লালবাজারে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে পরস্পরকে দোষারোপ করে চলেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন। তদন্তকারীদের সূত্রে এমনটাই জানা গিয়েছে। দুর্গাপুজোর পাস নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে ইন্দ্রনীলকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। একই মামলায় তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। তবে কলকাতা হাই কোর্ট মধুছন্দাকে আগাম জামিন দিয়েছে। তাঁকে লালবাজারে তলব করে দু’দিন জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্তকারীরা। সূত্রের খবর, স্বামীর মুখোমুখি বসে জেরার সময় মধুছন্দা দাবি করেছেন, তিনি ইন্দ্রনীলকে বারণ করতেন। কিন্তু তাঁর কথা শোনেননি চন্দননগরের প্রাক্তন বিধায়ক। আবার, ইন্দ্রনীল জেরায় পাল্টা দাবি করেছেন, তাঁর স্ত্রী সব জানতেন। কোনও কিছুই তাঁর অজানা ছিল না!
২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পরপর ‘মাস আর্ট’ নামের একটি সংস্থা গড়ে উঠেছিল। মধুছন্দা ছিলেন তার ডিরেক্টর। অভিযোগ, ওই সংস্থার মাধ্যমে দুর্গাপুজোর পাস বিক্রি, প্রিভিউ শো-এর নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। বেআইনি ভাবে ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে ইন্দ্রনীলরা টাকা তুলতেন। ইডি-ও আর্থিক দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। এ ছাড়া, মন্ত্রী থাকাকালীন পর্যটন দফতরের টেন্ডার নিয়ে বিবিধ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে। নিজের মেয়ের অ্যাকাউন্ট এ ক্ষেত্রে তিনি কাজে লাগাতেন, জানতে পেরেছে পুলিশ।
আরও পড়ুন:
ইন্দ্রনীলের কন্যাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লালবাজারে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। পর পর দু’দিন তিনি হাজিরা এড়িয়েছেন। জানিয়েছেন, তিনি অসুস্থ। তাই আরও সময় চাই। সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার তাঁকে ফের তলব করা হয়েছে। লালবাজারের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, এর পরেও হাজিরা না দিলে কঠোর পদক্ষেপ করা হতে পারে তাঁর বিরুদ্ধে।
লালবাজার সূত্রে দাবি, পর্যটন দফতরের বিভিন্ন কাজের টেন্ডার এবং দুর্গাপুজোর পাস মিলিয়ে ইন্দ্রনীলের দুর্নীতির পরিমাণ ১০০ কোটির বেশি। শেষ পাঁচ বছরে ওই বিভাগের অন্তত ১৫০টি টেন্ডার পেয়েছে মোট তিনটি সংস্থা। তিনটিই ইন্দ্রনীলের পরিচিতের। এই সংস্থাগুলির অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথমে প্রাক্তন মন্ত্রীর কন্যার অ্যাকাউন্টে টাকা যেত। পরে সেখান থেকে আবার ইন্দ্রনীলের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হত। দীর্ঘদিন ধরেই তাই ইন্দ্রনীলের কন্যার অ্যাকাউন্টের লেনদেন তদন্তকারীদের নজরে ছিল। অভিযোগ, বিভিন্ন জায়গায় ব্যানার লাগানো, মিষ্টি বিতরণ থেকে শুরু করে বলিউড তারকা অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন, রাস্তা সাজানোর মতো কাজের টেন্ডার বেছে বেছে নির্দিষ্ট সংস্থাগুলিকে দিতেন ইন্দ্রনীল। বিনিময়ে মোটা টাকা নিতেন। সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে এই সংক্রান্ত নথি চেয়েছে পুলিশ।
ইন্দ্রনীলের মামলার তদন্তে পুলিশ যে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছে, তাঁর সদস্যসংখ্যা ৫ থেকে বাড়িয়ে ৯ করা হয়েছে। মধুছন্দা-সহ এখনও পর্যন্ত আট থেকে ন’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। সূত্রের খবর, জেরায় ইন্দ্রনীল জানিয়েছেন, মধুছন্দা সব জানতেন। পাল্টা মধুছন্দার দাবি, বারণ করা সত্ত্বেও স্বামী তাঁর কথা শুনতেন না। স্বামী এবং স্ত্রীর মতানৈক্য বার বার প্রকাশ্যে এসেছে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের সময়। মধুছন্দার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইন্দ্রনীলকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের কন্যাকেও একই বিষয়ে প্রশ্ন করা হতে পারে।