আরজি কর কাণ্ডে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। দেহ সৎকারে তাড়াহুড়োর অভিযোগে রুজু হয়েছে এফআইআর। তাতে অন্যতম অভিযুক্ত নির্যাতিতার প্রতিবেশী সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়। দু’বছর আগে, ঘটনার দিন নিহত চিকিৎসকের পরিবারের সঙ্গে সঙ্গেই ছিলেন তিনি। সঞ্জীবের দাবি, প্রতিবেশী হিসেবে পাশে থাকতে গিয়েই ফাঁপরে পড়েছেন তিনি।
নির্যাতিতার বাড়ি লাগোয়াই অভিযুক্ত সঞ্জীবের বাড়ি। খড়দহ থানায় মৃত চিকিৎসক-ছাত্রীর বাবা গত সোমবার যে অভিযোগ দায়ের করেছেন, তাতে তৎকালীন বিধায়ক নির্মল ঘোষ, মৃতার বাড়ির এলাকার পুরপ্রতিনিধি সোমনাথ দে-র পাশাপাশি রয়েছে তাঁর নামও। তাঁর ভূমিকাও এখন পুলিশের আতশকাচের তলায়। দেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে তাঁর নাম জড়ানোয় ভেঙে পড়েছেন সঞ্জীব। আনন্দবাজার ডট কম-কে জানালেন, ওই দিনটির জন্য এখন শুধুই ‘আফসোস’ করছেন তিনি।
সঞ্জীবের দাবি, ওই সময়ে দিল্লিতে গিয়েছিলেন তিনি। ঘটনার দিন (২০২৪ সালের ৯ অগস্ট) সকালেই দিল্লি থেকে কলকাতায় ফেরেন। তার কয়েক মাস আগেই স্ত্রীকে হারিয়েছেন। তাঁর কন্যাও নির্যাতিতার প্রায় সমবয়সি এবং সে সময়ে অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। সঞ্জীবের কথায়, এমন এক পরিস্থিতিতে নির্যাতিতার বাবার ফোন পেয়ে আর দেরি করেননি তিনি। ছুটে যান তাঁদের কাছে।
সঞ্জীবের দাবি, সে দিন নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে একই গাড়িতে আরজি করে যান। নির্যাতিতার পরিবার আগেই অভিযোগ করেছে, হাসপাতালে পৌঁছোনোর পরে দীর্ঘ সময়ে মেয়ের দেহ দেখতে দেওয়া হয়নি তাঁদের। এই অভিযোগের সঙ্গে একমত প্রতিবেশী সঞ্জীবও। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে তিনিও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন সে দিন। সেই থেকে থানা, মর্গ, শ্মশান পর্যন্ত নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গেই ছিলেন তিনি। প্রয়োজনীয় ‘পেপারওয়ার্কে’ সাহায্য করেন। কিছু নথিপত্র প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবেও তাঁর স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি সঞ্জীবের।
খড়দহ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দায়ের হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবের বেশ কিছু ‘অমিল’ রয়েছে বলে দাবি ওই প্রতিবেশীর। দেহ দ্রুত দাহ করার যে অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে, তা-ও মানতে নারাজ তিনি। তাঁর দাবি, কোথাও একটা ‘ভয়ঙ্কর ভুল’ হচ্ছে এবং সেই ‘ভুলের’ শিকার তিনিও হচ্ছেন। ‘আফসোস’ করে বলছেন, “সে দিন যদি অন্য দশজনের মতো বাড়িতে বসে টেলিভিশনে পুরো ঘটনাটা দেখতাম, তা হলে হয়তো আজ এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হত না।”
আনন্দবাজার ডট কম-কে সঞ্জীব বলেন, “দেহ নিয়ে আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসিনি। বরং মৃতের বাবা-মায়ের সঙ্গেই একই গাড়িতে ফিরেছি।” তিনি জানান, ওই গাড়িটি ছিল নিহত চিকিৎসক তরুণীর পরিবারের। তাঁর উপর দেহ দ্রুত দাহ করার জন্য কোনও চাপ বা নির্দেশও ছিল না বলে দাবি সঞ্জীবের। তাঁর বক্তব্য, দেহ বাড়িতে পৌঁছোনোর পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গাড়িতে করে শ্মশানে যান তিনি। ওই গাড়িতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন নিহত চিকিৎসক-ছাত্রীর মা-বাবা, গাড়িচালক এবং অন্য এক প্রতিবেশী। তবে শ্মশানে পৌঁছোনোর পর তিনি আর দেহ নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেননি বলে দাবি সঞ্জীবের।
আরও পড়ুন:
কেন শ্মশানের ভিতরে প্রবেশ করেননি, সেই ব্যাখ্যাও দেন নির্যাতিতার প্রতিবেশী। সঞ্জীবের দাবি, শ্মশানে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন মাস চারেক আগে যে চুল্লিতে তাঁর স্ত্রীকে দাহ করা হয়েছিল, সেই চুল্লিতেই দাহ করা হবে নির্যাতিতাকে। সেই কারণে তিনি আর ভিতরে প্রবেশ করেননি। ফলে শ্মশানের ভিতরে কী ঘটেছে, কার সঙ্গে কী কথা হয়েছে বা দেহ দাহের ক্ষেত্রে কে কী ভূমিকা নিয়েছেন, সে সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণা নেই বলেই দাবি সঞ্জীবের। বলছেন, “আমি কাউন্সিলর না চেয়ারম্যান? যে ঘাট ফাঁকা করে দেব?”
নির্যাতিতার প্রতিবেশীর দাবি, ওই দিন শ্মশানে পুলিশ আধিকারিক থেকে শুরু করে বিধায়ক, চেয়ারম্যান-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তবে নতুন করে তদন্তে তাঁর কোনও গাফিলতি বা ভুল ধরা পড়লে তিনি শাস্তি মাথা পেতে নেবেন বলেও জানান সঞ্জীব।
তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছেন সঞ্জীব। তিনি বলেন, “সন্তানসম এক প্রতিবেশী মেয়ে এ ভাবে খুন হল! আর আমি সেই হত্যাকারীকে বাঁচানোর জন্য এমন কোনও কাজ করব! এটা কী ভাবে সম্ভব!” তাঁর বক্তব্য, আগেও তদন্তকারীদের সাহায্য করেছেন তিনি, এ বারও সাহায্য করবেন। সঞ্জীবের দাবি, তিনি চাইছেন প্রকৃত সত্য সামনে আসুক।
নির্যাতিতার বাবার অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট তাঁর মেয়ের দেহ দ্রুত দাহ করে দেওয়া হয়। এমনকি, ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার পরেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল। মৃতার বাবা অভিযোগ তুলেছেন, তৎকালীন বিধায়ক নির্মল, এলাকার পুরপ্রতিনিধি সোমনাথ এবং প্রতিবেশী সঞ্জীবের বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, অভিযুক্ত ত্রয়ী আরও কয়েক জনকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বয়ে গিয়ে দ্রুত দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। পুলিশ সূত্রে খবর, নতুন তদন্তে দাহকার্যের সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা, নথিপত্র তৈরির প্রক্রিয়া এবং মরদেহ দ্রুত দাহ করার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে।