এ বার থেকে রাজ্য সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলে নবনিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা আর প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন না। পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা কিংবা লোকসভা— তাঁরা প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না কোনও স্তরের নির্বাচনেও। বুধবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ভাবে গৃহীত হয়েছে।
বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশের অন্যান্য রাজ্যে সরকারি শিক্ষকেরা প্রত্যক্ষ ভাবে রাজনীতি করতে পারেন না। পশ্চিমবঙ্গ সরকার আজ ক্যাবিনেটে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল। আজকের পর থেকে স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে যে সব নতুন শিক্ষক-শিক্ষিকার নিয়োগ হবে, তাঁরা কোনও রকম প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন না।”
তবে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে কর্মরত যে সব শিক্ষক-শিক্ষিকা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের অধিকার এই মুহূর্তে খর্ব করা হচ্ছে না। এই নতুন বিধিনিষেধ বলবৎ হবে ভবিষ্যতের সমস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে। রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনের অতীত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ৩৪ বছরের বাম আমল এবং পরবর্তী ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার দুর্নীতির কারণে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল, সেই জায়গা থেকে শিক্ষামন্দিরে পড়াশোনার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই রাজ্য উদ্যোগী হয়েছে।
মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর সরাসরি ‘কুঠারাঘাত’ বলে তোপ দেগেছেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন অধ্যাপক প্রদীপ ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “রাজ্য সরকারের এই একতরফা সিদ্ধান্ত কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই উদ্যোগ কার্যকর করার চেষ্টা হলে তা নিশ্চিত ভাবে আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দেশের অন্যান্য রাজ্যে কোথাও শিক্ষকেরা প্রত্যক্ষ রাজনীতি করতে পারেন না বলে মুখ্যমন্ত্রী যে দাবি করেছেন, তা সর্বৈব অসত্য।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, সরকারের সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী। তাঁর ক্ষোভ, “আগে তো সরকারি স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। স্কুলে শিক্ষকই নেই অথচ শিক্ষকেরা রাজনীতি করতে পারবেন কি না তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে!” তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত হওয়া উচিত ৩০:১। সেই লক্ষ্যপূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে রাজ্য সরকার নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে চাইছে বলে সুজনের অভিযোগ। তাঁর বক্তব্য, ‘‘স্কুলে আসলে প্রয়োজন পরিকাঠামোর সার্বিক মানোন্নয়ন। পরিচালনার ক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে রক্ষা করাও প্রয়োজন। যাঁরা শিক্ষকতার পেশায় রয়েছেন, তাঁদের প্রধান কাজ স্কুলে পড়ানো। অথচ তাঁদের দিয়ে এসআইআর বা জনগণনার মতো ‘অশিক্ষকসুলভ কাজ’ করানো হচ্ছে। সরকার বরং সে দিকে নজর দিক।’’
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘আজ মুখ্যমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ঘোষণা করেছেন যে, এই সরকারের আমলে নিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা প্রত্যক্ষ রাজনীতি করতে পারবেন না। তিনি অন্য রাজ্যের উদাহরণ দিয়েছেন। কিন্তু অন্য রাজ্যের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা যেহেতু সরকারি কর্মীর মর্যাদা পান তাই তাঁরা রাজনীতি করতে পারেন না। আমাদের রাজ্যের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের সরকারি কর্মীর মর্যাদা না-দিয়ে সরকার কোনও মতেই তাঁদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে পারেন না।’’
অন্য দিকে, মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান বলেন, ‘‘এটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। এক জন শিক্ষক শিক্ষকতা করবেন, আবার নেতাগিরিও করবেন— এতে ভুগতে হয় পড়ুয়াদের। শিক্ষক যদি জনপ্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁকে ২৪ ঘণ্টা মানুষের পরিষেবা দিতে হয়। তা হলে শিক্ষকতা করবেন কখন? স্কুলের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এটা সঠিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে করি।’’
অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক চন্দন মাইতির মতে, ‘‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে একটা সময় সমাজ গড়ার কাজে শিক্ষকেরাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিক্ষকেরা ভোটের রাজনীতির মাধ্যমে মন্ত্রী হয়ে ভাল কাজ করেছেন সেই নজির রয়েছে। এই সরকারেও শিক্ষকদের মন্ত্রী, বিধায়ক হওয়ার নজির রয়েছে। শিক্ষকদের ভোটে দাঁড়ানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া মানে সমাজের যাঁদের মেরুদণ্ড বলা হয় তাঁদের দূরে সরিয়ে রাখা। শিক্ষকদের বাদ দিয়ে সমাজ পরিপূর্ণ হতে পারে না। ছাত্র গড়ার পাশাপাশি একজন শিক্ষক যদি সমাজ গড়ার কাজেও ব্রতী হন তাতে অসুবিধা কোথায়? এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আর্জি জানাচ্ছি।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আগে তাঁদের সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দেওয়া হোক। সেটা হলে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই।’’
সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ যদিও জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তে তাঁদের কোনও আপত্তি নেই। শুধু এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে রাজ্যের শিক্ষকদের সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দেওয়া হোক। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের রাজ্যে শিক্ষকেরা সরকার পোষিত ক্ষেত্রের কর্মচারী। আমাদের মধ্যে থেকে যে সকল শিক্ষক দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এ রাজ্যে আইনত তা স্বীকৃত। এখন পরিবর্তনের সরকারের মন্ত্রিসভাতেও একাধিক মন্ত্রী, বিধায়ক রয়েছেন, যাঁরা শিক্ষক। শিক্ষিত মানুষ যদি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকেন তা হলে রাজনীতির মান আরও কমবে বলেই আমরা মনে করি।’’
অন্য দিকে, মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক আলিফা আহমেদ বলেন, ‘‘শিক্ষকেরা দেশ তৈরির কারিগর। তাঁদের যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সেই চোখ দিয়ে তাঁরা সমাজকে দেখেন। সমাজ গঠনে তাঁদের যে ভূমিকা সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই শিক্ষকেরা যদি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন তা হলে সমাজ এগোতে পারে। এখানে যদি ছাঁকনি দিয়ে শিক্ষকদের একটা গণ্ডিতে বেঁধে দেওয়া হয়, সেটা গণতন্ত্রের পক্ষে, দেশের পক্ষে এবং সমাজের পক্ষে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।’’
মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদক অনিমেষ হালদার বলেন, ‘‘শিক্ষকদের রাজনীতি ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মতো ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অন্য দিকে, শিক্ষক ও দার্শনিক সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন শিক্ষাজগৎ থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁদের জীবন প্রমাণ করে, শিক্ষা ও রাজনীতি পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বর্তমান রাজনৈতিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের আরও বেশি করে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অধিকার রক্ষা করতে প্রয়োজনে আমরা সর্বাত্মক আন্দোলনে যাব।’
এসইউসিআই (কমিউনিস্ট) দলের রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী নবনিযুক্ত শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি করা নিষিদ্ধ করার জন্য যে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করেছেন তা গণতান্ত্রিক অধিকারের ও মতপ্রকাশের অধিকারের পরিপন্থী। কোনও গণতান্ত্রিক সমাজ এই প্রস্তাবকে মেনে নিতে পারে না। আমরা এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছি।’’
এ দিনের মন্ত্রিসভার বৈঠকে কর্মসংস্থান নিয়েও একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। পুর ও নগরোন্নয়ন, স্বাস্থ্য, পঞ্চায়েত, দমকল এবং স্বরাষ্ট্র দফতর মিলিয়ে মোট ১,১৯৯টি নতুন শূন্যপদ তৈরির অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আগের বৈঠকে ৪৫ হাজার পদ তৈরি হয়েছিল। দ্রুত বিজ্ঞপ্তি জারি করে স্বচ্ছ পরীক্ষার মাধ্যমে এই নিয়োগ শুরু হবে। সরকারের দাবি, এখনও পর্যন্ত মেধার ভিত্তিতে পিএসসি ও পুলিশের রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে প্রায় ৬০ হাজার চাকরি দেওয়া হয়েছে।