Advertisement
E-Paper

সকালে ‘ভাবনা’ রবীন্দ্র সরোবরে ফের ছটপুজোর! পরিবেশপ্রেমীরা আদালতের রায় মনে করাতেই বিকেলে ঢোক গিললেন অগ্নিমিত্রা

প্রায় ন’বছর ধরে আদালতের নির্দেশে রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো বন্ধ। পরিবেশ দূষণের কথা মাথায় রেখেই এই নির্দেশ। মন্ত্রীর এই ভাবনাচিন্তার কথা প্রকাশ্যে আসার পর নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ১৪:৪৯
Minister Agnimitra Paul proposes allowing Chhath Puja at Rabindra Sarobar and Subhas Sarobar

রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো করতে দেওয়ার ভাবনা রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রবীন্দ্র সরোবর এবং সুভাষ সরোবরে এ বছর ছটপুজো করতে দেওয়ার ভাবনার কথা বুধবার সকালে জানিয়েছিলেন রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি এ-ও জানিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর। অগ্নিমিত্রার দাবি ছিল, রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো করতে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইচ্ছা আছে মুখ্যমন্ত্রীরও। অগ্নিমিত্রার ‘ভাবনা’র কথা প্রকাশ্যে আসতেই আদালতের রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে সরব হন পরিবেশপ্রেমীরা। এর পরেই বুধবার বিকেলে সুর বদলান মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা।

প্রায় ন’বছর ধরে আদালতের নির্দেশে এই রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো বন্ধ। পরিবেশ দূষণের কথা মাথায় রেখেই এই নির্দেশ। মন্ত্রীর এই ভাবনাচিন্তার কথা প্রকাশ্যে আসার পর প্রশ্ন ওঠে, তবে কি আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে পদক্ষেপ করবে সরকার? যদিও মন্ত্রী সকালে দাবি করেছিলেন, পরিবেশ আদালতের (গ্রিন ট্রাইবুনাল কোর্ট) সঙ্গে কথা বলেই সবকিছু করা হবে। তবে পরিবেশপ্রেমীদের একাংশের দাবি ছিল, বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। যদি সেই নির্দেশ অমান্য হয়, তবে বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা।

রবীন্দ্র সরোবরে ছট পুজোর অনুমতি পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে বুধবার বিকেলে মন্ত্রী সন্দেহ প্রকাশ করেন। যোধপুর পার্কে রবীন্দ্র সরোবরের অদূরে একটি জলাশয় পরিদর্শন করেন তিনি। সেই জলাশয় পরিদর্শন করার পর মন্ত্রী বলেন, ‘‘এই জলাশয়টি রবীন্দ্র সরোবরের একদম কাছে। যদি রবীন্দ্র সরোবরে অনুমতি না-পাওয়া যায়, তা হলে অবাঙালিদের জন্য দক্ষিণ কলকাতায় ৫০টি জলাশয়ের আমরা ব্যবস্থা রাখছি ছটপুজোর জন্য। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনালের একটা অর্ডার আছে। সেটা ক’বছর আগের অর্ডার বলতে পারব না। কিন্তু একটা অর্ডার আছে। রবীন্দ্র সরোবরের বাস্তুতন্ত্রের কথা ভেবে সেই অর্ডার দেওয়া হয়েছিল। আমার লিগাল সেল বিষয়টা দেখছে।’’

রবীন্দ্র সরোবর এবং সুভাষ সরোবরে ছটপুজো-নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বুধবার সকালে প্রশ্ন করা হয় অগ্নিমিত্রাকে। জবাবে তিনি বলেন, ‘‘ছটপুজো করতে দেওয়া হত না। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা ভাবছি, এ বার রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো করতে দেব। কেন দেব না? ওখানকার মানুষগুলো কোথায় ছটপুজো করবেন!’’ তিনি এ-ও জানিয়েছিলেন, রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো নিয়ে সতর্কতামূলক সব রকম পদক্ষেপ করা হবে। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা বলেছিলেন, ‘‘গ্রিন ট্রাইবুনালের সঙ্গে আমরা কথা বলব। আমি নিশ্চিত, কোনও না কোনও পথ বেরিয়ে আসবে। আমরা ওখানে ময়লা করব না, করতেও দেব না।’’

পরে বিকেলে তিনি বলেন, ‘‘আমার ইচ্ছে, যদি রবীন্দ্র সরোবরে করা যায়। আমি বাকিগুলোও দেখে রাখছি। রবীন্দ্র সরোবরের অনুমতি পেলে খুবই ভাল। যদি অনুমতি না পাই, সে ক্ষেত্রে তো পরিবেশ আদালতের অনুমতির বিরুদ্ধে যেতে পারব না। সেজন্য ৫০টা ঘাট দক্ষিণ কলকাতায় তৈরি থাকছে।’’

সকালে মন্ত্রীর ‘ভাবনা’ প্রকাশ্যে আসতেই এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন পরিবেশকর্মী তথা সবুজ মঞ্চের সম্পাদক নব দত্ত। তিনি বলেন, ‘‘আদালতের নির্দেশ রয়েছে তো। তার পরে আবার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা কিসের!’’

আগে রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো হত। কিন্তু ছটপুজো মেটার পর ওই এলাকার পরিবেশ দূষণের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ দেখাতেন পরিবেশপ্রেমীরা। ঢাকঢোল বাজানোয় যেমন শব্দ দূষণ হত, তেমনই জল দূষণের মাত্রা বৃদ্ধিও চোখে পড়ত। সেই সব বিষয় নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন পরিবেশপ্রেমীরা। চেয়েছিলেন, রবীন্দ্র সরোবরের মতো জাতীয় সরবোবরে বন্ধ হোক ছটপুজো। মামলায় জুড়ে গিয়েছিল সুভাষ সরোবরের প্রসঙ্গও। শুধু ঢাকঢোল বাজানো নয়, জোরে জোরে বাজত সাউন্ড বক্সও। পুলিশের নির্দেশ অমান্য করে ছটপুজোর সময় আতশবাজি পোড়ানোর অভিযোগও ওঠে। সেই সব বিষয় মাথায় রেখেই রবীন্দ্র সরোবর এবং সুভাষ সরোবরে ছটপুজো বন্ধ করার জন্য পরিবেশ আদালতে মামলা হয়। সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ২০১৭ সালে রবীন্দ্র সরোবর এবং সুভাষ সরোবরে ছটপুজোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত।

তবে ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে আদালতের নির্দেশ অমান্য করেই রবীন্দ্র সরোবরে ঢুকে পড়েছিল একদল লোক। রীতিমতো ‘তাণ্ডব’ চলে। সেই সময় পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। পরিবেশ আদালতের নির্দেশ অমান্য করার ঘটনাকে সামনে রেখে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন পরিবেশপ্রেমীরা। সেই মামলায় ২০২০ সালে হাই কোর্ট পরিবেশ আদালতের নির্দেশ বহাল রাখে। যদিও তা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা দেখা যায়। তৎকালীন তৃণমূল সরকার হাই কোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায়। সেই মামলাটি এখনও বিচারাধীন। তবে হাই কোর্টের নির্দেশের উপর কোনও হস্তক্ষেপ করেনি শীর্ষ আদালত। পরিবেশপ্রেমীদের প্রশ্ন, যে বিষয় এখনও সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন, সেখানে কী ভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে সরকার? অতীতে এ বিষয়ে আদালতে যিনি মামলা করেছিলেন সেই পরিবেশপ্রেমী সুভাষ দত্ত স্পষ্ট জানান, যে বিষয় সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন, সেটা নিয়ে পরিবেশ আদালত কী বলবে! তাঁর কথায়, ‘‘আদালতের নির্দেশ আছে। এটা মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না। যদি পুজো হয়, তবে অবশ্যই বিষয়টা সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনা হবে।’’

সুভাষের মতে, রবীন্দ্র সরোবর বা সুভাষ সরোবরে যদি ছটপুজো করতে হয় তবে রাজ্য সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হবে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পরেই তা সম্ভব।

একই কথা বলছেন পরিবেশকর্মী নব দত্ত। তাঁর কথায়, ‘‘রবীন্দ্র সরোবর দক্ষিণ কলকাতার ফুসফুস। আদালতের নির্দেশে সেখানে ছটপুজো করা বন্ধ রয়েছে। আদালতের নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে কি না তা-ও দেখার দায়িত্ব কেএমডিএ-র। আর সেই দফতরের মন্ত্রী যদি বলেন অনুমতি দেবেন, তা হলে ব্যুমেরাং হবে!’’

রবীন্দ্র সরোবরে দূষণ এখন কেমন অবস্থায় রয়েছে, তা বর্ণনা করতে গিয়ে মর্নিং ওয়াকার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৌমেন্দ্রমোহন ঘোষ বলেন, ‘‘৯ বছর বাদে শোনা যাচ্ছে, রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো ফিরছে। সরকার যদি বিজ্ঞানসম্মত ভাবে কিছু করে সেখানে আমার কিছু বলার নেই। তবে আজকেও লেকের জলে মাছ মারা গিয়েছে। সেখানকার জল এখনও দূষিত।’’ ছটপুজো হলে সেই দূষণের মাত্রা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।

বুধবার বিকেলে মন্ত্রী যদিও বলেন, ‘‘আমি পরিবেশকে সম্মান দিতে ভালবাসি। পরিবেশ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দূষণের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। তবে আমাদের সরকার বাঙালি সমাজের পাশে আছে। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা আজও স্পিডবোট নিয়ে গঙ্গার ঘাট পরিদর্শন করেছি। সমস্ত ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখেছি।’’

chhath puja Rabindra Sarobor Agnimitra Paul

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy