নিটের প্রশ্নফাঁস নিয়ে দিল্লিতে আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়তেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফার জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। সূত্রের খবর, দু’বার পদত্যাগ করতে চেয়ে নেতৃত্বের কাছে দরবারও করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ইস্তফার আর্জি নাকচ করে দেয় সরকার। প্রাথমিক ভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, চাপের মুখে দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া যাবে না। তা হলে জনমানসে ভুল বার্তা যেতে পারে। যদিও শেষমেশ ধর্মেন্দ্রকে পদত্যাগই করতে হয়েছে। শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর কাছে তিনি নিজের ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে দেন। রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করেছেন।
নিট-বিক্ষোভে প্রথম থেকেই আন্দোলনকারীরা দাবি করেছিলেন, প্রশ্নফাঁসের দায় মাথায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রকের প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তরফে এ ছাড়াও দু’টি দাবি রাখা হয়েছিল সরকারের সামনে— প্রশ্নফাঁসে আত্মঘাতী পড়ুয়াদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের কারও বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না-করার নিশ্চয়তা। কেন্দ্রের তরফে মন্ত্রী জেপি নড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংহের সঙ্গে সিজেপি-র প্রতিনিধিদের দু’টি বৈঠক হয়। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দাবি সরকার মেনে নিয়েছিল। সমস্যা ছিল প্রথম দাবিটি নিয়ে। এর মধ্যে গত ২০ জুলাই সিজেপি দিল্লিতে সংসদ ভবন অভিযানের ডাক দেয়। ১০ হাজারের বেশি মানুষ জমায়েত করেছিলেন সেখানে। মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জের পর ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। সূত্রের খবর, সে দিন ইস্তফা দিতে চেয়ে আরও এক বার নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেন ধর্মেন্দ্র। সিনিয়র নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। কিন্তু তাঁর ইস্তফা নাকচ করে দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে মধ্যপ্রদেশের মন্ত্রী কৈলাস বিজয়বর্গীয় বলেন, ‘‘আন্দোলনের প্রথম দিন থেকে উনি (ধর্মেন্দ্র) দলের প্রধানকে বলেছিলেন, ‘আপনি যদি মনে করেন আমার ইস্তফা দেওয়া উচিত, আমি দেব।’ কিন্তু দল ওঁকে ইস্তফা দিতে বারণ করেছিল। পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী দল সিদ্ধান্ত নেয়, ওঁর পদত্যাগ করা উচিত। উনি সঙ্গে সঙ্গে তা করেছেন।’’
আরও পড়ুন:
সরকারের তখনও ধারণা ছিল, পরিস্থিতি সামলে নেওয়া যাবে। সূত্রের খবর, মূলত দু’টি ভাবনা থেকে ধর্মেন্দ্রের ইস্তফা বার বার নাকচ করা হচ্ছিল। প্রথমত, মন্ত্রীর পদত্যাগের চেয়ে শিক্ষায় সংস্কারের দিকে নজর ঘোরাতে চাইছিল কেন্দ্র। সেখানেই গুরুত্ব দিয়ে পর পর কয়েকটি পদক্ষেপ করা হয়। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) থেকে ৪৭ জন আধিকারিককে বরখাস্ত করে সরকার। প্রশ্নফাঁস রুখতে খসড়া বিলে অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। তা ছাড়া, প্রধানমন্ত্রী নিজে দু’বার সমাজমাধ্যমে ভিডিয়োবার্তার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে আশ্বাস দেন। প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট তৈরির কথা বলেন। তবে তার পরেও চিঁড়ে ভেজেনি। দ্বিতীয়ত, ধর্মেন্দ্রকে বলা হয়েছিল, তাঁর পদত্যাগের অর্থ কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। মোদী সরকার তা করে না। বরং পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে এই সরকার সমস্যার সমাধানে বেশি আগ্রহী। এই বার্তাই দিতে চাওয়া হয়েছিল।
