বাড়িতে এখন দুই খুদে। এক জনের জন্মদিনের প্রস্তুতি চলছে। অন্য জনকে সামলাতেই হিমশিম অবস্থা। শ্রীময়ী চট্টরাজের সংসারে রবিবার দম ফেলার ফুরসত নেই। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যেও সোমবার মেয়ের জন্মদিনের আয়োজনে কোনও খামতি রাখতে চান না অভিনেত্রী। ছোট্ট রাইয়ের (কৃষভির ডাকনাম) জন্য কী কী পরিকল্পনা করেছেন তিনি এবং কাঞ্চন মল্লিক? কী-ই বা বিশেষ উপহার অপেক্ষা করছে মেয়ের জন্য? কথায় কথায় উঠে এল তারই আভাস।
ফোন ধরেই রবিবার রাতে শ্রীময়ীর গলায় ব্যস্ততার সুর। বললেন, ‘‘আজকে খুব চাপে পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ আমার আয়া চলে গিয়েছে। ওর শাশুড়ির শরীর খারাপ। তাই আজ ভোরবেলাতেই চলে গিয়েছে।’’ বাড়িতে দুই ছোট সন্তান। তাদের দেখাশোনার পাশাপাশি রয়েছে নিজের কাজও। সম্প্রতি শুটিংয়ের কিছু পর্বের কাজ শেষ করেছেন অভিনেত্রী। আপাতত তাঁর মন পড়ে মেয়ের জন্মদিনের আয়োজনে।
আরও পড়ুন:
রাইয়ের জন্মদিনে কী কী থাকছে? সকাল থেকেই কি শুরু হবে উদ্যাপন? শ্রীময়ী জানালেন, সকালটা কাটবে মেয়েকে স্নান করানো, তার জন্য রান্নাবান্না এবং পুজোর প্রস্তুতিতে। জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িতেই বিশেষ খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করেছেন। তবে সব রান্না একা হাতে করছেন না অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, ‘‘আমি পায়েসটা করব। আর আমার যে রান্নার দিদি আছেন, উনি অত্যন্ত ভাল খাবারদাবার বানান। আমার বাচ্চার খাবারও উনিই বানান।’’
কাঞ্চন, শ্রীময়ীর সঙ্গে কৃষভি। ফাইল ছবি
মেয়ের জন্মদিনের মেনুতেও থাকছে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। পাঁচ রকমের ভাজা, মাছের মুড়ো ভাজা, ডাল, ভাত এবং কয়েক রকম মাছের পদ। বাজারের দায়িত্ব নিয়েছেন কাঞ্চন। শ্রীময়ী বললেন, ‘‘কাঞ্চন আজ বাজার করে এনেছে। পাঁচ রকমের ভাজা হবে, মাছের মুড়ো ভাজা হবে। আরও দু’-তিন রকম মাছ করার ইচ্ছে আছে।’’
তবে যার জন্মদিন, সে কি আদৌ এত কিছু খেতে পারবে? হাসতে হাসতেই অভিনেত্রী জানালেন, ‘‘ডাল, ভাত এগুলো তো এখনও সেই অর্থে খেতে পারে না। তবু যেটা ওর নামে দেওয়ার মতো, সেটাই দেব।’’
মেয়ের জন্মদিনে বিশেষ আয়োজন কাঞ্চন, শ্রীময়ীর। ফাইল ছবি
জন্মদিন মানেই শুধু খাওয়াদাওয়া নয়। মেয়েকে নিয়ে মন্দিরেও যেতে চান শ্রীময়ী। কিন্তু কাঞ্চনের শুটিং রয়েছে। তা হলে কী ভাবে হবে সব আয়োজন? অভিনেত্রী জানালেন, নতুন কাজ শুরু হওয়ায় জন্মদিনেও ছুটি নিতে পারেননি কাঞ্চন। তবে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করবেন তিনি। শ্রীময়ীর কথায়, ‘‘কাঞ্চন বলেছে, যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি চলে আসবে, প্রথমার্ধের মধ্যেই। যাতে দুপুরের খাওয়াটা একসঙ্গে করা যায়।’’
তার পর মেয়েকে নিয়ে পুজো দিতে যাওয়ার পরিকল্পনা। বাড়ির সামনের একটি কালীমন্দিরে নিয়মিত পুজো দেন তাঁরা। জন্মদিনেও সেখানে যাবেন। পাশাপাশি ইসকনে যাওয়ার ইচ্ছে রয়েছে। সময় পেলে কালীঘাটেও যেতে চান শ্রীময়ী। বললেন, ‘‘অন্য বছর কালীঘাট যাই। ইসকনেও যাই। ওর জন্ম কালীপুজোর পরের পরের দিন। ইচ্ছে আছে কালীঘাটেও এক বার যাব, যদি সময় কুলোয়।’’
তবে এ বার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। বাড়িতে রয়েছে ছোট্ট গদাই (তাঁদের ছেলের ডাকনাম)। তাকে রেখে দীর্ঘ ক্ষণ বাইরে থাকা সহজ নয়। শ্রীময়ী বললেন, ‘‘এখন গদাই ছোট। বাড়িতে কেউ নেই। এক জনকে নিয়ে বেরোলে আর এক জনকে একটা দিদির ভরসায় রেখে যাওয়া খুব কঠিন।’’ তাই আপাতত বাড়ির কাছাকাছিই ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা করেছেন তাঁরা।
জন্মদিনে মেয়ের জন্য কী উপহার কিনেছেন কাঞ্চন? এই প্রশ্নেই রহস্য বাড়ালেন শ্রীময়ী। জানালেন, রাইয়ের জন্য বিশেষ একটি উপহারের ব্যবস্থা করেছেন কাঞ্চন। সেটি অবশ্য শুধু বাবার তরফ থেকে নয়, মা-বাবা দু’জনের তরফ থেকেই। কী সেই উপহার, তা এখনই প্রকাশ করতে নারাজ অভিনেত্রী। শ্রীময়ীর কথায়, ‘‘একটা দুর্দান্ত বিশেষ উপহার ওকে দিয়েছে কাঞ্চন, আমাদের দু’জনের তরফ থেকে। সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য। এখন বলতে পারব না।’’
কী এমন উপহার, যা নিয়ে এত গোপনীয়তা? অভিনেত্রী স্পষ্ট করলেন, সাধারণ কোনও উপহার নয় সেটি। বললেন, ‘‘এটা ওর জন্যই বিশেষ ভাবে করা। ছোটখাটো ব্যাপার নয়। সোনাদানা, গয়না কিছু দিলাম, সে রকম ব্যাপারও নয়। খুব সুন্দর একটা ব্যাপার। তবে সেটা এখন বলতে পারব না।’’ অর্থাৎ, মেয়ের জন্মদিনে কাঞ্চন-শ্রীময়ীর তরফ থেকে যে বিশেষ চমক থাকছে, তা আপাতত রহস্যই।
মেয়ের জন্য পায়েস রাঁধবেন শ্রীময়ী। ফাইল ছবি
অবশ্য উপহারের তালিকা সেখানেই শেষ নয়। জন্মদিন উপলক্ষে রাইয়ের জন্য এসেছে প্রচুর নতুন জামাকাপড়, জুতো এবং গয়না। প্রতি বছর মেয়েকে কিছু না কিছু উপহার দেওয়ার ইচ্ছে রয়েছে শ্রীময়ীর। বললেন, ‘‘আমার ইচ্ছে ছিল প্রত্যেক বছর ওকে কিছু না কিছু উপহার দেব। আমার নিজের সোনাদানার প্রতি তেমন আকর্ষণ নেই। কিন্তু এখন যা সোনার দাম! আগের বছরও ওকে দিয়েছিলাম। অক্ষয়তৃতীয়ার সময়েও দিয়েছি। ওইগুলোই পরবে।’’
তবে মেয়েকে সাজানোও কম ঝক্কির নয়। কারণ, গয়না পরতে একেবারেই পছন্দ করে না রাই। অভিনেত্রীর কথায়, ‘‘ও কিছুই রাখতে চায় না গলায়। টেনে ছিঁড়ে দেয়। চেন হোক বা নূপুর। তবে জামা হয়েছে প্রচুর।’’
জন্মদিনের এত আয়োজন, অথচ রাইয়ের পছন্দের খাবারের তালিকা শুনলে অবাক হতে হয়। বাড়িতে পাঁচ রকমের ভাজা কিংবা মাছের নানা পদ তৈরি হলেও ছোট্ট রাইয়ের মন পড়ে থাকে চকোলেট, ললিপপ আর চিপসে! শ্রীময়ী জানালেন, মেয়েকে খাওয়ানোই এখন তাঁর অন্যতম বড় চিন্তা। সাধারণ খাবারের প্রতি রাইয়ের তেমন আগ্রহ নেই। বরং বড়দের খাবারের স্বাদ নিতেই বেশি পছন্দ করে। অভিনেত্রীর কথায়, ‘‘চকোলেট, ললিপপ, বাইরের যত রকম খাবার, সব ওর পছন্দ। আমি অবাক হয়ে যাই, এই বয়সে ও কী করে এত ঝাল খেতে পারে!’’
মেয়ের এই খাদ্যাভ্যাস নিয়ে চিকিৎসকের কাছেও বকুনি খেয়েছেন শ্রীময়ী। বললেন, ‘‘ডাক্তারবাবু আমাকে এক বার খুব বকেছিলেন। আমি বলেছিলাম, স্যর, ও নিজের খাবার খেতে চায় না। তখন উনি বললেন, বাইরের খাবারের স্বাদ কী করে বুঝল? আপনারাই তো অভ্যাস খারাপ করেছেন!’’ চিকিৎসকের সেই কথা শুনে আর বিশেষ উত্তর দিতে পারেননি অভিনেত্রী। কিন্তু মেয়ের খাওয়াদাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা কমেনি। ‘‘খাবারের প্রতি ওর খুব অনীহা। এই খাওয়ানোর জন্য আমি দিনরাত কাঁদি। ন্যানিরাও ফেল হয়ে যাচ্ছে। দু’-তিন ঘণ্টা মুখে খাবার রেখে দেয়। তার পর বার করে দেয়। অথচ চকোলেট, ললিপপ বা চিপস গুঁড়ো করে দিলে ঠিক খেয়ে নেয়।’’
মেয়ের জন্মদিনের প্রস্তুতির পাশাপাশি এখন শ্রীময়ীর দিনের অনেকটা সময় কাটে দুই সন্তানের খুনসুটি সামলাতে। রাই এখন দিদি হয়েছে। কিন্তু ছোট ভাই গদাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের সমীকরণ এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি। কারণ, রাইয়ের একটাই অভিযোগ— গদাই কেন তার সঙ্গে খেলা করে না? শ্রীময়ী জানালেন, পরিবারের অন্য বাচ্চারা রাইয়ের সঙ্গে খেলে। তাদের বয়সও খুব বেশি নয়। ফলে তাদের সঙ্গে সহজেই ভাব জমে যায় রাইয়ের। কিন্তু গদাই এখনও এতটাই ছোট যে দিদির কথা বা খেলার আবদার কিছুই বোঝে না।
আর তাতেই যত বিপত্তি! শ্রীময়ী বললেন, ‘‘আমার বোনের ছেলের বয়স চার, দাদার ছেলের সাড়ে তিন। ওরা রাইয়ের সঙ্গে খেলে। ওর কথা বোঝে। কিন্তু গদাই তো এত ছোট, কিছুই বুঝতে পারে না। রাইয়ের মনে হয়, গদাই কেন ওর সঙ্গে খেলছে না!’’ শুধু অভিমান নয়, কখনও কখনও ছোট ভাইয়ের উপর রাগও দেখায় রাই। অভিনেত্রীর কথায়, ‘‘আজকেই ঝুমঝুমি দিয়ে আদর করতে গিয়ে কপালে মেরে দিয়েছে। প্রায় দিনই মাথায় মেরে দেয়। আবার কখনও চিমটি কেটে চলে আসে।’’
এখানেই শেষ নয়। মা-বাবার কোলে ছোট ভাইকে দেখলেও আপত্তি রাইয়ের। শ্রীময়ী জানালেন, গদাইকে কোলে নিলেই রাই বলে ওঠে, ‘‘নামাও, নামিয়ে দাও। গদাই পচা। আমাকে নাও।’’ আবার কখনও ভাইকে সরাসরি প্রশ্ন করে, ‘‘তুমি আমার সঙ্গে খেলবে না কেন?’’অথচ ছোট্ট গদাই তখন কিছুই বুঝতে পারে না। কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।
রাইয়ের ভাল নামের পাশাপাশি রয়েছে একাধিক ডাকনাম। কখনও গুটগুটি, কখনও মাম্মাবুড়ি। আবার গদাইয়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে মেয়ের আর একটি নাম রেখেছেন অভিনেত্রী— গোপী। যদিও সেই নামে এখনও বিশেষ কেউ ডাকে না। শ্রীময়ী বললেন, ‘‘ওকে গুটগুটি বলি, মাম্মাবুড়ি বলি। আবার নিজেই বলে, ‘আমি তোমার গুটগুটি।’ কখনও বলে, ‘আমি তোমার শাশুড়ি।’’ মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে যেমন হাসি পায়, তেমনই অবাকও হন অভিনেত্রী।
শুটিং থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবেন কাঞ্চন। ফাইল ছবি
জন্মদিন নিয়েও এখন যথেষ্ট সচেতন রাই। কেক কাটতে হবে, সবাইকে ‘হ্যাপি বার্থডে’ বলতে হবে— সবই যেন বুঝে গিয়েছে সে। শ্রীময়ী জানালেন, ‘‘আজকেই বলেছে, ‘আমার জন্মদিন, কেক কাটব না?’ পুরো বড় মানুষের মতো কথা বলে। লোকে ভাবে আমি শিখিয়ে দিই।’’
এত কথা বলতে শিখেছে রাই। তা হলে কি এ বার স্কুলে যাওয়ার পালা? শ্রীময়ী জানালেন, মেয়েকে প্লে-স্কুলে পাঠানোর পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই করেছেন। ভর্তির ব্যবস্থাও হয়েছে। তবে এখনও নিয়মিত পাঠানো শুরু করতে পারেননি। কারণ, এক দিকে আবহাওয়ার পরিবর্তনে শিশুদের সর্দি-কাশি ও সংক্রমণের আশঙ্কা, অন্য দিকে সদ্য অস্ত্রোপচারের পর নিজের শারীরিক ধকল সামলানো— সব মিলিয়ে একটু সময় নিতে চাইছেন অভিনেত্রী। তবে মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি স্কুলে পাঠাতে মনও চাইছে না তাঁর। শৈশবের এই সময়টা আরও কিছু দিন নিজের মতো করে কাটাক রাই, এমন ইচ্ছেও রয়েছে মায়ের। তবে চিকিৎসক তাঁকে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। অতিরিক্ত আদরে শিশুর স্বাভাবিক অভ্যাস গড়ে ওঠার পথে বাধা তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন।