Advertisement
E-Paper

কেন্দ্রীয় ‘বনাম’ রাজ্যের মন্ত্রী! গোষ্ঠীবিবাদে পেট্রাপোলে অচল পণ্য পরিবহণের কাজ! ৩৬ ঘণ্টা কেটে গেলেও মেটেনি গন্ডগোল

পালাবদলের পর থেকে উত্তর ২৪ পরগনার পেট্রাপোল সীমান্তে শ্রমিক সংগঠনের দখলদারি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতর শুরু হয়েছিল। ওই বিবাদ দৃশ্যত প্রকাশ্যে চলে এল সংঘ আদর্শে পরিচালিত বিএমএস-এর ‘সৌজন্যে’। এবং তাতে অনুঘটক নাকি দুই মন্ত্রী!

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ১৮:০৫

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রাজ্যে এখন ডবল ইঞ্জিন সরকার। অর্থাৎ কেন্দ্র-রাজ্য, উভয়ের শাসক একই রাজনৈতিক দল। তার পরেও বঞ্চনার অভিযোগ। প্রকাশ্যে চলে এসেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং রাজ্যের এক মন্ত্রীর গোষ্ঠীর মধ্যে ‘বিবাদ’। ফলে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে উত্তর ২৪ পরগনার পেট্রাপোল সীমান্তে পণ্য পরিবহণের কাজ।

পালাবদলের পর থেকে পেট্রাপোল সীমান্তে শ্রমিক সংগঠনের দখলদারি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতর শুরু হয়েছিল। ওই বিবাদ দৃশ্যত প্রকাশ্যে চলে এল সংঘ আদর্শে পরিচালিত বিএমএস-র ‘সৌজন্যে’। এবং তাতে অনুঘটক নাকি দুই মন্ত্রী! গত ৩৬ ঘণ্টা ধরে ব্যাহত আন্তর্জাতিক সীমান্তে পণ্য পরিবহণের কাজ। সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারত-বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। বিজেপি-র একটি সূত্রে খবর, কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর এবং রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার ঘনিষ্ঠ শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বের মধ্যে কাজের ভাগাভাগি নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে কাজ স্বাভাবিক করার নির্দেশ এসেছিল ‘উপরমহল’ থেকে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেটা হয়নি।

পেট্রাপোল সীমান্তে বনগাঁর ছয়ঘরিয়া পঞ্চায়েত এবং আরও কিছুটা অংশ অশোকের নির্বাচনী এলাকার মধ্যে পড়ে। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সীমান্তে পরিবহণের কাজে প্রভাব বাড়ে বিএমএস-এর। আগে তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের আধিপত্য ছিল সেখানে। শ্রমিক নেতৃত্বের একাংশ জানাচ্ছেন, ২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে কাজের নির্দিষ্ট শতাংশ নিয়ে ‘সমঝোতা’ হয়েছিল। সেই অনুযায়ী বিভিন্ন সংগঠন নিজেদের নির্ধারিত অংশের কাজ করত। কিন্তু বেশ কিছু দিন হল ওই ‘নিয়ম’ ভেঙে গিয়েছে। বনগাঁ উত্তরের বিধায়ক তথা খাদ্যমন্ত্রী অশোক কিছু দিন আগে পেট্রাপোল সীমান্তে গিয়ে ‘ল্যান্ড পোর্ট অথরিটি’র ম্যানেজার এবং বিএমএস নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিএমএস শ্রমিকদের ৭৮ শতাংশ এবং ভিন্‌রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের ২২ শতাংশকে কাজ দেওয়ার কথা জানানো হয়। কিন্তু কিছু দিন পর বিএমএস-ই দুটো গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে যায় বলে খবর। কাজের ভাগাভাগি নিয়ে দু’পক্ষের বিরোধ শুরু হলে আসরে নামেন বনগাঁর সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু। তিনি পেট্রাপোল স্থলবন্দরের ম্যানেজারের সঙ্গে বৈঠক করেন। নতুন করে কাজের ভাগ নির্ধারণ করে দেন বলে শোনা যাচ্ছে। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিটু-কে ৩০ শতাংশ এবং বিএমএস-কে ৭০ শতাংশ কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়। বিএমএস-এর মধ্যে আবার বিএমএস-১-কে ৫০ শতাংশ এবং বিএমএস-২-কে ২০ শতাংশ কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যা মানতে নারাজ খাদ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বিএমএস নেতারা। তাঁদের দাবি, বিএমএস-এর অন্দরে এই ভাবে বিভাজন করার এক্তিয়ার কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর নেই।

