ঘুমের মধ্যে শরীর জুড়ে প্রবল ঝাঁকুনি। ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যায় হৃৎস্পন্দন। কেউ জানার আগেই সব শেষ। চিকিৎসকেরা জানান, গভীর ঘুমেই মারাত্মক খিঁচুনিতে মৃত্যু হয়েছে ৩৩ বছর বয়সি টিভি তারকা অনুজ ঠাকুরের। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই রোগের নাম ‘নক্টার্নাল সিজ়ার’।
অনুজের পরিবার জানিয়েছে, ভোর সাড়ে ৪টেয় তিনি ঘুম থেকে উঠতেন। নিয়মিত প্রাতর্ভ্রমণ করতেন। শরীর নিয়ে বরাবরই সচেতন ছিলেন অভিনেতা। তার পরেও কী ভাবে এমন হল, তা বঝতেই পারছেন না তাঁর আপনজনেরা। রাতে ঘুমের মধ্যে অনুজের যে খিঁচুনি হয়, তা আগে জানা যায়নি। ঘটনার দিন রাতেও কেউ বুঝতে পারেননি। সকালে দেখা যায় তাঁর নিথর দেহ পড়ে রয়েছে।
ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি কোন রোগের লক্ষণ?
মস্তিষ্কে অসংখ্য সূক্ষ্ম স্নায়ুর ‘সার্কিট’ থাকে, যা শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে। সেই স্নায়ুর সার্কিটে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বাহিত হয়। এই বৈদ্যুতিক তরঙ্গই স্নায়ুর মাধ্যমে বার্তা আদানপ্রদান করে। যদি এই সার্কিটে গোলমাল হয়, তখন মস্তিষ্ক থেকে সঙ্কেত সারা শরীরে পৌঁছোতে পারে না। ফলে প্রবল ঝাঁকুনি হতে থাকে। মৃগী রোগের কারণও অনেকটা এমনই। তবে অনুজ ঠাকুরের মৃগী ছিল কি না, জানা যায়নি। যে রোগটি তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিল, সেটিকে বলে ‘নক্টার্নাল সিজ়ার’। রাতের বেলায় মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের চলাচল হঠাৎ করে স্তব্ধ হয়ে গেলে, তখন প্রবল ঝাঁকুনি হয় শরীরে। এটি এতটাই মারাত্মক আকারে হয় যে, আচমকাই থেমে যেতে পারে হৃদ্যন্ত্র, অনিয়মিত হতে পারে হৃৎস্পন্দন। এমনকি শ্বাসপ্রশ্বাসও থেমে যেতে পারে। মস্তিষ্কের কোষে এতটাই চাপ পড়ে যে, ঘুমের মধ্যে হৃদ্রোগে বা ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারেন রোগী।
আরও পড়ুন:
কাদের ঝুঁকি বেশি?
রোগীর নিজের বা পরিবারে মৃগী রোগের ইতিহাস থাকলে নক্টার্নাল সিজ়ার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তা ছাড়া দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, অনিদ্রা বা মানসিক উদ্বেগ থেকেও এমন হতে পারে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, রক্তে শর্করার মাত্রা আচমকা কমে গেলে বা সোডিয়াম-পটাশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হলে খিঁচুনি হতে পারে।
মস্তিষ্কের কোষে কোনওরকম সংক্রমণ হলে, মাথায় পুরনো আঘাত থেকে প্রদাহ বাড়লে অথবা ব্রেন টিউমার বাসা বাঁধলেও ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি হতে পারে।
যাঁরা অধিক মদ্যপান করেন, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ বেশি খান, অথবা শক্তিবর্ধক নানা প্রকার ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট নেন, তাঁদেরও কিছু ক্ষেত্রে এমন হতে পারে।
ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি হলে তা বোঝা খুব কঠিন। তবে খেয়াল রাখতে হবে রোগী ঘুমের মধ্যে ছটফট করছেন কি না, তাঁর দমবন্ধ হয়ে আসছে কি না অথবা ঘুমের মধ্যে মুখ থেকে অস্বাভাবিক শব্দ বার করছেন কি না। খিঁচুনি হলে নাকের বদলে মুখ দিয়ে শ্বাস নেবেন রোগী, তাঁর ঠোঁট এক দিকে বেঁকে যেতেও পারে। তেমন লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে ইইজি (ইলেকট্রোএনসেফ্যালোগ্রাম) ও এমআরআই টেস্ট করিয়ে নিতে হবে। সেই সঙ্গে সুগার, সোডিয়াম-পটাশিয়ামের টেস্টও জরুরি।