রাজ্য সরকার স্কুল শিক্ষা দফতরের অধীন সব সরকারি অফিসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর একটি নির্দিষ্ট ছবি টাঙানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ৩ নভেম্বর জারি করা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, অফিসের বিশিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যথাযথ মর্যাদায় ওই ছবি প্রদর্শন করতে হবে।
গত কয়েক মাসে নেতাজির মর্যাদা রক্ষা প্রসঙ্গে বার বার উঠেছে প্রশ্ন। নতুন শাসকদলের বিধায়ক-সাংসদদের একাংশের মন্তব্যে সুভাষচন্দ্র বসুর সম্মানহানির অভিযোগ উঠেছে একাধিকবার। এ বার তাঁর ছবি প্রদর্শনের নির্দেশিকা জারির পরও উঠেছে প্রশ্ন। নির্দেশিকায় একটি নির্দিষ্ট ‘অনুমোদিত ছবি’ টাঙানোর কথা বলা হয়েছে। এই ‘অনুমোদিত ছবি’ বলতে ঠিক কোন ছবিকে বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকদের একাংশ। প্রশ্ন উঠছে, নেতাজিকে নিয়ে বিতর্ক, রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং তাঁর মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর এই নির্দেশ কি নিছক সরকারি সিদ্ধান্ত? না কি এর মধ্যে রয়েছে কোনও বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা? শিক্ষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, নেতাজির ছবি টাঙাতে অনুমোদন কেন প্রয়োজন? কেন তাঁর যে কোনও ছবি টাঙানো যাবে না?
সম্প্রতি বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে মন্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি হয়। নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে উল্লেখ করা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা ও আজ়াদ হিন্দ বাহিনীর অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগ ওঠে অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে। এই বিতর্কের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নেতাজিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে পুলিশকে পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাজ্য সরকার অনন্ত মহারাজের কাছ থেকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান প্রত্যাহার করে নেয়। তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআরও দায়ের হয়।
আরও পড়ুন:
এই পরিস্থিতিতে স্কুল শিক্ষা দফতরের নতুন নির্দেশিকাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, স্কুল শিক্ষা দফতরের অধীন সরকারি অফিসগুলিতে নেতাজির নির্দিষ্ট একটি অনুমোদিত ছবি টাঙাতে হবে। ছবিটি কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে, সে বিষয়েও নির্দেশিকায় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন বলেন, “এই নির্দেশিকার অর্থ এই নয় যে কোনও ডিআই অফিসে নেতাজির ছবি নেই। যদি কোথাও ছবি না থাকে, সেখানে তা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকায় ‘যথাযথ’ বা ‘অনুমোদিত’ ছবি বলতে নেতাজির একটি নির্দিষ্ট ছবির কথা বোঝানো হয়েছে। যতদূর জানি, বিধানসভার অধ্যক্ষ নেতাজির পরিবারের কাছে একটি ছবি চেয়েছিলেন, যা প্রত্যেক বিধায়কের অফিসে রাখার কথা। তাঁর পরিবার থেকে একটি ছবি বেছে দেওয়া হয়েছিল। সম্ভবত সেই ছবিটিকেই ‘অনুমোদিত’ ছবি বলা হয়েছে। তবে বিষয়টি আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।”
শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিংকর অধিকারী এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘শুধু ছবি টাঙানোই যথেষ্ট নয়। সরকারি অফিসগুলিতে কাজের প্রতি নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর কথায়, মহান ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান জানানো উচিত তাঁদের আদর্শ মেনে কাজের মধ্য দিয়েও। সরকারি দফতরে অনিয়ম ও অসৎ কাজের যে অভিযোগ ওঠে, সেগুলির পরিবর্তন ঘটানোও জরুরি।’’
অন্য দিকে, বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল নির্দেশিকায় ‘অনুমোদিত ছবি’ কথাটির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘‘নেতাজি বাঙালি তথা ভারতবাসীর হৃদয়ে রয়েছেন। তাঁর কোনও ছবি সরকারি ভাবে অনুমোদিত কি না, তা জানা নেই। কোন ছবিকে অনুমোদিত বলা হচ্ছে, সেই বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।’’ তাঁর আরও প্রশ্ন, নেতাজি সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এবং তাঁর কাছ থেকে বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের পরেই কেন এই ধরনের নির্দেশ দেওয়া হল?