পাঁচ বছর আগের বছরের বেস্ট সন্ধ্যায় তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমার সাদা চুল আর দাড়ি দেখে ভুল বুঝবেন না। আমিও কিন্তু বাঁধ ভাঙি।’’ ঐতিহ্যের নামে শুধু অতীতের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে থাকার পক্ষপাতী তিনি নন। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল বার বার করে গিয়েছেন অভীক সরকার। কিন্তু এ বার, ‘পরিবর্তন’ উচ্চারণ করতে গিয়ে তিনি কিঞ্চিৎ সাবধানি। শুরুতেই বলে নিলেন, ‘‘পরিবর্তনের কথা বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু বলব না। শব্দটা ব্যবহার করলেই অনেকে মনে করতে পারেন যে, আমরা একটা রাজনৈতিক পক্ষ নিচ্ছি।’’ তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা, ‘‘খুব সযত্নে আমরা এই অনুষ্ঠানকে রেখেছি রাজনীতির ঊর্ধ্বে। আমার এক সহকর্মীর ভাষায় বলা যেতে পারে— এক মঞ্চ, সব পক্ষ।’’
তবে অনুষ্ঠানকে ‘রাজনীতির ঊর্ধ্বে’ রাখলেও রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি যে পরিবর্তনকামী, তা বলতে দ্বিধা করলেন না অভীকবাবু। বছরের বেস্ট সন্ধ্যার প্রারম্ভিক বক্তৃতায় তাঁর মন্তব্য, ‘‘এটা তো ঠিক, রাজ্যে একটা বিশাল পরিবর্তন এসেছে। আবার একটা আশার আলো এসেছে। ঠিক যেমনটা এসেছিল ২০১১ সালে।’’ বললেন, বছরের বেস্ট সন্ধ্যায় ‘‘আজ আমরা উদ্যাপন করছি বাঙালির সেই পরিবর্তনের স্পৃহাকে।’’
প্রত্যেক বারের মতো এ বছরেও নানা ক্ষেত্রের এবং নানা পক্ষের মানুষকে এক মঞ্চে এনেছে বছরের বেস্ট সন্ধ্যা। নানান কর্মে নিমজ্জিত গুণী এবং কৃতীদের হাতে সম্মান তুলে দেওয়ার আগে নিজের বক্তৃতায় পরিবর্তনপ্রত্যাশী অভীকবাবুর পর্যবেক্ষণ, ‘‘প্রতিবাদ বাঙালির জীবনে নেই। অনেক দিন থেকেই নেই।’’ কেন নেই, তার ব্যাখ্যাও দিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘সাধারণত, পৃথিবীর সব জায়গাতেই প্রতিবাদের নেতৃত্ব আসে শিক্ষিত-বুদ্ধিজীবী শ্রেণি থেকে। সাধারণত এঁরা হন প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আদর্শ যা-ই থাক।’’ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বাম জমানা থেকে একটা পরিবর্তন লক্ষ করেছেন তিনি। মনে করেন, শিক্ষিত-বুদ্ধিজীবীরা সিপিএমের আমলে ‘‘প্রতিবাদের ভাষা আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে গচ্ছিত করে রেখেছিলেন। আবার তৃণমূলের সময়ে এঁরা প্রায় সবাই তৃণমূলপন্থী হয়ে যান। দু’-এক জন ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। অধিকাংশই সরকারপন্থী। তা সে যে-ই সরকার হোক না কেন।’’
আরও পড়ুন:
এ হেন সময় তাঁর কাছে প্রায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মতোই। তবে এর মধ্যেও তারাদের খুঁজে চলেন তিনি। খুঁজে যে পান, তা মানছেনও— ‘‘এই ঘোর অমাবস্যায় কিছু আলোর ঝিলিক আছে। আজকের সন্ধ্যায় এরকম কয়েক জনের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।’’ সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দেন, শুধু ঝিলিকে তিনি সন্তুষ্ট নন। ৮১ বছর বয়সেও অভীক সরকার ১৮ বছর বয়সির মতো সাহস, উৎসাহ এবং উদ্যম নিয়ে বলে উঠতে পারেন, ‘‘মাও জ়ে দং বলেছিলেন, একটা স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল হতে পারে। সেই দাবানলের আশায় আমরা আজকের অনুষ্ঠানকে উৎসর্গ করছি।’’