বিএমএস-এর বনগাঁ নগর কমিটির সম্পাদক রাজীব গোস্বামী সরাসরি ‘শান্তনু ঠাকুরের সিদ্ধান্তের’ বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘বিএমএস একটিই সংগঠন। সংগঠনের মধ্যে দুটো ভাগ তৈরি করে কাজের শতাংশ নির্ধারণ করার অধিকার কোনও মন্ত্রীরই নেই। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিজের মতো করে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিয়েছেন। মনে হচ্ছে, বিএমএস কারও পারিবারিক সম্পত্তি!’’ তাঁর অভিযোগ, সিটু-কে ৩০ শতাংশ কাজ দেওয়ার পিছনে কী উদ্দেশ্য রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। প্রতিবাদে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছেও অভিযোগ জানানো হচ্ছে বলে দাবি রাজীবের।

অন্য দিকে, বনগাঁ ট্রাক ‘লোডিং-আনলোডিং’ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি অমিত বসু জানান, সেই ১৯৯১ সাল থেকে পেট্রাপোল সীমান্তে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন কাজ করে আসছে। ২০১১ সালে তৎকালীন জনপ্রতিনিধি, বনগাঁ পুরসভার নেতৃত্ব এবং শ্রম দফতরের আধিকারিকদের উপস্থিতিতে কাজের শতাংশ নিয়ে চুক্তি হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী আইএনটিইউসি (কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন) ১৫ শতাংশ, সিটু (বাম শ্রমিক সংগঠন) ২২ শতাংশ, বাংলা সিটু ৮ শতাংশ এবং আইএনটিটিইউসি (তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন) ৮ শতাংশ কাজ পেত। বাকি কাজ বিএমএস-এর অধীনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে কাজের ভাগাভাগি শুরু হওয়ায় পুরনো শ্রমিক সংগঠনগুলির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। অমিতের মন্তব্য, ‘‘বিএমএস-এর দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধের পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি এবং কাজের বণ্টন নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।’’ তাঁর দাবি, প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিক কাজ না-করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কাজ চালু রাখার পক্ষে ছিলেন অল্প সংখ্যক শ্রমিক। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শ্রমিক পরিবার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেছে। সোমবার জয়ন্তীপুর এলাকায় রাতভর চলেছে অবস্থান। মঙ্গলবারও মহিলাদের একাংশ বিক্ষোভ দেখিয়েছেন।

কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে পেট্রাপোল বন্দরের ‘ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং অ্যাসোসিয়েশন’-এর সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী জানিয়েছেন, সীমান্তের ভিতরে ‘লোডিং’ ও ‘আনলোডিং’-এর কাজ ধীরগতিতে চলছে। বাইরে এখনও অনেক শ্রমিক অবস্থান করছেন। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘ দিন ধরে রাজ্যে যে শ্রমিক সংগঠন ক্ষমতায় থাকে, তাদের প্রভাব কাজের ভাগে বেশি থাকেই। তবে অন্য সংগঠনগুলিরও কাজের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।’’

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংঘাত এখন শ্রমিক সংগঠনের অন্দরেও বড়সড় বিভাজনের চেহারা নিয়েছে। এক দিকে শান্তনুর নির্ধারিত কাজের শতাংশ নিয়ে আপত্তি, অন্য দিকে অশোকের আগের সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হওয়া অসন্তোষ দুইয়ের মাঝে বিপাকে পড়েছেন সীমান্তের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। প্রায় এক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত পেট্রাপোল সীমান্তে কবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।পেট্রাপোল স্থলবন্দরে তৈরি হওয়া সমস্যার নেপথ্যে মূলত তৃণমূলের শ্রমিক ইউনিয়ন আইএনটিটিইউসি থেকে বিএমএস-এ ঢোকা লোকজনেরাই রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। শান্তনুর কথায়, ‘‘যাঁরা গোলমাল করে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন, তাঁরা এখন বিএমএস-এর সদস্য, এ কথা ঠিকই। কিন্তু এঁদের অধিকাংশই আগে ছিলেন আইএনটিটিইউসি-তে। রাজ্যে পরিবর্তনের পরে এঁরা বিএমএস-এ ঢুকেছেন এবং নেতা হওয়ার বা সংগঠনের নেতৃত্ব দখল করার চেষ্টা করছেন।’’ কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘শ’দেড়েক শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের এই কার্যকলাপের বিপক্ষে যাঁরা তাঁদের সংখ্যা ৩০০। শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যেই আমি বৈঠক করে কাজের অনুপাত ভাগাভাগি করে দিতে বলেছি। যে পক্ষে ৩০০ জন রয়েছেন, তাঁদের জন্য ৫০ শতাংশ আর যে পক্ষে ১৫০ জন, তাঁদের জন্য ২০ শতাংশ কাজ রাখতে বলেছি।’’ কিন্তু সংগঠনের দখল নেওয়া যাঁদের ‘আসল উদ্দেশ্য’, তাঁরা সহজে সমাধান হতে দিতে চাইছেন না বলে দাবি শান্তনুর। অশোকের প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

Petrapole India-Bangladesh BJP BMS Workers

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy