সোফায় গুছিয়ে বসে টিভি দেখতে দেখতে রাতের খাওয়া সারেন রোজ। অথবা বিছানায় বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে খাবার মুখে তোলেন। ওটিটি সিরিজ দেখতে দেখতে বা সিরিয়াল চালিয়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই। ছোটরা আবার খাওয়ার সময়ে টিভিতে কার্টুন দেখার বায়না করে। আর তা করতে গিয়েই বিপদ ঘনাচ্ছে অজান্তেই। টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস শুধু ক্ষতিকরই নয়, বিপজ্জনকও। এমনই বলছেন গবেষকেরা। তা থেকে যেমন পেটের রোগ হতে পারে, তেমনই ক্ষতি হতে পারে মস্তিষ্কেরও।
টিভি, মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে খাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘মাইন্ডলেস ইটিং’, অর্থাৎ, অসচেতন ভাবে খাবার খাওয়ার অভ্যাস। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, আপনি কী খাচ্ছেন, খাবারের স্বাদ কেমন, সেই সময়ে পেটের ভিতরে কী ঘটছে, পাকস্থলী কতটা খাবার হজম করতে পারছে— এই সব খবরই ভেগাস স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। কিন্তু মস্তিষ্ক যদি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকে, তা হলে এই খবরাখবর সেখানে সঠিক পথে পৌঁছোতে পারে না। মস্তিষ্কের যে অংশটি দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত থাকে, সেটি একই সঙ্গে খাবারের স্বাদ, গন্ধ বা পরিমাণ বোঝার কাজটি ঠিকমতো করতে পারে না। তখনই গোলমাল ঘটে। খাবার যেমন ঠিকমতো হজম হতে পারে না, তেমনই নানা অসুখও মাথাচাড়া দিতে থাকে।
আরও পড়ুন:
টিভি দেখতে দেখতে খাওয়ার সময়ে কী কী ঘটে শরীরে?
বিপাকক্রিয়ার নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। খাবার খাওয়ার পর সেটি কী ভাবে পাকস্থলীতে পৌঁছোবে, কতটা শোষিত হবে, কতটা অন্ত্রে যাবে, তার হিসেবনিকেশ আছে। সেটির সঙ্কেত আসে মস্তিষ্ক থেকে। পেট যখন ভরে যায়, মনে হয় আর খেতে পারছেন না, তখন লেপ্টিন নামক একটি হরমোন ক্ষরিত হয়। এই হরমোনের কাজ হল মস্তিষ্কে সঙ্কেত পাঠানো যে, আর খাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু টিভি দেখার সময়ে মনোযোগ স্ক্রিনে থাকায় মস্তিষ্ক এই সঙ্কেত সময়মতো গ্রহণ করতে পারে না। ফলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেললেও পেট ভরার তৃপ্তি পাওয়া যায় না। এর ফল হয় দুটো—
১) স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ক্যালোরি শরীরে ঢোকে, ফলে ওজন বাড়তে থাকে।
২) মস্তিষ্ক যেহেতু খাবারের স্বাদ ও পরিমাণের হিসেব রাখতে পারে না, তাই হজমের প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়। ফলে গ্যাস, পেট ফাঁপা, অম্বলের সমস্যা দেখা দেয়। অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যাও হতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, সারাদিনের কাজ সেরে রাতে আয়েস করে টিভি দেখতে দেখতে খেতে ভালই লাগে। কিন্তু যাঁরা দিনের পর দিন এটি করেন, তাঁদের তলপেটে মেদ বেশি জমে। ‘মাইন্ডলেস ইটিং’-এর আরও একটি খারাপ দিক আছে। সেটি হল হরমোনের গোলমাল। টিভি দেখার আনন্দে ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়ে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার পরেও মস্তিষ্ক আরও খাওয়ার জন্য লোভ দেখাতে থাকে। এতে চাপ পড়ে পাকস্থলীর উপরে। পাকস্থলীতে রক্তের প্রবাহ কমে যায়। ফলে লাগাতার পেটের সমস্যা, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা ভোগাতে থাকে। এই অভ্যাসের কারণে ইনসুলিন হরমোনের ক্ষরণেও তারতম্য ঘটে। বেড়ে যায় ফ্যাটি লিভার, টাইপ ২ ডায়াবিটিসের ঝুঁকি।