সিজেপি-র প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুক্রবার নড্ডাদের বৈঠকের পরেই ধীরে ধীরে কেন্দ্রের অবস্থান বদলাতে শুরু করে। আন্দোলনকারীরা বুঝিয়ে দেন, কোনও অবস্থাতেই তাঁরা মন্ত্রীর ইস্তফার দাবি থেকে সরবেন না। তা ছাড়া, এ বিষয়ে শীঘ্র সিদ্ধান্ত না নিলে ফের সংসদ ভবন অভিযানের মতো বড়সড় কর্মসূচির আয়োজন করা হবে, হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন অভিজিৎ দীপকে-রা। এর পর আর ঝুঁকি নিতে চায়নি কেন্দ্র।
সিজেপি-র বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যন্তর মন্তরে জমায়েত বাড়ছিল। সূত্রের খবর, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এ নিয়ে কেন্দ্রকে রিপোর্ট জমা দেয়। বলা হয়, অনেক সংগঠন এই বিক্ষোভের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে। ছাত্রদের জমায়েতে ৪০০-র বেশি দুষ্কৃতীর মুখ শনাক্ত করে দিল্লি পুলিশও। অভিযোগ, এই সময়ে পাকিস্তান থেকে একাধিক সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট সক্রিয় হয়েছিল, যা দিল্লির আন্দোলনে মদত দিচ্ছিল। একাংশের মতে, নিট-বিক্ষোভের সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখতে পেয়েছিল মোদী সরকার। এক দিকে সোনম ওয়াংচুকের মতো নেতার দীর্ঘ অনশন, অন্য দিকে সিজেপি-কে কেন্দ্র করে ‘জেন-জ়ি’ তথা তরুণ প্রজন্মের ভিড়— দ্রুত এই আন্দোলনকে স্তিমিত না করতে পারলে আগামী দিনে সরকারকে আরও ভুগতে হত। তা ছাড়া, আন্দোলন দিল্লির বাইরে ক্রমশ অন্য শহরগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ছিল। তাই একে আর বাড়তে দিয়ে চায়নি সরকার। সব দিক বিবেচনা করে তাই ধর্মেন্দ্রের ইস্তফার ‘সহজ’ বিকল্পটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁর জায়গায় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রহ্লাদ জোশীকে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংহের সঙ্গে তৃতীয় দফার বৈঠক করার পর সিজেপি জানায়, তাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তার পরেই আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তাদের আবেদন, এত দিন যে শান্তিপূর্ণ অবস্থান চলছিল, তা তুলে নিন।
- ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের চাপে ইস্তফা দিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিটের প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগে প্রথম থেকেই তাঁর পদত্যাগের দাবি জানিয়েছিল সিজেপি।
- ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফাকে ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে দেখছেন সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। এই ‘জয়ের’ কৃতিত্ব পুরোটাই দেশের পড়ুয়া এবং যুব সমাজকে দিচ্ছে সিজেপি। কয়েক দিনের এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ দীপকে। শত ‘চাপে’ অনড় ছিলেন দাবিতে। সেই দাবি পূরণ হতেই বাঁধভাঙা আনন্দে ফেটে পড়েন তিনি।
-
ককরোচ সমর্থককে মারধরে অভিযুক্ত স্বতন্ত্রকে অবশেষে গ্রেফতার করল দিল্লি পুলিশ, পাঠানো হল জেল হেফাজতে
-
‘হাতজোড় করে আন্দোলনে ইতি টানতে চেয়েছিলেন’, যন্তর মন্তরে ‘ককরোচদের’ ভূমিকা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য ওয়াংচুকের
-
ককরোচদের সংসদ অভিযানের দিন ছর্রা গুলিতে জখম হন অন্তত ১০ জন! আরটিআই-এর জবাবে বলল দুই হাসপাতাল
-
‘অনশন ভাঙার ছবি প্রকাশ করে প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন মন্ত্রীরা!’ নড্ডার হাতে স্যুপ খাওয়ার ১৪ দিন পরে সরব হলেন ওয়াংচুক
-
ধৃত আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবি! বাঁকিপুরে বিজেপির বিপর্যয়ের পরেই পটনায় ফের শুরু ককরোচ বিক্ষোভ