চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে চাইছে রাজ্য প্রশাসন। আসন্ন কালীপুজো, দীপাবলি, জগদ্ধাত্রীপুজো, কার্তিকপুজো এবং ছট উৎসবকে কেন্দ্র করে তাই নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও রকম ঝুঁকি নিতে নারাজ নবান্ন। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো থেকে শুরু করে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা, ঘাটের নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্নতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই একগুচ্ছ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই মর্মে জারি হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়োর (এসওপি)। সেই নির্দেশে বলা হয়েছে, থিমের স্বার্থে মণ্ডপে আলো-আঁধারি পরিবেশ তৈরি করা যাবে না। সর্বত্র রাখতে হবে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। মণ্ডপের অভ্যন্তরে এবং প্রবেশ-প্রস্থানের পথে তো বটেই, যে প্যাসেজ দিয়ে দর্শনার্থীরা যাতায়াত করবেন, সেখানেও যথেষ্ট আলোর ব্যবস্থা করতে হবে।
২৮ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নবান্ন সভাঘরে উৎসবের নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠক করেছিলেন। এর পর গত বৃহস্পতিবার পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের নেতৃত্বে নগরায়ন ভবনে আয়োজিত এক সমন্বয় বৈঠকে আসন্ন উৎসবগুলির প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হয়। সেই বৈঠকের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট দফতর, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং পুরসভাগুলির জন্য নির্দেশিকা তৈরি করেছে নবান্ন। নির্দেশ অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন, থানা, দমকল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং পুরসভার সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের নিয়ে সমন্বয় বৈঠক করতে হবে। প্রতিটি মণ্ডপ ও ঘাটে নিরাপদে প্রবেশ এবং বেরোনোর ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। মণ্ডপের পরিকল্পনাও প্রতিটি ক্ষেত্রে মহকুমাশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে পুলিশকে পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে।
ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে প্রশাসন। প্রত্যাশিত দর্শনার্থীর সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি মণ্ডপে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক রাখতে হবে। আগের দল মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেই পরবর্তী দলকে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। অর্থাৎ, মণ্ডপের ভিতরে দর্শনার্থীদের চাপ যাতে কোনও ভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে উদ্যোক্তাদের। প্রবেশ ও প্রস্থানপথের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের যাতায়াতের সম্পূর্ণ পথেও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভিড়ের পরিমাণ বুঝে পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশও রয়েছে। বড় পুজোগুলিতে অ্যাম্বুল্যান্স এবং প্রতিটি মণ্ডপে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলাতেও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে নবান্ন। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে এবং এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে দমকলের সাহায্য পৌঁছোয়। বড় ঘাট ও মণ্ডপগুলিতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মী মোতায়েন করতে হবে। ঘাটে নামার ক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট ও উদ্ধার সরঞ্জাম রাখার কথাও বলা হয়েছে। মণ্ডপের আশপাশে বাজি পোড়ানো নিষিদ্ধ। দোকান বা স্টল বসানোর ক্ষেত্রেও দর্শনার্থীদের যাতায়াতের পথে বাধা তৈরি করা যাবে না।
আরও পড়ুন:
শব্দ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণেও কড়া নজরদারির নির্দেশ রয়েছে। বেআইনি বাজির ব্যবহার বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে পরিবেশবান্ধব বাজি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। মাইকে নির্দিষ্ট শব্দসীমা বজায় রাখতে সাউন্ড লিমিটার ব্যবহার এবং শব্দবিধি অনুযায়ী মাইক বাজানোর সময়সীমা কঠোর ভাবে কার্যকর করতে হবে। পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে যৌথ ভাবে নজরদারি চালাতে বলা হয়েছে। বাজি নিয়ে পৃথক নির্দেশিকা স্বরাষ্ট্রসচিবের দফতর থেকে ঘোষণা করা হয়েছে।
ছট ও প্রতিমা নিরঞ্জনের ঘাটগুলির জন্যও আলাদা নির্দেশিকা রয়েছে। ঘাট পরিষ্কারের জন্য বিশেষ দল, ভিজে ও শুকনো বর্জ্য পৃথক করে রাখার জন্য বড় মাপের পাত্র, পর্যাপ্ত আলো, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি বসাতে হবে। জলাশয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যারিকেড, মহিলাদের পোশাক বদলের পৃথক ঘর, গাড়ি রাখার জায়গা এবং পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবকদের পুরসভার পরিচয়পত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক। উৎসবের আগের দিন থেকে ছটের পরের দিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পুরসভার নিয়ন্ত্রণকক্ষ ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার নির্দেশও দিয়েছে নবান্ন।