চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ। বাব অল-মান্দেব প্রণালীসংলগ্ন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ইরান-সমর্থিত শিয়া হুথি বিদ্রোহীদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে সৌদি আরব জোট-সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সরকারি বাহিনী। অন্য দিকে, এই সামরিক অভিযানের মোকাবিলা করতে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধের বিমানবন্দর, লাল সাগরের তীরের তেল শোধনাগার ও একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে হুথি গোষ্ঠী।
ইয়েমেনি প্রশাসনিক সূত্র ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সোমবার ভোরে সৌদি সামরিক জোটের জোরালো বিমান হামলার সাহায্যে অভিযান শুরু করে ইয়েমেনি সেনা। অভিযানে বাব অল-মান্দেব প্রণালীর (লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ) ঠিক উত্তরের ধুবাব শহরটি হুথিদের কবল থেকে মুক্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাব এবং হাদেইদ শহরও পুনর্দখল করেছে সেনাবাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সরকারি সেনার গাড়ি ও ট্যাঙ্ক শহরগুলিতে প্রবেশ করতে দেখা গিয়েছে।
ইয়েমেনে ক্ষমতাসীন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল’-এর প্রধান রাশাদ অল-অলিমী এক টেলিভিশনবার্তা এবং সমাজমাধ্যম ‘এক্স’-এ জানান, হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ‘ইয়েমেন ডন’ নামের এই সামরিক অভিযান শুরু করা হয়েছে। অল-অলিমী বলেন,‘‘এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হল বিদ্রোহীদের দখল করা রাজধানী সানা-সহ দেশের সমস্ত এলাকা মুক্ত করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা এবং হুথি জঙ্গি গোষ্ঠীর অভ্যুত্থানের সমাপ্তি ঘটানো।’’ তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও ইয়েমেন সরকারকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি অল-মলকি জানান, ইয়েমেন সেনাকে আকাশপথে সহায়তা দিতে ১০০টি যুদ্ধবিমান অভিযানে যোগ দিয়েছে। বাব অল-মান্দেব প্রণালীর আকাশে সুরক্ষা (এয়ার প্রোটেকশন) সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি ধ্বংস করা হয়েছে হুথিদের শত শত আস্তানা। হুথিদের পুরোপুরি নির্মূল না-করা পর্যন্ত ইয়েমেনি সেনাকে সম্পূর্ণ সহায়তা দিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সৌদি সামরিক জোট।
সৌদি জোটের এই জোরদার আঘাতের পর হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি এক ভিডিয়োবার্তায় জানান, তাঁরা সৌদি ভূখণ্ডে বড় মাপের পাল্টা আঘাত হেনেছেন। তাঁদের দাবি, রিয়াধের কিং খলিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং লোহিত সাগরের তীরবর্তী রাবিঘ শহরের একটি তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া আবহা বিমানবন্দর, খামিস মুশাইতের সামরিক পরিকাঠামো এবং নাজরান ও জিজান শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
এই পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘ইয়েমেনের বৈধ সরকার হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধারে পাল্টা আঘাত হানবে, এটাই স্বাভাবিক।’’ ইয়েমেন সরকারের এলাকা হাতছাড়া হওয়া এবং সৌদি আরব বারবার আক্রান্ত হওয়ার প্রসঙ্গে রুবিয়োর বক্তব্য, সৌদি আরবের আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
রুবিয়ো প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকার করলেও এক আঞ্চলিক সামরিক আধিকারিক ও মার্কিন সূত্রের খবর, এই সেনা অভিযানে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ, আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং অভিযানের পরিকল্পনা তৈরিতে প্রত্যক্ষ সহায়তা করছে আমেরিকা।
সোমবার রিয়াধে এক জরুরি বৈঠকে বসেন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা। বৈঠকের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে সৌদি আরবে সেনা পাঠাতে সম্মত হয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক। তবে এই চুক্তির অধীনে কত সেনা মোতায়েন করা হবে, কোন দেশ কত সেনা পাঠাবে বা কখন পাঠাবে— সে ব্যাপারে কিছু বিস্তারিত জানানো হয়নি। যৌথ বিবৃতিতে মক্কা ও মদিনায় হামলার চেষ্টার পাশাপাশি সৌদি শহর ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলিতে হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই অন্তত ৯৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪,২০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গৃহযুদ্ধের জেরে ইয়েমেনের ভেতরেই গৃহহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ১,৭৪,০৯৭ জন নাগরিক। এ ছাড়া জলপথ পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ জিবৌতিতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আরও ৩,০০০ মানুষ। গত শুক্রবার ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রক সতর্ক করে জানিয়েছিল, সংঘাতের ফলে তাইজ প্রদেশের উপকূলীয়, পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সমস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গিয়েছে অথবা আংশিক ভাবে চালু রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঘোর বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।