বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে ভাঙন শুরু হয় তৃণমূলে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়— দুই শিবিরের আকচাআকচি দেখতে ‘অভ্যস্থ’ হয়ে উঠেছিল রাজ্যবাসী। তবে নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের উপনির্বাচন যেন আবার ‘মিলিয়ে’ দিল দুই পক্ষকে। ভোটলুটের অভিযোগে একযোগে সরব তারা। শুধু তৃণমূলের দুই শিবির নয়, কংগ্রেস, হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টিও (এজেইউপি) একই অভিযোগে সরব। যদিও সেই অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়েছে শাসকদল বিজেপি। তাদের দাবি, ভোটদান পর্ব মিটেছে শান্তিপূর্ণ ভাবেই।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচন পর্ব শুরু থেকেই ঘটনাবহুল ছিল। নাম, প্রতীক নিয়ে তৃণমূলের দুই শিবিরের টানাটানি, নন্দীগ্রামে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার, কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা মমতার, পর পরই গ্রেফতার মিলন, পরে হাই কোর্টে জামিন, রেজিনগরের মমতাপন্থী তৃণমূল প্রার্থী রবিউল আলমের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত, ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে ‘ইউটার্ন’, নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের মনোনয়ন নিয়ে কংগ্রেসের আপত্তি, প্রতীক নিয়ে কমিশনের বিরুদ্ধে আদালতে আইএসএফ— এ ধরনের নানা টুকরো টুকরো ছবি নিয়ে তৈরি হয়েছিল উপনির্বাচনের পটভূমি। সেই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে মঙ্গলবার ভোটদান হল দুই কেন্দ্রে।
সকালে ভোট দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, নন্দীগ্রামে এ বার ‘রেকর্ড’ হতে পারে। তিনি আত্মবিশ্বাসী, ২০১৬ সালে তাঁর প্রায় ৮২ হাজার ভোটে জেতার ব্যবধান ছাপিয়ে যাবেন উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি। সেই ‘রেকর্ড’ হবে কি না, তা জানা যাবে আগামী শুক্রবার, ভোটগণনার পরেই। তবে উপনির্বাচনে ভোটদানে ‘রেকর্ড’ হয়েছে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ভোট পড়েছে ৭৯.৩৯ শতাংশ। খুব একটা পিছিয়ে নেই রেজিনগর। সেই কেন্দ্রে ভোটদানের হার ৭৮.৪২। এই ভোট কার ঝুলিতে কত যায়, সেটা বোঝা যাবে ফলপ্রকাশের পর। যদিও বিরোধীদের কথাবার্তা বা শরীরী ভাষা দেখে অনেকেই বলছেন, হাল ছেড়ে দিয়েছে তারা।
হুমায়ুনের গ্রেফতারি, পুত্র-প্রার্থীর বার্তা
মঙ্গলবার ভোট দিয়ে বার হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে রাজ্য পুলিশ-প্রশাসন এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে নিশানা করেন এজেইউপি প্রধান তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন। তাঁর ছেড়ে দেওয়া রেজিনগর বিধানসভা গায়ের জোরে বিজেপি দখল করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘উপনির্বাচন ঘিরে যে পরিস্থিতি, তাতে দেশের ইমার্জেন্সির কথা মনে পড়ে গেল। ভোট করাবার দরকার কী ছিল!’’ শেষমেশ নির্বাচনী বিধিভঙ্গ, পুলিশকে হুমকি এবং সমর্থকদের প্ররোচিত করার অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন হুমায়ুন। যদিও সন্ধ্যার আগেই তাঁকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
ভোটদান পর্ব শেষ হওয়ার আগেই রেজিনগরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী, হুমায়ুন-পুত্র গোলাম নবি আজ়াদ জানিয়েই দেন, ভোটের ফল নিয়ে তাঁর আর কোনও উৎকণ্ঠা নেই। তাঁর কথায়, ‘‘আমার সমস্ত উৎকণ্ঠা কেটে গিয়েছে। রেজিনগরের সকলের মতো আমিও জেনে গিয়েছি এই নির্বাচনের ফলাফল কী হতে চলেছে।’’ তাই ৯ অক্টোবর ফলঘোষণার দিন আর গণনাকেন্দ্রে যাবেন না বলে ঘোষণাও করেন গোলাম।
রেজিনগরে রিগিং!
ভোটদান পর্ব শুরু হয় নির্ঝঞ্ঝাট ভাবেই। তবে বেলা গড়াতেই একে একে ভোটলুটের অভিযোগ করতে থাকে বিরোধী দলগুলি। গ্রেফতারির আগে যে অভিযোগ হুমায়ুন করেছিলেন, বেলা গড়াতে সেই অভিযোগে একসঙ্গে সরব মমতা তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং সিপিএম। একত্রে পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছে মমতা তৃণমূল এবং কংগ্রেস। বিজেপির বিরুদ্ধে বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট দেওয়ার অভিযোগে শোরগোল রেজিনগরে। দুপুরে মমতা তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল আলম এবং ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল প্রার্থী শফিউজ্জামান শেখ পৃথক ভাবে অভিযোগ করেন, বেশির ভাগ বুথ থেকে তাঁদের এজেন্টদের জোর করে বার করে দেওয়া হয়েছে। যদিও শফিউজ্জামানের নিশানায় আম জনতা উন্নয়ন পার্টি। একই সঙ্গে এ-ও অভিযোগ করেন, ‘‘অনেক বুথে গিয়ে দেখেছি, আমাদের এজেন্টকে বার করে দিয়ে কেবল বিজেপির এজেন্টকে বসিয়ে রাখা হয়েছে।’’ মমতা তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল রেজিনগরে অবিলম্বে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। ভোট অবাধ হচ্ছে না, এই অভিযোগ করে এবং নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়ে দুপুরে রেজিনগর থানার সামনে ধর্নায় বসেন কংগ্রেস প্রার্থী। বিকেলের দিকে জেলাশাসকের দফতরের সামনে বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন অধীর চৌধুরী। তাঁর দাবি, ‘‘হুমায়ুনকে মিথ্যে বিরোধী সাজিয়ে ২০২৯ পর্যন্ত একটা বাইনারি তৈরির চেষ্টা করছে বিজেপি। নজিরবিহীন সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করে ভোট হয়েছে, এই ফলের অপেক্ষা করে থাকা অমূলক।’’ যদিও বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে বিজেপি। তাদের দাবি, ভোট হয়েছে অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভাবেই। বিরোধীদের ভোটলুটের অভিযোগ থাকলেও শাসক-বিরোধী হাতাহাতি কিংবা গন্ডগোলের খবর মেলেনি। বিজেপি প্রার্থী শাখারব সরকার বলেন, ‘‘উৎসবের মেজাজে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। দুর্গাপুজোর আগেই উৎসব শুরু হয়ে গেল এই ভোটের মধ্যে দিয়ে। মানুষের আশীর্বাদে বিজেপির জয় নিশ্চিত। গণনা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।’’
নন্দীগ্রামেও ভোটলুটের অভিযোগ
রেজিনগরের মতো নন্দীগ্রামেও ভোটলুটের অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। তাদের অভিযোগ, মাঠ ফাঁকা করে গোল দিচ্ছে শাসকদল। সকালেই আশরাফুল তুল্লা নামে কংগ্রেসের এক ব্লক সভাপতিকে অনৈতিক ভাবে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করে কংগ্রেস। অন্য দিকে, সোনাচূড়ার ভাঙাবেড়া ২৮৫, ২৮৬ নম্বর বুথে কংগ্রেসের পোলিং এজেন্ট বসানো নিয়ে অশান্তি হয় বলে অভিযোগ।
আরও পড়ুন:
নন্দীগ্রামের কালীচরণপুর ২৪১ এবং ২৪২ নম্বর বুথে অবৈধ জমায়েত সরাতে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। স্থানীয় মহিলারা অভিযোগ করেন তাঁদের ভোটার স্লিপ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ভোট দিতেই দেওয়া হয়নি! একই অভিযোগ ২৩৪ নম্বর বুথ কেন্দামারি গ্রাম পঞ্চায়েতে। বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় কংগ্রেস প্রার্থী মিলনকে। তাঁর অভিযোগ, তাঁদের এজেন্টদের উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভোটলুটের অভিযোগ করেন মিলন। একটা সময় দেখা যায় ময়দানে একাই লড়ে যাচ্ছেন তিনি। দুপুর থেকে প্রায় একাই এলাকায় হাঁটতে দেখা যায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলনকে। তা নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিজেপি। বলে, তাঁদের পোলিং এজেন্ট ছিলেনই না। মিলনকে কটাক্ষ করে বলা হয়, ‘‘প্লেয়ারই নেই, খেলবেন কী?’’
দুই কেন্দ্রের উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিএম। ভোটদান পর্ব মেটার পর সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম লেখেন, ‘‘গোটা দেশ যখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে, তখন এ রাজ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের কর্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে উপনির্বাচনে কারচুপির এক নতুন অধ্যায় তৈরি করছে কমিশন।’’ তাঁর অভিযোগ, রেজিনগরের সিপিএম প্রার্থীর এজেন্টকে ভোট দিতেও দেওয়া হয়নি।
বিজেপির বক্তব্য
দুই কেন্দ্রেই জয় আসবে, আশাবাদী বিজেপি। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট বলেন, ‘‘রেজিনগরে বিজেপি যে জিতবে, তা অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিন্তু সেখানকার সংখ্যালঘুরাও এ বার বাবরি মসজিদ চান না। উন্নয়ন আর কারখানা চান।’’ নন্দীগ্রাম নিয়েও ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছেন শমীক। তাঁর মতে, এ বার পাঁচ গুণ বেশি মার্জিনে ওই আসনে জিতবেন বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি।