সন্তানের জন্ম দেওয়ার পরে নতুন করে ব্যায়াম শুরু করা বেশ জটিল ব্যাপার। মা হওয়ার পরে শরীরে নানা বদল আসে। বদল আসে মনেও। এই সব ধকল সামলে ব্যায়াম শুরু করা এবং নিয়মিত শারীরচর্চার মধ্যে থাকা সহজ নয়। আসলে প্রসবের পরেই একজন মায়ের চেহারায় নানা বদল আসে। ওজন বেড়ে যায়, চেহারার গড়নও বদলে যায়। আগের মতো আর থাকে না। চেহারার এই বদলে যাওয়াই মেনে নিতে সমস্যা হয় অনেকের। সে কারণে দেখা যায়, অনেক মহিলাই মা হওয়ার পর পরই ব্যায়াম শুরু করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফিরতে চান পুরোনো ফিটনেস রুটিনে। ওজন তুলে ব্যায়াম, কার্ডিয়ো বা যন্ত্রপাতি নিয়ে ভারী ব্যায়ামও করতে দেখা যায় অনেককে। আর ভুলটা হয় সেখানেই। প্রথমত, প্রসবের পর পরই ব্যায়াম শুরু করলে ওজন চট করে কমে না, যা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, শরীরের অবস্থা না বুঝে পরিশ্রম করে ওজন কমাতে গিয়ে আরও বড় শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়।
প্রসবকালীন অবস্থায় ও তার পরে শরীরের উপর অনেকখানিই ধকল যায়। রাতের পর জাগতে হয় মায়েদের, স্তন্যপান করানো, শিশুর দেখাশোনা করার শ্রম তো রয়েছেই। এই পর্বে কখনও তলপেট ও কোমরে অসহ্য যন্ত্রণা হয়, কখনও অতিরিক্ত রক্তপাত হয়। প্রস্রাবের বেগ চেপে রাখতে পারেন না অনেকে। হরমোনের গোলমালও হয়। শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে অনেকটাই সময় লেগে যায়। তাই ওই সময়টায় বেশি ব্যায়াম করলে যন্ত্রণা আরও বাড়তে পারে, প্রস্রাবের সমস্যা হতে পারে, প্রসবকালীন অবস্থার পরে ঋতুস্রাব অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে। বহ্যায়াম করতে গিয়ে আঘাত লাগার আশঙ্কাও বাড়ে। তাই শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া প্রয়োজন। সেই সময়টা ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ বা তার বেশিও হতে পারে। মায়েরা যখন বুঝবেন যে, শরীর ব্যায়াম করার মতো অবস্থায় এসেছে, তখনই তা শুরু করা উচিত। প্রসবকালীন অবস্থায় যদি জটিলতা তৈরি হয়, তা হলে বিশ্রামের সময়টা আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন।
প্রসবের কতদিন পর থেকে ব্যায়াম শুরু করা উচিত?
প্রসবের পরে ব্যায়াম শুরু করারও নিয়ম আছে। কয়েকটি ধাপে তা করা জরুরি— রিকানেকশন বা শরীরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, এনগেজমেন্ট, অ্যাক্টিভেশন এবং প্রোগ্রেশন।
শরীরের সঙ্গে সংযোগ
নিজের শরীরকে আগের মতো জেনেবুঝে নেওয়া। একেই ফিটনেস প্রশিক্ষকেরা বলছেন ‘রিকানেকশন’, অর্থাৎ, শরীরের সঙ্গে ফের সংযোগ স্থাপন করা। শরীর কখন বিশ্রাম চাইছে, আর কখন সে দৌড়ঝাঁপ করার জন্য প্রস্তুত, তা বোঝা খুব জরুরি। জোর করে ব্যায়াম করতে গেলে বা আগের মতো হঠাৎ করেই দৌড়ঝাঁপ, ভারী ওজন তোলা বা ক্রাঞ্চ শুরু করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
আরও পড়ুন:
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ভ্রূণকে ধারণ করার জন্য জরায়ুর বৃদ্ধি হয়। ফলে পেটের পেশিগুলি দু’পাশে সরে যায়। শ্রোণিদেশ বা পেলভিক অঞ্চলের পেশিগুলির উপর চাপ বাড়ে। প্রসবের পরে সেই পেশিগুলি তাদের আগের অবস্থানে ফিরে আসতে কিছুটা সময় নেয়। ওই সময়ে শরীরের বিভিন্ন কোষ, পেশি ও স্নায়ুর ক্লান্তি বাড়ে, তাদের সঙ্কোচন-প্রসারণের প্রক্রিয়াও ধীরে হয়। তাই তলপেটের পেশি মোচড় দিয়ে ব্যায়াম, সিট-আপ বা ক্রাঞ্চ অথবা পিলাটেজ় যাতে শরীরের বিভিন্ন পেশির স্ট্রেচিং হয়, এমন ব্যায়াম করতে গেলে পেশির জড়তা আরও বাড়বে। আচমকা শর্করার মাত্রা ও রক্তচাপ কমে যেতে পারে। পেশির খিঁচুনিও শুরু হতে পারে, যা নতুন মায়েদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। সে কারণেই শরীরের সঙ্গে আগে সংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন। শরীরকে বোঝাতে হবে যে, সে আগের মতো নড়াচড়া করতে প্রস্তুত। কী ভাবে তা হবে?
দিনে কিছুটা সময় নিজের মতো কাটানো, হালকা হাঁটাচলা করা, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, শরীরের পরিচর্যা করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, দিনে কিছুটা সময় মেডিটেশন করা, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করা— এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলিই শরীরের বিভিন্ন পেশিগুলিকে সক্রিয় করে তুলবে। ব্যায়াম করার মতো শক্তি তৈরি হবে। মনের জোরও ফিরবে। লোক দেখানো বা বাধ্যতামূলক ভাবে ব্যায়াম করার চেয়ে তা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে।
মা হওয়ার পরে যে ভাবে শরীরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে!
এনগেজমেন্ট
শরীরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হওয়ার পরে ব্যায়াম শুরু করতে হবে নিয়ম মেনে। এই পর্বে যে ব্যায়ামগুলি সবচেয়ে আগে করা উচিত তা হল ‘কোর এক্সারসাইজ়’। অনেকেই মনে করেন ‘কোর’ মানে কেবল পেটের পেশি। তা নয়। ‘কমপ্লিট কোর’ বা সম্পূর্ণ কোর এলাকার মধ্যে পড়ে— পেলভিক ফ্লোর (শ্রোণিদেশের পেশি), ডায়াফ্রাম (মধ্যচ্ছদা বা ফুসফুসের নীচের অংশের পেশি যা হার্ট ও ফুসফুসকে আলাদা রাখে), পেটের পেশি, গ্লুট (নিতম্বের পেশি)ও পিঠের নীচের অংশের পেশি। তাই কোর ব্যায়াম মানে শুধু পেটে চেপে বা মোচড় দিয়ে ব্যায়াম নয়। বরং গোটা এলাকার পেশির সক্রিয়তা বাড়বে এমন ব্যায়াম। এই ধরনের ব্যায়ামকে বলে ‘কোর রেস্টোরেশন’। প্রশিক্ষকের সাহায্য নিয়ে শরীর বুঝেই তা করতে হবে।
অ্যাক্টিভেশন
এনগেজমেন্ট পর্বে শরীর সক্রিয় হবে, পেশির জোর ধীরে ধীরে বাড়বে। ব্যায়ামের ধকল সইয়ে নেওয়ার মতো ক্ষমতা তৈরি হবে। তাই পরের পর্বটি হবে ‘অ্যাক্টিভেশন’, অর্থাৎ, পেশির শক্তি ও ভারসাম্য বৃদ্ধির ব্যায়াম। এই পর্যায়ে ভারী ওজন না তুলে হালকা কার্ডিয়ো, রেজ়িস্ট্যান্স ব্যান্ড নিয়ে ব্যায়াম করা যেতে পারে। রেজ়িস্ট্যান্স ব্যান্ড নিয়ে ব্যায়াম করলে খুব দ্রুত ওজন কমে। পেশির জোর বাড়ে। বডি টোনিং করার যে সব ব্যায়াম আছে, সেগুলির মধ্যে রেজ়িস্ট্যান্স ব্যান্ড নিয়ে ব্যায়াম করা সহজ। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ব্যায়াম করতে গিয়ে গা, হাত-পায়ে অত্যধিক যন্ত্রণা হচ্ছে কি না। যদি দেখা যায় পেট বা কোমরের নীচে ব্যথা বেশি হচ্ছে, পেশি ফুলে উঠছে, প্রস্রাবের বেগ চেপে রাখতে পারছেন না, তা হলে তৎক্ষণাৎ ব্যায়াম বন্ধ করতে হবে।
প্রোগ্রেশন
এনগেজমেন্ট, অ্যাক্টিভেশন পর্বটি শরীরকে ‘ওয়ার্ম আপ’ করবে অর্থাৎ, আগের মতো ফিটনেস রুটিনে ফেরার জন্য প্রস্তুত করবে। এর পরের ধাপটি হল ‘প্রোগ্রেশন’। এই পর্ব থেকে ধীরে ধীরে পুরনো রুটিনে ফেরা যেতে পারে। তবে এই পর্বটি সকলের জন্য এক রকম নয়। যিনি আগে থেকেই ব্যায়াম করে অভ্যস্ত, তিনি দৌড়, জগিং, স্ট্রেচিং বা কার্ডিয়ো শুরু করতে পারেন। আর যিনি আগে ব্যায়াম তেমন ভাবে করেননি, তাঁকে শুরু করতে হবে স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম দিয়ে। ব্যায়াম কেমন হবে, কতক্ষণ তা করতে হবে, সেটি ফিটনেস প্রশিক্ষকের থেকেই জেনে নিতে হবে। যে দিন শরীরের উপর ধকল বেশি যাবে, রাত জাগা, কম ঘুম, অবসাদ বা কোনও অসুস্থতা হলে, সে দিন বেশি ব্যায়াম করা যাবে না। এই পর্বে ব্যায়ামের একটি সময়সূচি তৈরি করতে হবে। রোজ ভারী ব্যায়াম নয়, শরীর বুঝে হালকা ব্যায়াম ও স্ট্রেচিংও করতে হবে। এবং সবটাই করতে হবে প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে।