কোনও বিদেশি সংবাদমাধ্যম নয়, চিনের কমিউনিস্ট পার্টির সদ্যসমাপ্ত পঞ্চম প্লেনামে (পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন) সারি সারি খালি চেয়ারের ছবি আর ভিডিয়ো প্রকাশ করেছে সে দেশেরই সরকারি সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া। আর সেই সঙ্গেই নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে দল তথা সরকারের প্রধান শি জিনপিঙের শুদ্ধকরণ কর্মসূচির ‘নেপথ্য কৌশল’ নিয়ে।
সোমবার বেজিংয়ে শুরু হয়েছিল পঞ্চম প্লেনাম। শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার, দলের অভ্যন্তরে ‘স্বশাসনের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গতা ও কঠোরতার ধারাবাহিক অগ্রগতি’ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনাই অধিবেশনের মূল কর্মসূচি ছিল বলে জানিয়েছে একদলীয় চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম। কিন্তু সিনহুয়ার ছবির ‘সৌজন্যে’ কমিউনিস্ট নেতৃত্বের আলোচনা ও পদক্ষেপের বিষয়টি চলে গিয়েছে আলোচনার পিছনের সারিতে। পঞ্চম প্লেনামে ২৭৯ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমান ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটিতে মোট ২০৫ জন পূর্ণ সদস্য এবং ১৭১ জন বিকল্প (আমন্ত্রিত) সদস্য মিলে মোট ৩৭৬ জন রয়েছেন। অর্থাৎ কমিটির প্রায় ২৫ শতাংশ সদস্যের চেয়ার খালি পড়ে ছিল পঞ্চম প্লেনামে! যা মাও জে দঙের জমানার পরে কমিউনিস্ট পার্টির প্লেনামের ইতিহাসে সর্বনিম্ন উপস্থিতির রেকর্ড বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত খবরে দাবি।
প্লেনামের শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দলীয় শৃঙ্খলভঙ্গের কারণে রেকর্ড ৩৩ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। ঘটনাচক্রে, এঁদের মধ্যে ১৬ জনই চিনা সেনার (পিপল্স রিপাবলিকান আর্মি বা পিএলএ) ন’জন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা। এই তালিকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম হল সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) ভাইস চেয়ারম্যান ঝাং ইউশিয়া এবং জয়েন্ট স্টাফ ডিপার্টমেন্টের প্রধান লিউ জ়েনলি, সিএমসি-র রাজনৈতিক শাখার ডিরেক্টর মিয়াও হুয়া, নৌবাহিনীর ‘চিফ অফ স্টাফ’ ভাইস অ্যাডমিরাল লি হানজ়ুন এবং এবং পিএলএর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার শীর্ষকর্তা লিউ শিপং। চিনের সামরিক কাঠামোর শীর্ষ পদে থাকা এই আধিকারিকদের অপসারণ তাৎপর্যপূর্ণ। এই পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনে কেবল প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং জেনারেল ঝাং শেংমিন অবশিষ্ট রইলেন। এ ছাড়া দুর্নীতি এবং অন্যান্য কারণে বেশ কয়েক জন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যের (যাঁদের মধ্যে সেনাকর্তারাও রয়েছেন) বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক প্রতিক্রিয়া চলছে বলেও প্রকাশিত খবরে দাবি।
আরও পড়ুন:
সরকারি বিবৃতিতে শৃঙ্খলাভঙ্গ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি-সহ নানা অভিযোগ তোলা হলেও কয়েকটি বিদেশি পর্যবেক্ষক সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যম অভিযোগ তোলে, সংবিধান সংশোধন করে জিনপিঙের আজীবন শীর্ষপদে থাকার সিদ্ধান্তে আপত্তি তুলেছিলেন ওই আধিকারিকেরা। চেয়ারম্যান মাওয়ের জমানা থেকেই কমিউনিস্ট জমানার চিনে দু’মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট পদে থাকার উপর সাংবিধানিক বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে জাতীয় পার্লামেন্ট (ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস) সংবিধান সংশোধন করে সেই সময়সীমা তুলে দেয়। ফলে জিনপিং কার্যত আজীবন দল ও সরকারের শীর্ষে থাকার বৈধতা অর্জন করেছেন। ২০১২ সালে ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে অবশ্য একের পর এক সেনাকর্তাকে দুর্নীতির অভিযোগে সরিয়েছেন জিনপিং। লালফৌজে বিদ্রোহের শঙ্কাতেই বার বার তাঁর এমন পদক্ষেপ বলে মনে করেন অনেকে। যদিও আগামী বছরের শেষপর্বে ২১তম পার্টি কংগ্রেসে ‘শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তন’ হতে পারে বলে ইতিমধ্যেই জল্পনা তৈরি হয়েছে। সে কারণে জিনপিং আগেভাগে ‘কাঁটা উৎপাটনে’ সক্রিয় হয়েছেন বলেই কি ইঙ্গিত দিল পঞ্চম প্লেনাম?