পুজোর আগেই চা-শ্রমিকদের ২০ শতাংশ বোনাস দিতে হবে বাগানের মালিকদের। এ ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা চলছে। মঙ্গলবার উত্তরকন্যা থেকেই এমনটাই জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারের তরফে এই সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। শুধু তা-ই নয়, রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা চা-বাগানগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নে ৩২০ কোটি টাকার প্রকল্পের কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। সঙ্গে সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির সুবিধা থেকে পাহাড়ের মানুষ বঞ্চিত না-হন, তা গুরুত্বসহকারে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার কালিম্পঙে যাওয়ার কথা ছিল শুভেন্দুর। সেই মতো হেলিকপ্টারে রওনা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পাহাড়ে আবহাওয়া খারাপ থাকায় অবতরণে সমস্যা হয়। মাঝআকাশেই চক্কর কাটতে থাকে হেলিকপ্টারটি। বার দুয়েক অবতরণের চেষ্টা করেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে ব্যর্থ হয়। ফলে কালিম্পঙে না-নেমে শিলিগুড়ি ফিরে আসতে হয় শুভেন্দুকে। তার পরে উত্তরকন্যায় টানা চার ঘণ্টা বৈঠক করেন তিনি।
উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন, চা-বাগান, চা-শ্রমিক, বন্যা পরিস্থিতি ইত্যাদি নানা বিষয় উঠে আসে মঙ্গলবারের বৈঠকে। উত্তরকন্যায় মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক-সহ বিভিন্ন দফতরের আধিকারিক এবং উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্তারা। দুপুর ২টো থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে এই বৈঠক। সূত্রের খবর, পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আগের ঘোষণাগুলি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, তার হালহকিকত জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী।
আরও পড়ুন:
চা-বাগান এবং চা-শ্রমিকদের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শুভেন্দু। তিনি জানান, বন্ধ থাকা বা নানা সমস্যায় জর্জরিত চা-বাগানগুলির স্থায়ী সমাধান চায় বর্তমান সরকার। সেই কারণে অসমের আদলে পশ্চিমবঙ্গে সরকার ‘প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক যোজনা ২০২১’ চালু করতে চলেছে। অভিযোগ, এই প্রকল্প এ রাজ্যে কার্যকর করেনি বিগত তৃণমূল সরকার। তার পরেই মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পের অধীনে পাহাড় থেকে তরাই অঞ্চলের চা-বাগানগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নে ৩২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে কাজ চালানো হবে। তার পরেই চা-শ্রমিকদের জন্য খুশির বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, পুজোর আগে যাতে চা-শ্রমিকেরা ২০ শতাংশ বোনাস পান, তা নিশ্চিত করতে রাজ্যের শ্রম দফতরের তরফে নির্দেশিকা জারি করা হবে। ঘটনাচক্রে, সোমবারই শ্রম দফতরের তরফে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়। সেখানে ২০ শতাংশ বোনাসের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ-ও জানানো হয়েছে, এই নির্দেশিকা সঠিক ভাবে মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা দেখবে শ্রম দফতর।
চা-বাগানের সুবিধার পাশাপাশি কালিম্পং এবং সমগ্র পাহাড় এলাকার স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও আবাসন নিয়েও বেশ কিছু ঘোষণার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আয়ুষ্মান ভারত যোজনার আওতায় কালিম্পং জেলার ২ লাখ ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষকে ৫ লাখ টাকার নিখরচায় চিকিৎসার কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই এক লাখেরও বেশি মানুষ সেই কার্ড পেয়ে গিয়েছেন। যাঁরা আয়ুষ্মান ভারত যোজনার আওতায় আসবেন না, তাঁদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনার সুবিধা থাকবে। এ ছাড়াও মহিলাদের জন্য অন্নপূর্ণা যোজনার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দু আরও জানান, পাহাড়ে কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামো বাড়াতে পুলিশের বিশেষ বিভাগে অন্তত এক হাজার কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দ্রুত প্রকাশ করা হবে। তার মধ্যে ৩০০টি পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ১০০ দিনের কাজের পরিধি গ্রামীণ এলাকার পাশাপাশি শহরের বাসিন্দাদের জন্যও প্রসারিত করা হবে। দুর্গত এলাকাগুলির নিরাপত্তার স্বার্থে তিস্তার বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্জুন বাহিনী-সহ উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ-ও জানান, শুধুমাত্র কালিম্পং জেলার ভূমিহীন এবং ঘরহীন মানুষদের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’র অধীনে ৮,৩২৫টি নতুন বাড়ি তৈরির তালিকাও প্রস্তুত।
কালিম্পঙে পৌঁছোতে না-পেরে মুখ্যমন্ত্রীর কপ্টার চলে আসে শিলিগুড়ি। উত্তরকন্যার পাশের মাঠে অবতরণ করে মুখ্যমন্ত্রীর কপ্টার। সেখানে নেমে তিনি যান উত্তরকন্যায়। সেখানে প্রশাসনিক বৈঠক সারেন শুভেন্দু। কালিম্পঙে যেতে না-পারায় দুঃখপ্রকাশ করেন তিনি। অবিলম্বে আবার পাহাড়ে আসবেন, সেই প্রতিশ্রুতিও দেন মুখ্যমন্ত্রী। কী কী হয়েছে বৈঠকে, তার আভাস দেন পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর। তিনি জানান, বিপর্যয় মোকাবিলার আওতায় পাহাড়ে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার কাজের ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরকন্যা থেকেই যাতে উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু দফতরের কাজ পরিচালনা করা যায় এবং প্রতিটি বিষয়ে কলকাতায় ছুটতে না-হয়, সেই বিষয়েও বৈঠকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে।
জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়েছে মঙ্গলবারের বৈঠকে। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালকে ঢেলে সাজানোর কাজের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল, কোচবিহার, মালদহ-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং পরিষেবা নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানা গিয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হয়েছে।
বৈঠকে উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পায় বলে জানিয়েছেন শঙ্কর। উত্তরবঙ্গের যে কোনও প্রান্তে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত মোকাবিলার জন্য জাতীয় এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেল, বিমানবন্দর এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জমি এবং নির্মাণ সংক্রান্ত বাকি সমস্যাগুলি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সূত্রের খবর, উত্তরকন্যার বৈঠকেই এ ব্যাপারে কেন্দ্র এবং রাজ্যের আধিকারিকদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা করিয়ে সেগুলির সমাধানের পথও বার করা হয়েছে। বৈঠক শেষ করে হেলিকপ্টারে বাগডোগরা যাওয়ার কথা ছিল শুভেন্দুর। কিন্তু কিছু সমস্যার কারণে সড়কপথেই বাগডোগরা যান। সেখান থেকে বিমানে কলকাতায় ফেরেন মুখ্যমন্ত্রী।
অন্য দিকে, রাজ্যে পালাবদলের পরেই গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর (জিটিএ) চিফ এগ্জিকিউটিভের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন অনীত থাপা। তার পরেই পাহাড়ের এই স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন সংস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তৈরি হয়েছিল অচলাবস্থা। তা কাটাতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর উত্তরবঙ্গ সফরের মাঝেই প্রশাসক নিয়োগ করল রাজ্য সরকার৷ আইএএস স্মৃতিরঞ্জন মোহান্তিকে জিটিএ প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হল৷ নবান্ন থেকে সেই নিয়ে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার উত্তরকন্যা থেকে কালিম্পঙের প্রশাসনিক বৈঠকে জিটিএ-র আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকারি তহবিল ও জনগণের অর্থ যারা বেআইনি ভাবে আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং আত্মসাৎ করা অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হবে। তাঁর কথায়, ‘‘জিটিএ-তে যে সমস্ত দুর্নীতি হয়েছে, তার কোনওটাই আমরা ছাড়ব না।’’
তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে বলে জানান শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির তদন্তের জন্য কমিটি গঠিত হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর সভাপতিত্বে এবং আইপিএস আধিকারিক কালিয়াপ্পন জয়রমন তাঁর কার্যকরী সদস্য হিসেবে কাজ করছেন— তাঁরা দু’জনে ইতিমধ্যেই পাহাড় ও উত্তরবঙ্গের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে পরিদর্শনের কাজ শেষ করেছেন।’’ পাহাড়ের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে কালিম্পং অঞ্চলের বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘কালিম্পঙের জনগণকে আমি আশ্বস্ত করতে চাই, জিটিএ-তে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে আপনাদের পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার অমৃত প্রকল্প, যত দুর্নীতি এরা করেছে এবং আমাদের লেপচা বোর্ড ও তামাং বোর্ড-সহ যে ১১টি উন্নয়ন পর্ষদের টাকা এরা লুট করেছে, তার একজনকেও ছেড়ে দেওয়া হবে না। আপনারা দেখে নেবেন!’’
আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন, ‘‘তদন্তপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই এফআইআর দায়ের করা হবে, (দোষীদের) গ্রেফতার করা হবে এবং তাঁদের কাছ থেকে টাকা আদায়ও করা হবে।’’ তিনি এ-ও বলেন, ‘‘জনগণের যত টাকা এবং সরকারের তহবিলের যত সম্পদ এরা লুট করেছে, তা উসুল বা ফেরত নেওয়ার কাজ সরকার করবে— এই আশ্বাসও আমি দিচ্ছি।’’