সোমবার দলের সর্বভারতীয় সভাপতি যে পথে হেঁটেছিলেন, মঙ্গলবার সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকও সেই পথই ধরলেন। সাংবাদিক বৈঠক হল কলকাতায়। কিন্তু কথা হল মূলত জাতীয় রাজনীতি নিয়েই। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী এবং কংগ্রেসকে ঝাঁঝালো আক্রমণ করলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক স্মৃতি ইরানি। অর্থাৎ প্রথম দিনে নিতিন নবীন এবং দ্বিতীয় দিনে স্মৃতি ইরানি বুঝিয়ে দিলেন, কোনও রাজ্যের স্থানীয় বিষয় নয়, দেশের প্রতিটি প্রান্তে আপাতত জাতীয় রাজনীতির ভাষ্য নির্মাণেই জোর দেবে বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ‘পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রকে পিষে দেওয়া’র অভিযোগও তুলেছেন স্মৃতি।
বিধাননগর সেক্টর ফাইভের একটি প্রেক্ষাগৃহে মঙ্গলবার স্মৃতির সাংবাদিক বৈঠক হয়েছে। বিষয় সেই ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’, যা নিয়ে সোমবার নিতিন কলকাতায় মিছিল করে গিয়েছেন। স্মৃতির সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য নেতৃত্বের তরফে সঙ্গে ছিলেন সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং দুই সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতো ও শশী অগ্নিহোত্রী। ছিলেন রাজ্য বিজেপির মিডিয়া বিভাগের প্রধান অনুপম ঘোষ এবং প্রধান মুখাপাত্র দেবজিৎ সরকারও। এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির যে সব প্রশ্ন তুলেছে, সে প্রসঙ্গে স্মৃতি বলেন, ‘‘১৯৫২ থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ১২ বার এসআইআর করা হয়েছে। যার মধ্যে ১০ বার কেন্দ্রে কংগ্রেসেরই সরকার ছিল।’’ এখন এসআইআর-কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির আসলে নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢাকতে চাইছে বলে স্মৃতির দাবি। তাঁর কথায়, ‘‘ব্যর্থ ইউপিএ ‘বিরোধী বাঁচাও সঙ্কল্প’ নিয়ে দেশের রাজধানীতে যখন উপস্থিত হলেন, তখন তৃণমূলের নেত্রীর মুখ থেকে ভুল করে একটা সত্যি কথা বেরিয়ে গিয়েছে। উনি পশ্চিমবঙ্গকে লুটেছেন আর দিল্লিও লুটতে চান— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্যটা পুরো দেশ দেখেছে এবং শুনেছে।’’
আরও পড়ুন:
বিভিন্ন রাজ্যে হওয়া এসআইআর-এ ইতিমধ্যেই ১৩ কোটির বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি এই ১৩ কোটি নাম বাদ যাওয়াকেই হাতিয়ার হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু করেছে। ভারতের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টিকে বেশ কয়েকটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও বেশ বড় করে দেখানো হয়েছে। ১৩ কোটি সংখ্যাটা যেহেতু বড়, সেহেতু ওই সংখ্যাটা তুলে ধরে কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির আন্তর্জাতিক মহলকেও বিভ্রান্ত করতে চাইছে বলে বিজেপির দাবি। কিন্তু নাম কেন বাদ গিয়েছে, কাদের বাদ গিয়েছে, সে হিসাবে চোখ রাখলেই বিভ্রান্তির অবকাশ থাকবে না বলে বিজেপি নেতারা বলছেন। স্মৃতি সে প্রসঙ্গে মঙ্গলবার বলেন, ‘‘দিল্লিতে যখন বিরোধী পক্ষের এক ব্যর্থ নেতা ভাষণ দিলেন, তখন ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ যাওয়ার কথা বললেন। কিন্তু একটা বিষয়কে এই বিরোধীরাও তো অস্বীকার করতে পারবে না যে, দেশের প্রতিটি বুথে প্রত্যেক ভোটারের কাছে তিন বার করে গিয়ে বিএলও-রা খোঁজখবর করেছেন। বিএলও-রা ঠিক করে কাজ করছেন কি না, তা দেখার জন্য ব্যর্থ ইউপিএ-র ২০ লক্ষ বিএলও ছিলেন।’’ স্মৃতির প্রশ্ন, ‘‘আপনাদের ২০ লক্ষ বিএলএ যখন এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তখন কি আপনারা নিজেদের কর্মীদেরকেই মিথ্যাবাদী বানাচ্ছেন?’’ কাদের নাম এসআইআর-এ বাদ পড়েছে, বিজেপির সাধারণ সম্পাদক তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সে হিসাবও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘‘১৩ কোটির মধ্যে তিন কোটি নাম তাঁদের, যাঁদের মৃত্যু হয়েছে। এক কোটি নাম একাধিক এলাকার ভোটার তালিকায় ছিল। তিন কোটি এমন নাম, যাঁদের বাড়িতে বিএলও বার বার গিয়েছেন, কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর ছ’কোটি ভোটার এমন, যাঁরা স্থানান্তরিত অর্থাৎ ঠিকানা বদলে গিয়েছে।’’
গোটা সাংবাদিক বৈঠকে অনেক বারই রাহুল গাঁধীকে কটাক্ষ করেছেন স্মৃতি। কিন্তু এক বারও রাহুলের নাম উচ্চারণ করেননি তিনি। রাহুলকে তিনি ‘অনন্ত অপেক্ষায় থাকা রাজকুমার’ বলে বার বার সম্বোধন করেছেন। স্মৃতির কথায়, ‘‘কংগ্রেস পার্টির অনন্ত অপেক্ষায় থাকা রাজকুমার ২০২৫ সালেই বলে দিয়েছিলেন যে, তাঁর লড়াই এখন মোদীর বিরুদ্ধে নয়, তিনি এ বার ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই লড়বেন। নিজের পরাজয় স্বীকার না করে ৯০ কোটি জনতার দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তিনি এখন অবৈধ বলছেন।’’
দেশে গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থার উপরে আঘাত হানার অভিযোগ তুলে স্মৃতি এক বন্ধনীতে দাঁড় করিয়েছেন কংগ্রেস ও তৃণমূলকে। রাহুলের বিরুদ্ধে তোপ দেগে তিনি বলেছেন, ‘‘অনন্ত অপেক্ষায় থাকা রাজকুমার প্রথমে সুপ্রিম কোর্টকে আক্রমণ করলেন। তার পরে ভারতীয় রাষ্ট্রের উপরে আক্রমণ ঘোষণা করলেন। এ বার আক্রমণ সুনিশ্চিত করছেন সেই নির্বাচন কমিশনের উপরে, যে সংস্থা দেশে গণতন্ত্রকে সুনিশ্চিত করে।’’ সেই কথার সূত্র ধরেই তৃণমূল তথা মমতা প্রসঙ্গে মুখ খোলেন স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘‘যে তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রকে পায়ের তলায় পিষেছে, বিজেপি কর্মীদের খুন করেছে, বিজেপির মহিলা কর্মীরা বুথে কাজ করলে চুলের মুঠি ধরে টেনে মারধর করেছে, ধর্ষণ করেছে, সেই রাজনৈতিক গুন্ডারাও অনন্ত অপেক্ষায় থাকা রাজকুমারের সভায় হাজির ছিল।’’
যে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কংগ্রেস পথে নেমেছে, সেই জ্ঞানেশ কুমার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার আগে (২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে) কংগ্রেস কতগুলি বিধানসভা নির্বাচনে হেরেছে, স্মৃতি সেই হিসাব তুলে ধরেন। তিনি মনে করা যে, গত ৫৯ বছর ধরে তামিলনাড়ুতে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসতে পারেনি। গত ৪৯ বছরে পশ্চিমবঙ্গে, ৩৭ বছরে উত্তরপ্রদেশে, ৩৬ বছরে বিহারে কংগ্রেসের সরকার আসেনি বলে মনে করিয়েছেন স্মৃতি। দেশবিরোধী শক্তির সঙ্গে রাহুল তথা কংগ্রেস হাত মিলিয়েছেন বলেও স্মৃতি অভিযোগ করেছেন। স্মৃতির কথায়, ‘‘রাজকুমার যাঁদের সঙ্গে নিয়ে চলছেন, তাঁরা কারা? তাঁরা ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনকে সমর্থন করে, ছত্তীসগঢ়ে আধা সেনার মৃত্যুতে উৎসব করে, বিরোধী দলনেতার পাশে হাঁটতে হাঁটতে তারা বলে, আমরা এ দেশকে বাংলাদেশ বানাব।’’