‘আরশোলাদের খুলেছে বরাত’। তিন দশক আগে, দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরের দমবন্ধ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আরশোলাদের বরাত খোলার গান শুনিয়েছিলেন কবীর সুমন। আজ গোটা দেশে আরশোলাদের বরাত খুলেছে কি না বলা মুশকিল, তবে যে ভাবে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী নিজেদের ‘আরশোলা’ ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজপথে পিলপিল করে নেমে এসে নরেন্দ্র মোদী সরকারকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করল, তাতে দেশের স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠে গিয়েছে।
বিচারপতির এক অসতর্ক মন্তব্যে হঠাৎ এমন ঝড় উঠল যে, এক মঞ্চে চলে এল লাখো আরশোলা।
নানান ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিলই; শুধু একটু হাওয়া দরকার ছিল।
মূল উদ্বেগ, বাজারে চাকরি অপ্রতুল। ফলে, বিপুল খরচ ও পরিশ্রম করে তার পর ডিগ্রিধারী বেকার হয়ে থাকতে হচ্ছে।
চক্রটা এমন: অভিজাত সরকারি কলেজগুলোতে সীমিত আসনের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা, কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার বিপুল খরচ। সেই খরচ করেও চাকরি পাওয়া যাবে কি না, সে নিয়ে আছে বড় সংশয়। ফলে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশিকা পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তাতে অন্তত শিক্ষার খরচ কম। নিটের মতো পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তাই গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়— শুধু ছাত্র-ছাত্রী নয়, তাঁদের অভিভাবকদের মধ্যেও।
এই সংখ্যাটা বিশাল। ১৪০ কোটির দেশে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ৩৫ বছরের নীচে। বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২০ শতাংশ; কিন্তু ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক স্নাতকদের একটা বড় অংশ বেকার।
গত প্রায় এক দশক ধরেই, দেশে-বিদেশে বড় বড় বেসরকারি সংস্থাতে মাঝে মাঝেই ছাঁটাইয়ের খবর আসার ফলে সরকারি চাকরি হয়ে উঠেছে মহার্ঘ। কিন্তু সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরির জন্য ২২ কোটিরও বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। মাত্র ৭ লাখ ২২ হাজার প্রার্থীকে পদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল।
আমাদের দেশে গত কয়েক বছর ধরেই শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্ক লাগাতার বাড়ছে। ওবিসিদের সংরক্ষণের পরিধি বৃদ্ধির দাবি জোরালো হচ্ছে। দাবি বাড়ছে মহিলা ও স্থানীয় (ডোমিসাইল) সংরক্ষণেরও। সংরক্ষণের আওতায় ক্রমশ বেশি আসন চলে যাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে উচ্চবর্ণের মধ্যে। তাঁরা দাবি করছেন, জাতভিত্তিক সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হোক। সংরক্ষণ অবশ্য বেসরকারি ক্ষেত্রে নেই, আর বেসরকারি ক্ষেত্রে তপশিলি জাতি, উপজাতির উপস্থিতি খুবই কম। কিন্তু কমতে থাকা চাকরির দুনিয়ায় সরকারি চাকরির আশায় থাকা উচ্চবর্ণের তরুণ-তরুণীরা অনেকেই এই যুক্তি শুনতে নারাজ।
প্রতিযোগিতার তীব্রতার যে হতাশা থেকে সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিতর্ক শক্তিশালী হচ্ছে, সেই হতাশার আগুনেই ঘৃতাহুতি দিয়েছে বারবার পরীক্ষা-জালিয়াতির ঘটনা। কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি পরীক্ষা ব্যবস্থার বিপুল কেন্দ্রীকরণ ঘটিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, আঁচটা এল তার ঘাড়েই।
কেন্দ্রীকরণের দোষ কী? কেন্দ্রীয় পরীক্ষার অত্যধিক গুরুত্বের ফলে এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এক দিকে কোচিং ব্যবসা, আরেক দিকে জালিয়াতির সংগঠিত অপরাধ-চক্র গড়ে উঠেছে। কোচিং সেন্টারগুলো কেবল শিক্ষার খরচই বাড়াচ্ছে না, অনেক সময় প্রশ্নপত্র ফাঁস বা ফলাফল কারচুপির মতো ঘটনার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন:
গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন রাজ্যে নানান পরীক্ষায় নানান জালিয়াতির খবর আসছিল। কেন্দ্রীয় সরকার ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) মাধ্যমে প্রায় সব বড় পরীক্ষা কেন্দ্রীয় ভাবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে দুর্নীতি চক্রগুলি পাখির চোখ করল এনটিএ-কেই। পরিস্থিতি এমন যে, এ বার বায়ুসেনার বিমান ব্যবহার করতে হয়েছে প্রশ্নপত্র পাঠানোর জন্য। রাজ্যসভায় সরকারের দেওয়া তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ২৪ জন স্থায়ী কর্মচারী নিয়েই আট বছরে ২৭০টি সর্বভারতীয় পরীক্ষা নিয়েছে এনটিএ।
উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে চাপে তো আজ শুধু গরিব নয়। নিম্ন থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চবিত্তদের একাংশের মধ্যেও চাপ বাড়ছে। যে সব ধনী ভারতীয় তাঁদের সন্তানদের বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর সামর্থ্য রাখেন, তাঁরাও এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা অন্যান্য দেশে অভিবাসন সংক্রান্ত কড়াকড়ির মুখে পড়ছেন। আগামী বছরগুলিতে সারা পৃথিবীতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাবে বহু চাকরি বিলুপ্তির সম্ভাবনা আছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে আরশোলাদের জমায়েতে আজব আজব সব স্লোগান দেখা যায়। কারও হাতের পোস্টারে লেখা, ‘অবস্থা এত খারাপ, সম্পন্ন আর অন্তর্মুখীরাও আজ এখানে।’ কোনও তরুণীর হাতে প্লাকার্ড: ‘আমি প্রেম করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এই সরকার আমার রাস্তায় টেনে এনেছে।’ অনেক পোস্টারেরই ভাষা, ভঙ্গি বা ছবি শালীনতার তোয়াক্কা করেনি। মূল প্রতিপাদ্য, এই সরকার অপদার্থ, আমাদের মুক্তি দিক।
গোড়া থেকেই আরশোলাদের এই আন্দোলন নজরে রাখছিলেন দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য ও অজয় গুড়াবর্তী। আরশোলারা অনেকেই তাঁদের ছাত্রছাত্রী। এর বাইরেও জমায়েতের অন্যান্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন তাঁরা।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরের অনশন মঞ্চে নেহা। ছবি: পিটিআই।
দ্বৈপায়ন মনে করেন, এই আন্দোলন দানা বাঁধার একটা মূল কারণ পরীক্ষা ব্যবস্থার অতি-কেন্দ্রিকতা। একটা নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তার ফল সারা দেশে বিশ-পঁচিশ লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে একসঙ্গে ভুগতে হচ্ছে। আগে যখন রাজ্য স্তরে পরীক্ষাটা হত, তখন একেকটা পরীক্ষায় বসতেন পঞ্চাশ হাজার থেকে খুব বেশি হলে দু’-তিন লক্ষ ছাত্রছাত্রী। ফলে কোনও রাজ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তার ক্ষোভ অনেক কম সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর মধ্যে আটকে যেত। কিন্তু ‘এক দেশ, এক পরীক্ষা’ নীতির ফলে ভুলচুকের দায় পুরোপুরি বর্তায় কেন্দ্রের ওপর।
“এ ছাড়া, যত বড় পরীক্ষা, তত তার প্রশ্নের বাজারমূল্য,” দ্বৈপায়ন বলেন। তাঁর ব্যাখ্যা, শিক্ষার মতো প্রশ্নপত্রও এখন পণ্যে পরিণত। সে দিক থেকে দেখলে, এই আন্দোলন অতি-কেন্দ্রিকতা আর পণ্যকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন।
অজয় মনে করেন, সরকারের মনোভাবেই তারুণ্যের বিদ্রোহ এই রূপ পেল। তরুণরা মনে করছিল, সরকার তাঁদের বিষয়ে উদাসীন। একে তো এই প্রজন্মের কাছে সুযোগ কম, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা বেশি; উপরন্তু এই ঔদাসীন্য। যে ভাবে ২০২০-২০২১-এ দিল্লিতে কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রে সরকার সময় নিয়ে দেখছিল কৃষকরা কত দূর যেতে পারেন, সে ভাবেই এখানেও আরশোলাদের দৌড় কত দূর দেখতে চাইছিল। কিন্তু কৃষকদের মতো ধৈর্য বা সহনশীলতা কোনওটাই এই তরুণদের নেই। তারা এই আন্দোলন ব্যাপারটা উৎসব হিসেবে নিয়ে নিল। লাঠি, জলকামান, বন্দুক, পাসপোর্ট আটক করার হুঁশিয়ারি, কিছুই তাদের ভয় পাওয়াতে পারেনি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের ‘দ্রুত ও কঠোর’ শাস্তির জন্য বিশেষ আদালত (ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট) বানানো হবে, বলছে সরকার। নতুন আইনে শাস্তি দ্বিগুণ করা হচ্ছে। তবে সঙ্কট এতে কাটবে কি না সে নিয়ে সন্দেহ থাকছে। যেখানে কেন্দ্রিকরণকেই সমস্যা হিসেবে দেখা যাচ্ছে, সেখানে সরকার স্রেফ বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই নিশ্ছিদ্র করার দিকে নজর দিচ্ছে, যা প্রায় অসম্ভব বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ-অবস্থানে ‘আরশোলারা’। ছবি: পিটিআই।
এনটিএ-র সংস্কারে যে ৬ সদস্যের কমিটি গড়া হয়েছে, তাঁর প্রধান, ইনফোসিস কর্তা নন্দন নিলেকানি নিজেই শিক্ষা জগতের লোক নন। কমিটিতে এমনকি এক জন পুলিশের লোকও আছেন! শিক্ষাজগতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একমাত্র ব্যক্তি আইআইটি মাদ্রাজের ডিরেক্টর। কিন্তু আইআইটি একটি বিশেষজ্ঞ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, যা শিক্ষার মূলধারার সঙ্গে যুক্ত নয়।
তা ছাড়া, প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সম্ভবত উপসর্গ মাত্র, রোগ নয়। সিজেপি-র দ্রুত জনপ্রিয়তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁদের মুখ্য মুখপাত্র সৌরভ দাস আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেন, শিক্ষা ও পরীক্ষা সংক্রান্ত অব্যবস্থা, ব্যাপক বেকারত্ব, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, শেয়ার বাজারের অনিশ্চয়তা, এই সব কিছুই তরুণদের তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন রাখছে।
দিল্লি, কলকাতা, মুম্বই, পটনার মতো শহরে যাঁরা বিক্ষোভে জড়ো হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই শিক্ষার বাইরেও অন্যান্য হতাশা প্রকাশ করেছেন—আদালতের নানা রায়, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, যথেচ্ছ দলবদল, বিরোধীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অপদার্থতা এবং ‘গোদি’ মিডিয়ার সাংবাদিকদের ‘অনৈতিকতা’। এ ছাড়া, প্রধানমন্ত্রী যতই ‘বিকশিত ভারতে’র কথা বলুন, গত কয়েক বছর ধরে বিজেপি অনেকটাই অতীত-ভিত্তিক রাজনীতি করেছে। বেদের গৌরব থেকে বাবর-আকবর বা নেহরু-গাঁধী পরিবার, অতীত নিয়েই থেকেছে তাদের অধিকাংশ চর্চা। কিন্তু যে আরশোলাদের পথে দেখা গেল, তারা সুদুর অতীত নিয়ে অতটা চিন্তিত নয়, যতটা সাম্প্রতিক অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে।
এই আরশোলাদের একটা প্রভাব সম্ভবত আমাদের রাজ্যেও সরকার পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল, যদিও তখন এই আরশোলা নামটি তাঁরা পাননি। কিন্তু শহরে হোক বা গ্রামে, এক দিকে চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না, আরেক দিকে সরকারি চাকরি চুরি হয়ে যাচ্ছে, এই সাঁড়াশি চাপে হাঁসফাঁস করার কথা বলছিলেন অনেক তরুণ-তরুণীও। এক দিকে শহুরে শিক্ষিত, আরেক দিকে পরিযায়ী শ্রমিক—দুয়েরই একটা বড় অংশের ভোট তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে গিয়েছিল বলে বিভিন্ন স্থানীয় পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে। তুলনায় ভাল কাজ করা তামিলনাড়ু মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনও খানিক অপ্রত্যাশিত ভাবেই গদি হারালেন যুব সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায়।
দ্বৈপায়নের পর্যবেক্ষণ, এই ক’দিনের ঘটনায় ছাত্র-যুবদের একটা বড় অংশের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়েছ। যে তরুণ-তরুণী এ সব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না, তাঁরাও এখন পাবলিক অ্যাফেয়ার্স ও রাজনৈতিক ঘটনাবলির কাঁটাছেঁড়া করবেন। তদুপরি, পড়ুয়ারা যে ভাবে ক্ষমতাকে নিয়ে মশকরা করেছেন, প্রকাশ্যে তাবড় নেতাদের ফাসিস্ট বলে দাগিয়ে দিয়েছেন, তা রাজপথে এর আগে ছিল অসম্ভব। “বলা যেতেই পারে এই আন্দোলনের ফলে ছাত্র-যুবদের একটা বিরাট অংশে ‘ভরসা ইন, ভয় আউট’ হয়ে গিয়েছে। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে পরম স্বস্তির।”
আন্দোলনের প্রভাব যে খানিক থাকবে, মনে করছেন এ রাজ্যের এক আমলাও। তাঁর ছেলে এ বার মাধ্যমিক দেবে। বাড়িতে না-জানিয়ে কলকাতায় ২৪ তারিখের বিক্ষোভ মিছিলে চলে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছে, পেট্রলে ইথানল মেশানো হলে গাড়ির কী ক্ষতি হয়, আর এই ব্যাপারটা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও দুর্নীতি কি না। “ও আগে নিজের জগতে থাকত। এই প্রথম দেখলাম রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে,” বলেন ওই আমলা।
তরুণদের প্রথা-ভাঙা বা অবাধ্য মনোভাবকে বুঝতে হলে তাদের প্রজন্মকে বুঝতে হবে, বলছেন অজয়। এরা সেই প্রজন্ম, যারা বাড়িতে বা স্কুলে কোথাও মার খায়নি। নব্বই দশক পর্যন্ত দৈহিক শাস্তির ভালই প্রচলন ছিল। কিন্তু এরা বড় হয়েছে অন্য ভাবে। “মর্যাদার প্রশ্নটি তাদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, স্বাধীনতার পর এরাই সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ওদের ঠাট্টা-তামাশা সবাইকে হতবাক করে দেয়,” অজয় বলেন।
মুখ্য আরশোলাদের মধ্যে অভিজিৎ দীপকে ও আশুতোষ রাঙ্কা এক সময় আম আদমি পার্টির সঙ্গে কিছু দিন কাজ করেন। তার পর বিদেশে পড়তে যান। আপাতত আরশোলা আন্দোলনেই মনোনিবেশ করবেন। সৌরভ দাস তথ্যের অধিকার আইনের ব্যবহার করে তদন্তমূলক সাংবাদিকতা করতেন। বিচারবিভাগ নিয়েও। এঁরা যে শুধু শিক্ষা নিয়ে আটকে থাকবেন না, সেটা বোঝা যাচ্ছে। অবস্থান-বিক্ষোভ ওঠার পরেও আরশোলা-নেতৃত্ব লাগাতার প্রধানমন্ত্রী ও বিচারব্যবস্থাকে নিশানা করছেন। তবে আম আদমির মতো বিরোধী দলকেও ছাড়েনি।
পতাকা হাতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। ছবি: পিটিআই।
এঁরা নির্বাচনী রাজনীতিতে নামলে বিরোধী ভোট ঐক্যবদ্ধ করার অঙ্কের কী হবে, আছে সে সংক্রান্ত চিন্তাও। প্রসঙ্গত, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর রাহুল গাঁধী যে তিন অনশনকারীর সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করেন, তাঁরা তিন জনই বিহারে কংগ্রেসের জোট সঙ্গী সিপিআই (এমএল-লিবারেশন)-এর ছাত্র সংগঠনের।
আপাতত, আরশোলাদের দাপটে সরকার একটু পিছু হটায় যে স্পেস তৈরি হয়েছে, সেটার সুযোগ নিতে বিরোধীরাও নতুন করে ঝাঁপাবেই। সমাজের অন্যান্য বিভিন্ন অংশও আরশোলাদের পথ নিতে পারে। ইতিমধ্যেই পেট্রলে ইথানল মেশানোর নীতির কারণে পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গড়কড়ীকে লক্ষ্য করে আক্রমণ শানানোর গতি বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উল্কার বেগে জনপ্রিয় হয়েছে ই-২০ জনতা পার্টি। কোথাও কৃষকেরা ফসলের ন্যায্য মূল্যের দাবতে রাস্তায় নেমে যাচ্ছেন, তো কোথাও স্কুলে পরিস্রুত জল ও শৌচালয়ের দাবিতে শিক্ষকদের ঘেরাও করা ছাত্ররা আরশোলাদের অনুকরণে স্লোগান দিচ্ছে।
ইতিমধ্যেই সংযুক্ত কিসান মোর্চার নেতা রাকেশ টিকায়েতের সঙ্গে এক দফা আলোচনা সেরেছেন ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা। আগামী বছর উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। সুতরাং তার আগে কৃষকদের সঙ্গে তাঁদের যৌথ আন্দোলনে দেখা যেতেই পারে।
আমাদের রাজ্যেও বিরোধীরা এই সুযোগ নিতে চাইবে। সদ্য বিপুল শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় আসা শুভেন্দু অধিকারী সরকার বা সঙ্ঘ পরিবারের সংগঠনগুলি সেই সুযোগ দিতে চাইবে না। তাই, দেশের অন্যান্য প্রান্তে বিভিন্ন রকম সরকার-বিরোধী আন্দোলন গতি পেলে, এখানেও রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা।
তবে, শুধুই বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার রাজনীতি যে যথেষ্ট নয়, তা এই অসংগঠিত আরশোলারা সম্ভবত দেখিয়ে দিয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংহের সঙ্গে তৃতীয় দফার বৈঠক করার পর সিজেপি জানায়, তাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তার পরেই আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তাদের আবেদন, এত দিন যে শান্তিপূর্ণ অবস্থান চলছিল, তা তুলে নিন।
- ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের চাপে ইস্তফা দিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিটের প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগে প্রথম থেকেই তাঁর পদত্যাগের দাবি জানিয়েছিল সিজেপি।
- ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফাকে ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে দেখছেন সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। এই ‘জয়ের’ কৃতিত্ব পুরোটাই দেশের পড়ুয়া এবং যুব সমাজকে দিচ্ছে সিজেপি। কয়েক দিনের এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ দীপকে। শত ‘চাপে’ অনড় ছিলেন দাবিতে। সেই দাবি পূরণ হতেই বাঁধভাঙা আনন্দে ফেটে পড়েন তিনি।
-
ককরোচ সমর্থককে মারধরে অভিযুক্ত স্বতন্ত্রকে অবশেষে গ্রেফতার করল দিল্লি পুলিশ, পাঠানো হল জেল হেফাজতে
-
‘হাতজোড় করে আন্দোলনে ইতি টানতে চেয়েছিলেন’, যন্তর মন্তরে ‘ককরোচদের’ ভূমিকা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য ওয়াংচুকের
-
ককরোচদের সংসদ অভিযানের দিন ছর্রা গুলিতে জখম হন অন্তত ১০ জন! আরটিআই-এর জবাবে বলল দুই হাসপাতাল
-
‘অনশন ভাঙার ছবি প্রকাশ করে প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন মন্ত্রীরা!’ নড্ডার হাতে স্যুপ খাওয়ার ১৪ দিন পরে সরব হলেন ওয়াংচুক
-
ধৃত আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবি! বাঁকিপুরে বিজেপির বিপর্যয়ের পরেই পটনায় ফের শুরু ককরোচ বিক্ষোভ