এতদিন তাঁর পরিচিতি ছিল ‘চিনপন্থী’ হিসেবে। মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জু এ বার পাকিস্তান সফরে গিয়ে এক সঙ্গে ২০টি চুক্তি সই করলেন! সেই তালিকায় অন্যতম দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সমুদ্র-নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তি। শুধু তাই নয়, পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জ়ারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের পাশাপাশি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সে দেশের সেনা সর্বাধিনায়ক ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গেও পৃথক ভাবে বৈঠক করেছেন মুইজ্জু।
প্রতিরক্ষা ও সমুদ্র-নিরাপত্তার পাশাপাশি বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কৃষি, মৎস্য চাষ, স্বাস্থ্য, পর্যটন, শিক্ষা, মাদক, মানব পাচার রোধ এবং বিমান পরিষেবা উন্নত করার বিষয়েও চুক্তিবদ্ধ হয়েছে ইসলামাবাদ-মালে। পড়শি দ্বীপরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় নয়াদিল্লিকে কিছুটা চাপে ফেলতে পারে বলে কূটনীতি বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা।
প্রসঙ্গত, প্রায় ১১ বছর পরে মলদ্বীপের কোনও রাষ্ট্রনেতা পাকিস্তান সফরে গিয়েছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সুরে সুর মিলিয়েই ‘সার্ক’ (দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির সংগঠন)-কে পুনরুজ্জীবিত করার ডাকও দিয়েছেন তিনি। ঘটনাচক্রে, মূলত নয়াদিল্লির অনাগ্রহের কারণেই গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্ক কার্যত নিষ্ক্রিয়। ২০১৪ সালে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে শেষ বার, ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে বছরের সেপ্টেম্বরে জম্মু ও কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনার ঘাঁটিতে সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়। ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং ইসলামাবাদ সম্মেলন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভুটান এবং আফগানিস্তানও সেই সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকার কথা ঘোষণা করে। ফলে ইসলামাবাদ শীর্ষ সম্মেলনটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। তার পর থেকে আর কোনও শীর্ষ সম্মেলন হয়নি।
২০২৩ সালে মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে মহম্মদ মুইজ্জু তাঁর দেশের উপর ‘ভারতের সামরিক প্রভাব’ খর্ব করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ‘ইন্ডিয়া আউট’ স্লোগান দিয়ে ভোটে জেতার পরে মলদ্বীপ ফৌজকে প্রশিক্ষণে সহযোগিতার জন্য মোতায়েন ভারতীয় সেনাকে ফিরে যাওয়ার ‘নির্দেশ’ দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে চিনের সঙ্গে একাধিক চুক্তি সই করেছিলেন। এর পরে ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লক্ষদ্বীপের ছবি পোস্ট করা নিয়ে মুইজ্জুর তিন মন্ত্রী কুমন্তব্য করায় ভারত ও মলদ্বীপের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েন প্রকাশ্যে চলে এসেছিল। মলদ্বীপে পর্যটন বয়কটের ঢেউ উঠেছিল ভারতে। মাঝে দু’বছর সংঘাতের আবহ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছিল। গত বছরের জুলাই মাসে মলদ্বীপের ৬০তম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে যোগ দিতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। কিন্তু পাক সফরে গিয়ে মুইজ্জুর প্রতিরক্ষা চুক্তি সই এবং সার্ক পুনরুজ্জীবনের আহ্বান নতুন করে অবিশ্বাসের আবহ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।