Advertisement
E-Paper

‘মেডিক্যাল কাউন্সিলে সুবিচার মিলবে কবে?’ প্রশ্ন তুলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ক্ষতিগ্রস্ত যুবক, দায় এড়াল সব পক্ষই

গত মে মাস থেকে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের কাছে সুবিচার প্রত্যাশীদের তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। সেই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরের বাসিন্দা চার বছরের অরণ্য রায়ের বাবা-মা।

সৌরভ দত্ত

শেষ আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:২৯
From Rakesh Maiti to Aranya Roy, deadlock of justice in state medical council

রাকেশ মাইতি। ছবি: সংগৃহীত।

রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সামনে অঝোরে কাঁদছেন বছর ছত্রিশের যুবক রাকেশ মাইতি। সুবিচার চান তিনি। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে চক্কর কাটার পরও সুবিচার না পাওয়ায় নিজের ভিতরে যে অসহায়তা তৈরি হয়েছে তা থেকেই কান্না। রাকেশের অভিযোগ, এক চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসার জন্য তিনি হাঁটাচলার ক্ষমতা হারিয়ে কার্যত শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। ‘হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপনে’র পরও পুরো সুস্থ হননি। তাঁর প্রশ্ন— তাঁর এই পরিণতির জন্য ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এক বছরের বেশি সময় ধরে এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে চলেছেন রাকেশ।

রাকেশ একা নন। গত মে মাস থেকে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের কাছে সুবিচার প্রত্যাশীদের তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। সেই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরের বাসিন্দা চার বছরের অরণ্য রায়ের বাবা-মা। অভিযোগ, ‘ভুয়ো’ চিকিৎসকের হাতে পড়ে গত ২ সেপ্টেম্বর প্রাণ গিয়েছে চার বছরের শিশুর। সপ্তাহ দুয়েক আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে গিয়েছিলেন রাকেশ। ঠিক তার চার দিনের মাথায় কাউন্সিলের সল্টলেকের কার্যালয়ে যান অরণ্যের বাবা জয়ন্ত রায় এবং মা শিল্পী রায়। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে প্রথমে বিধাননগর দক্ষিণ থানা, তার পর স্বাস্থ্য ভবনে যান অরণ্যের বাবা-মা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করে রাকেশের মতোই সুবিচারের দাবি জানান সদ্য সন্তানহারা দম্পতি।

ন্যায়বিচারের এই প্রতীক্ষাই রাকেশ মাইতি, শিল্পী রায়দের একই বন্ধনীতে এনে ফেলেছে। হাওড়ার যুবক রাকেশের ন্যায়বিচারের লড়াই বছরখানেক আগে শুরু হয়েছিল। গত বছরের অগস্টে এম কোলে নামে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন রাকেশ। কাউন্সিলে দায়ের করা অভিযোগপত্রে তিনি জানান, ২০২২ সালে প্রস্রাবের সঙ্গে বীর্য বেরিয়ে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে ওই চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। চিকিৎসক তাঁর প্রেসক্রিপশনে একটি ইঞ্জেকশন নেওয়ার জন্য লিখে দিয়েছিলেন। সেই ইঞ্জেকশন নেওয়ার পরই কোমরের নীচে অসহ্য যন্ত্রণা হতে থাকে। চিকিৎসককে সমস্যার কথা জানালেও তিনি ইঞ্জেকশন নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তিন মাস ওই ইঞ্জেকশন নিয়েছিলেন রাকেশ। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী, প্রেসক্রিপশনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক। এই ঘটনায় অভিযুক্ত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে কোনও রেজিস্ট্রেশন নম্বরের উল্লেখ ছিল না! যার প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত চিকিৎসক এম কোলের অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‘আমি সব ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশনে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করি না। আগে এই নিয়ম ছিল, এখন আর নেই!’’ মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অরিন্দম দাস প্রেসক্রিপশনে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক বলে জানিয়েছেন, এ কথা বলার পর এ বার ওই চিকিৎসকের জবাব, ‘‘তা হলে তা-ই হবে!’’

কাউন্সিলের কাছে যুবকের অভিযোগ, ইঞ্জেকশন নেওয়ার পর থেকে তাঁর কোমরে যে ব্যথা শুরু হয় তা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এক বছরের মাথায় তা এমন জায়গায় পৌঁছোয় যে, স্বাভাবিক হাঁটাচলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন যুবক। দিল্লির এক চিকিৎসক রাকেশকে পরীক্ষা করে জানান, তিনি ‘অ্যাভাসকুলার নেক্রোসিস’ রোগে আক্রান্ত। এসএসকেএমের অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক দেবজ্যোতি সরকার বলেন, ‘‘আমাদের হিপ জয়েন্টে যে বল থাকে সেটি গোলাকার। রক্ত সরবরাহ কম হলে গোলাকৃতি বল এবড়োখেবড়ো হতে থাকে। সেই থেকে রোগীর হাঁটাচলার সমস্যা শুরু হয়। রোগীর এই শারীরিক অবস্থাকে ‘অ্যাভাসকুলার নেক্রোসিস অফ ফিমোরাল হেড’ বলা হয়।’’

এই ধরনের রোগের চিকিৎসায় আক্রান্তের হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করা হয়। রাকেশের ক্ষেত্রেও তা-ই করা হয়েছে। তবে প্রতিস্থাপনের পরেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি তিনি। রাকেশের দাবি, ‘‘হাওড়ার চিকিৎসক আমাকে সাস্টানন ২৫০ নামে একটা ইঞ্জেকশন দিয়েছিলেন। দিল্লির যে চিকিৎসক আমার হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করেন, তিনি প্রথম ওই ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসকেরাও ওই ইঞ্জেকশনের ব্যবহারই আমার এই অবস্থার কারণ হতে পারে বলে জানান।’’ ভুল চিকিৎসার অভিযোগ অস্বীকার করে এম কোলের দাবি, ‘‘যুবক যে সমস্যা নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন তাতে ওই ইঞ্জেকশনই দেওয়া হয়। আমার চিকিৎসায় কোনও ভুল নেই।’’ এই সকল চিকিৎসা সংক্রান্ত নথির প্রেক্ষিতেই হাওড়ার চিকিৎসকের দেওয়া ইঞ্জেকশন তাঁর শারীরিক অবস্থার জন্য দায়ী কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর চেয়ে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের দ্বারস্থ হয়েছিলেন রাকেশ।

কিন্তু প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা! উল্টে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা নিয়েই ব্যস্ত সব পক্ষ। রাজ্যে পালাবদলের পর তৃণমূল আমলে তৈরি মেডিক্যাল কাউন্সিলের বোর্ডকে লাগাতার নিশানা করে চলেছেন বিজেপি মনোভাবাপন্ন চিকিৎসকেরা। তাঁদের বক্তব্য, কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায়, সহ-সভাপতি সুশান্ত রায়দের জন্যই রাজ্য জুড়ে ‘ভুয়ো চিকিৎসক’দের বাড়বাড়ন্ত। রাকেশদের যে সুবিচার পেতে দেরি হচ্ছে তার জন্যও দুই ‘রায়’কেই কাঠগড়ায় তুলেছেন তাঁরা। মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি, সহ-সভাপতির পদত্যাগ চায় অন্য চিকিৎসক সংগঠনগুলিও। অন্য দিকে, অচলাবস্থার দায় ‘আন্দোলনকারী’দের উপরেই চাপিয়েছেন সভাপতি, সহ-সভাপতি।

এই আবহে শিকেয় উঠেছে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের স্বাভাবিক কাজকর্ম। গত ছ’মাসে কার্যত কোনও শুনানিই করে উঠতে পারেনি কাউন্সিল। কত শুনানি বাকি রয়েছে? রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল সূত্রের খবর, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৬৫৭টি অভিযোগের মধ্যে ৩৫০টি অভিযোগের শুনানি বাকি রয়েছে। ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত সুবিচারের আশায় কাউন্সিলে ১৪৬টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তার মধ্যে একটিরও শুনানি সম্পূর্ণ হয়নি। ১৪৬টি অভিযোগের মধ্যে ৮১টি অভিযোগের ক্ষেত্রে নথি আনানোর কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৬৫টি’র ক্ষেত্রে তা-ও করা সম্ভব হয়নি।

‘অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হাসপাতাল অ্যান্ড নার্সিংহোম’-এর সম্পাদক রাজীব পাণ্ডে বলেন, ‘‘সুদীপ্ত রায়, সুশান্ত রায়রা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে কাউন্সিলের বৈঠক ডাকছেন না। এ বিষয়ে শুনানি করে ‘পেনাল অ্যান্ড এথিক্যাল কমিটি’। সেটি নতুন করে তৈরি করার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আর্জি জানিয়েছি।’’ ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকীর বক্তব্য, ‘‘শুধু সাধারণ মানুষ নন, এমবিবিএস শেষে ইন্টার্নশিপ করার জন্য হবু চিকিৎসকদের প্রোবেশনাল রেজিস্ট্রেশন পেতে সমস্যা হচ্ছে। প্রোবেশনাল থেকে যাঁরা স্থায়ী রেজিস্ট্রেশন পেতে চান তাঁরাও অসুবিধায় পড়েছেন। এ রকম আরও অনেক বিষয় রয়েছে। কিন্তু সভাপতি তো বৈঠকই ডাকছেন না! স্বাস্থ্য ভবনই বা কী করছে?’’ অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সুদীপ্ত রায়, সুশান্ত রায়দের নেতৃত্বে যে মেডিক্যাল কাউন্সিল রয়েছে সেটি যে অবৈধ তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এই মেডিক্যাল কাউন্সিলই তো অভীক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাস, সন্দীপ ঘোষের মতো দুর্নীতিগ্রস্তদের প্রভাবশালী করে তুলেছিল। সেখানে ন্যায়বিচার মিলবে কী ভাবে? এই মেডিক্যাল কাউন্সিলের অ্যাপিলেট অথরিটি স্বাস্থ্যসচিব। কাজেই স্বাস্থ্য ভবন দায় এড়াতে পারে না।’’

মেডিক্যাল কাউন্সিলে সরকার মনোনীত সদস্য চিকিৎসক কল্যাণ আশিস মুখোপাধ্যায়ও বলেন, ‘‘সভাপতিই বৈঠক ডাকছেন না। আমরা বৈঠক ডাকতে গেলে আইনি জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আমাদেরও তো হাত-পা বাঁধা!’’ সম্মিলিত এই আক্রমণের মুখে সভাপতি সুদীপ্ত রায় বলেন, ‘‘১৪টি ‘পেনাল অ্যান্ড এথিক্যাল কমিটি’ রয়েছে। নতুন তিন জন সদস্য আমাকে চিঠি দিলে তাঁদের নিয়েও ‘পেনাল অ্যান্ড এথিক্যাল কমিটি’ তৈরি করে দেব। আমরাও তো চাই কাজ হোক। কিন্তু ১৪টি ‘পেনাল এথিক্যাল কমিটি’র চেয়ারম্যানেরা কেন বৈঠক ডাকছেন না? তাঁদের কারা বাধা দিচ্ছেন, খোঁজ নিন। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল ট্রেড ইউনিয়নের ধাঁচে আন্দোলন করার জায়গা নয়। দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি সেটাই হচ্ছে।’’

সহ-সভাপতি সুশান্ত বলেন, ‘‘রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের নিয়ম মেনেই আমরা কাজ করেছি। কোথাও কোনও অনিয়ম হয়নি। শুধু অভিযোগ করলেই তো হবে না। অভিযোগ প্রমাণও করতে হবে।’’ তবে সভাপতি, সহ-সভাপতি যা-ই বলুন, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে অচলাবস্থা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বতের বক্তব্য, ‘‘নৈতিক দিক থেকে সুদীপ্ত রায়ের পদত্যাগ করা উচিত। উনি পদত্যাগ না করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে সচিব স্তরে আলাপ-আলোচনা চলছে। সুদীপ্ত রায়, সুশান্ত রায়দের অনেক দিন সময় দেওয়া হয়েছে।’’

State Medical Council Medical Council West Bengal Medical Council Health Department West Bengal health department

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy