। আপনি ভারতীয় নাগরিকের মতো আচরণ (অধিকার সংক্রান্ত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া) করতে পারেন না। এসআইআর নিয়ে আপনার কিছু বলার নেই। প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার কোনও অধিকার আপনার ছিল না। আদালতের কাছে আপনাকে স্পষ্ট ভাবে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।”
ইমরানের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী বেঙ্কটেশ ধোন্ড জানান, ৪২ বছর বয়সি অভিনেতা জীবনের প্রায় পুরোটাই ভারতে কাটিয়েছেন। জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিকত্ব পেলেও তাঁর বেড়ে ওঠা এই দেশেই। তবে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, তা সত্ত্বেও তিনি ভারতীয় নাগরিক নন।
বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, “আপনি ভারতীয় নাগরিক নন। ধরুন, কোনও ভারতীয় নাগরিক অন্য কোনও দেশে, ধরুন আপনার দেশ আমেরিকায় গিয়ে এমন প্রতিবাদে যোগ দিলেন। তা হলে তাঁকে তো পরবর্তী বিমানে করে দেশে ফেরত পাঠানো হত।”
ভারতে জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটানো এবং বলিউডে পরিচিতি তৈরি করার পরেও ইমরান কেন ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি, সেই প্রশ্নও তোলে আদালত। বিচারপতিরা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আপনি এখানে রয়েছেন। ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করছেন না কেন? বলিউডেই তো আপনি তারকা হয়েছেন।”
অন্য এক পর্যবেক্ষণে আদালত জানায়, কয়েক দশক ভারতে থাকার ফলে ইমরান সম্ভবত নিজের ওসিআই কার্ডধারী পরিচয়ের কথাই ভুলে গিয়েছেন। বিচারপতিদের কথায়, “সম্ভবত এখানে অনেক দিন ধরে রয়েছেন। ৪০ বছরেরও বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছেন, তাই হয়তো মনে নেই যে আপনি একজন ওসিআই কার্ডধারী।”
ইমরানের দায়ের করা একটি মামলার শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ করে আদালত। ‘ফরেনার্স রিজিয়োনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস’ তাঁকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে যে ‘লিভ ইন্ডিয়া নোটিস’ জারি করেছিল, তাকে চ্যালেঞ্জ করেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অভিনেতা। গত সপ্তাহে প্রধান বিচারপতি এমসি ত্রিপাঠী এবং বিচারপতি অদ্বৈত শেঠনার বেঞ্চ ওই নোটিসের উপর স্থগিতাদেশ দেয়।
ইমরানের হয়ে সওয়াল করে ধোন্ড জানান, অভিনেতার জন্ম আমেরিকায় এবং সেই সূত্রেই তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তবে তাঁর গোটা জীবন কেটেছে ভারতে। আইনজীবী আরও জানান, ২০০৬ সালে ওসিআই মর্যাদা পাওয়ার আগে ইমরানের কাছে ‘পার্সন অফ ইন্ডিয়ান অরিজিন’ কার্ড ছিল। আইনজীবী আরও জানান, ইমরান ভারতে বিয়ে করেছেন এবং বলিউডে কাজ করেছেন। যদিও বর্তমানে তাঁর হাতে কোনও ছবির কাজ নেই।
অভিনেতার দাবি, প্রতিবাদে যোগ দেওয়া কোনও সংগঠন বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর কোনও যোগ নেই। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনও কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না বলেও আদালতকে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হন তিনি।
তবে ‘ফরেনার্স রিজিয়োনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস’-এর হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অনিল সিংহ এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি, প্রতিবাদে ইমরানের যোগ থাকার প্রমাণ রয়েছে। অভিনেতার সমাজমাধ্যমে করা পোস্ট এবং একটি সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকারটি ইমরানের তরফে আদালতে জমা দেওয়া হয়নি বলেও জানান অনিল। তাঁর যুক্তি, সমাজমাধ্যমে ইমরানের বিপুল অনুরাগী থাকায় তাঁর বক্তব্য বহু মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
অনিল আরও অভিযোগ করেন, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অতীতেও ইমরান একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন এবং উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও বিদেশি নাগরিক ক্ষমা চাইলেই অভিযোগ উপেক্ষা করা যায় না।
অন্য দিকে, তারকা হিসেবে ইমরানের বক্তব্যের প্রভাব কতটা হতে পারে, তা-ও মনে করিয়ে দেয় আদালত। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, “আপনি এক জন তারকা। আপনার কথার প্রভাব রয়েছে। এই দেশের উদারতা দেখুন। আপনি এক জন ওসিআই কার্ডধারী, অথচ আপনার সমস্ত পরিচিতি ভারত, মহারাষ্ট্র থেকেই এসেছে।” ধোন্ড জানান, ইমরান প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন না। ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে মক্কেলের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
আদালত ফের জানায়, ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতীয় নাগরিকদের মতো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে পারেন না। বিদেশি নাগরিকদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতার কথাও উল্লেখ করে বেঞ্চ।
‘ফরেনার্স রিজিয়োনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস’-এর অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেলের উদ্দেশে বিচারপতিরা বলেন, “আপনারা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। বহিষ্কার করার সম্পূর্ণ অধিকার আপনাদের রয়েছে। আপনাদের সেই ক্ষমতা নিয়ে আমাদের কোনও প্রশ্ন নেই। কিন্তু এখানে কী ঘটেছিল, সেটাই বিবেচ্য। মুম্বই পুলিশ যদি বলে, আদৌ কিছু ঘটেনি, তা হলে পরিস্থিতি অন্য রকম হবে।” তবে অনিল সিংহের বক্তব্য, আদালত যে ধরনের প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ চাইছে, তা না থাকলেও সরকারের পদক্ষেপ করার অধিকার রয়েছে। তাঁর দাবি, ইমরানের আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত ছিল।
বিদেশি নাগরিকদের প্রতি ভারতের মনোভাব নিয়ে আলোচনার সময় ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’— অর্থাৎ গোটা বিশ্বই এক পরিবার— নীতির কথাও উল্লেখ করে আদালত। পরে বেঞ্চ জানায়, ইমরান লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। বিচারপতিদের মন্তব্য, “এই দেশের উদারতা রয়েছে। আপনাকেও বড় মনের পরিচয় দিতে হবে।”
তবে ক্ষমা চাওয়া এবং লিখিত প্রতিশ্রুতিকে ভবিষ্যতে একই ধরনের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার অনুমতি হিসেবে দেখা যাবে না বলেও স্পষ্ট করে দেয় আদালত। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, “তাঁরা সরকারের দয়ায় এখানে রয়েছেন। এখানে থেকে সরকারের সমালোচনা করতে পারেন না। এটা মেনে নেওয়া যায় না। ক্ষমা চাওয়াকে সবুজ সঙ্কেত হিসেবে দেখা যাবে না।”
ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে পারেন না— এই অবস্থানও ফের জানিয়ে দেয় হাই কোর্ট। আপাতত ইমরানের বিরুদ্ধে জারি হওয়া ‘লিভ ইন্ডিয়া নোটিস’-এর উপর স্থগিতাদেশ বহাল রেখেছে আদালত। আগামী ৭ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানি।