দু’বছর আগে লোকসভা ভোটের সময়ে গন্ডগোল থেকে ১৭ বছর আগের রাজনৈতিক ঘটনা, তৃণমূল জমানা থেকে বাম আমলের নানা মামলার হিসেব হবে এ বার। ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তৃণমূল এবং সিপিএমকে এক পঙ্ক্তিতে ফেলে জঙ্গলমহল থেকে তাঁর ঘোষণা, খুলছে নন্দীগ্রামের ‘অপারেশন সূর্যোদয়’ ফাইল।
শনিবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতায় বিজেপির ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ সভায় উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন শাসক তৃণমূলের একের পর ‘রাজনৈতিক আক্রমণের’ তথ্য তিনি তুলে ধরেন বক্তৃতায়। টেনে আনেন ২০২৪ সালে মে মাসে ঝাড়গ্রামের বিজেপি প্রার্থী প্রণত টুডুকে ‘মারধরের’ প্রসঙ্গও।
ঝাড়গ্রামে ভোটগ্রহণের দিন তৃণমূলের হামলার শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছিলেন প্রণত। তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরাও জখম হয়েছিলেন বলে অভিযোগ। গড়বেতা হাসপাতালে চিকিৎসার পর পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন বিজেপির চিকিৎসক-প্রার্থী। শনিবার তার এফআইআর কপি চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু জানতে চাইলেন, ওই মামলায় কত জন গ্রেফতার হয়েছিলেন। বস্তুত, পাল্টা প্রণতের বিরুদ্ধে মহিলার উপর নির্যাতনের অভিযোগ করেছিল তৃণমূল। শুভেন্দু হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘‘২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের দিন প্রণত টুডুর মাথা ফাটিয়েছিল মনে আছে।’’ সভায় উপস্থিত প্রণতের দিকে ঘুরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘ওই দিনের এফআইআর কপিটা দেবেন আমাকে। ওই ঘটনায় কতগুলো গ্রেফতার হয়েছে দেখব। যারা গ্রেফতার হয়নি, তাদের প্রত্যেককে চুলের মুঠি ধরে জেলে ঢোকাব। কেশপুরেও একই ভাবে অত্যাচার করেছে।’’
তার পর বিধানসভা ভোটের আগে চন্দ্রকোনায় তাঁর কনভয়ে হামলার কথা টেনে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘পুরুলিয়া থেকে ফেরার পথে চন্দ্রকোনায় আমি আক্রান্ত হয়েছিলাম। সারারাত থানায় বসেছিলাম। সেদিন অনেকেই আক্রান্ত হয়েছিলেন। আমি সব মনে রেখেছি।’’ তৃণমূলকে দুষে ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর বামেদের প্রসঙ্গে চলে যান মুখ্যমন্ত্রী। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের একটি মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তার পর জানান, ১৭ বছর আগে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে ‘অপারেশন সূর্যোদয়’-এর ফাইল খুলবেন।
জমি আন্দোলনে উত্তপ্ত নন্দীগ্রামে রাজনৈতিক জমি ফিরে পেতে ২০০৭ সালের ১০ নভেম্বর ‘সূর্যোদয়’ অভিযানের ডাক দিয়েছিল রাজ্যের তৎকালীন শাসক সিপিএম। সে দিনের রক্তাক্ত অভিযানে প্রাণ গিয়েছিল জমি আন্দোলনের একঝাঁক নেতা-কর্মীর। তার পর থেকে প্রতি বছর এই দিনটিতে নন্দীগ্রামের ‘শহিদ স্মরণ’ কর্মসূচির আয়োজন করে তৃণমূল। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর আলাদা করে ওই কর্মসূচি পালন করেন শুভেন্দু। শনিবার তিনি অভিযোগ করেন, পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতায় সিপিএমের পার্টি অফিস থেকে আগ্নেয়াস্ত্র গিয়েছিল নন্দীগ্রামে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘ছোট আঙারিয়া থেকে শুরু করে নন্দীগ্রাম, যারা গড়বেতা থেকে বন্দুক নিয়ে রক্তাক্ত সূর্যোদয় করতে গিয়েছিল, সেই মামলা আমি ‘রিওপেন’ করব। নন্দীগ্রামের সূর্যোদয় মামলা আমি ‘রিওপেন’ করব।’’ ছোট আঙারিয়া কিংবা নন্দীগ্রাম, ‘হামলায় জড়িতদের’ রেয়াত করা হবে না বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। গড়বেতার একদা প্রভাবশালী সিপিএম নেতা গড়বেতার তপন ঘোষ এবং সুকুর আলির নাম জড়ানো মামলার দিকে ইঙ্গিত করে তপন ঘোষ এখন কোথায়, তা-ও জানতে চান। জেলা পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানার দিকে তাকিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘পুলিশ সুপার ম্যাডামকে নির্দেশ দিয়ে যাব, ওদের খুঁজে আনতে হবে। আমি জেলে দেখতে চাই (ওদের)।’’
আরও পড়ুন:
নির্বাচনে জঙ্গলমহলে বিজেপির সার্বিক ফলাফলে খুশি মুখ্যমন্ত্রী। বিরোধীদের কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘এখন যাহা তৃণমূল তাহাই সিপিএম। দুইয়ে মিলে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছে। আপনারা রুখে দেবেন।’’ আবার পুলিশের কাজ নিয়েও সাবধান করেছেন পুলিশমন্ত্রী। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে জানিয়েছেন, পুলিশ রাস্তায় হাত পেতে টাকা চাইলে, গরুপাচার হচ্ছে কি না, এ সব লক্ষ্য রাখতে হবে সকলকে। বালি পাচার বন্ধ হয়ে কি না জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি ঘোষণা করেছেন, আগামী বাজেটে গড়বেতাকে মহকুমার ‘স্বীকৃতি’ দেওয়া হবে।