ভাত-ডাল-মাছেই বাঙালি। রোজের খাওয়া মানে ভাত বা রুটি, ডাল, তরকারি, মাছ, মাংস বা ডিমই বোঝায়। খেতে যাঁরা ভালবাসেন, ডায়েটের নাম শুনলেই তাঁদের বুকে শেল বেঁধে। এই বুঝি এক বেলা উপোস করে থাকতে হয়, না হলে কষা মাংস বা পছন্দের মিষ্টিটা বাদ দিতে হয়। তবে ডায়েট করা মানেই কিন্তু পছন্দের খাবারগুলিকে বাদ দেওয়া নয়। বরং কোন খাবার কতটা পরিমাণে খাবেন অর্থাৎ খাবারের গুণগত ও পরিমাণগত দিকটি হবে বিবেচনার প্রাথমিক বিষয়। রোজ কী খাওয়া হচ্ছে, কতটা খাচ্ছেন, সেই খাবার থেকে শরীরে কতটা পুষ্টিকর উপাদান যাচ্ছে, আর কতটা খারাপ জিনিস ঢুকছে, তার সঠিক পরিমাণ বার করে সুষম খাবারের তালিকা তৈরি করার নামই ‘ব্যালান্সড ডায়েট’। তাতে উপোস করার প্রয়োজন পড়ে না, পছন্দের খাবারও বাদ দিতে হয় না। কেবল কী খাবেন, কখন খাবেন ও কতটা পরিমাণে— সেটি বুঝে নিতে হয়।
প্রথমে ভাতের সঙ্গে শুক্তো বা শাকভাজা, তার পরে ডাল, তরকারি, মাছ বা মাংস হয়ে চাটনি— বাঙালি এ ভাবেই বরাবর খেয়ে এসেছে। রুটি খেলেও তার সঙ্গে ডাল, তরকারি, আর মাছ অথবা মাংসের কোনও একটি আমিষ পদ পাতে থাকে। আর তা থেকেই ভরপুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট ও ফাইবার শরীরে ঢোকে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক অবস্থা বিচার করে যে খাদ্যতালিকা বা ‘ফুড পিরামিড’ তৈরি করেছে তারও বৈশিষ্ট্য অনেকটা এ রকমই।
ফুড পিরামিড
প্রথমে ধাপে কার্বোহাইড্রেট— ভাত, রুটি, নানা রকম দানাশস্য যেমন, ওট্স, ডালিয়া, কিনোয়া, সাবু, বার্লি ইত্যাদি।
দ্বিতীয় ধাপে ফাইবার— নানা রকম সব্জি, মরসুমি ফল।
তৃতীয় ধাপে প্রোটিন— প্রাণিজ প্রোটিন: মাছ, মাংস, ডিম, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন: ডাল, সয়াবিন, মাশরুম, তা ছাড়া দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার।
চতুর্থ ধাপে ফ্যাট- তেল, ঘি, মাখন, নুন, চিনি।
সব ক’টি ধাপ মেনে খাওয়া মানে তা সুষম আহার। পুষ্টিবিদ শম্পা চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘সুষম ডায়েট কেবল রোগা হওয়ার জন্য নয়, সুস্থ থাকার জন্যও জরুরি। রোজের ভাত-ডাল-তরকারি অথবা মাছ-মাংস-ডিম, দানাশস্য, দুধ বা দুগ্ধজাত দ্রব্য সঠিক পরিমাণে খাওয়াই হল সুষম ডায়েট। এই ডায়েট মেনে চললে ওজন তো বাড়বেই না, পাশাপাশি কোলেস্টেরল, হাইপারটেনশন, এমনকি টাইপ-২ ডায়াবিটিস থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। অপুষ্টি বা স্থূলত্বের মতো সমস্যা ৮০ শতাংশ কমে যাবে।’’
আরও পড়ুন:
রোগা হওয়ার সুষম ডায়েট
সুষম আহারেরও প্রকারভেদ আছে। ওজন কমানোর খাদ্যতালিকা এক রকম হবে, আবার ওজন বৃদ্ধি করতে হলে তার তালিকা আলাদা। সাধারণত ব্যালান্সড ডায়েটে খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট থাকা উচিত ৬০ শতাংশ। প্রোটিন ২০ শতাংশ। ফ্যাট ২০ শতাংশ। শম্পা বলছেন, রোগা হওয়ার সুষম ডায়টে এই পরিমাণগুলি বদলে যাবে।কার্বোহাইড্রেট ৪৫-৫০ শতাংশ
সুষম আহার পরিমিত পরিমাণে করলেই ওজন কমবে।
কী কী খাবেন: সাদা ভাত খেলে এক কাপ, না হলে ব্রাউন রাইস, লাল আটার রুটি, ওট্স, ডালিয়া, কিনোয়া।
বাদ দেবেন: ময়দা, বেকারির খাবার, সাবুদানা।
প্রোটিন ২৫ শতাংশ
কী কী খাবেন: লিন মিট (চিকেন), ডিম, নান রকম মাছ, সয়াবিন, নানা রকম ডাল, লো-ফ্যাট দুধ। হজমের সমস্যা থাকলে কাঁচা মুগডাল খেতে পারেন। ডাল পাতলা করে খেতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, ভাত ও ডালের ক্যালোরির পরিমাণ যেন প্রতি ১০০ গ্রামে ৩৫০-৩৬০ ক্যালোরি থাকে। তাই ওজন কমানোর ডায়েটে ৩০-৪০ গ্রাম ডাল খেলেই যথেষ্ট।
বাদ দেবেন: প্রক্রিয়াজাত মাংস, বাইরে থেকে কেনা বার্গার-সসেজ-সালামি, নাগেট, ফ্লেভার দেওয়া দই, ডিপ ফ্রায়েড বা প্যান ফ্রায়েড মাছ বা মাংসের কোনও পদ।
ফ্যাট, ভিটামিন, ফাইবার, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ২৫ শতাংশ
কী কী খাবেন: দিনে ৩-৪ চামচ স্বাস্থ্যকর ফ্যাট জরুরি। শরীরে ভিটামিন এ, ডি, ই, কে শোষণের জন্য ফ্যাট অত্যন্ত জরুরি। রান্নায় সাদা তেলের তুলনায় সর্ষের তেল ব্যবহার করুন, খেতে পারেন অলিভ অয়েলও। ঘি খেলে তা দিনে ১ থেকে ২ চামচের বেশি নয়। নানা রকম বাদাম ও বীজ খেতে হবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে।
বাদ দেবেন: ট্রান্স ফ্যাট, যেমন ডুবো তেলে ভাজা খাবার, প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাক্স, নানা রকম জাঙ্ক ফুড ও বেকারির তৈরি ক্রিম দেওয়া খাবার। কাজুবাদাম বাদ দিয়ে পিনাট, আমন্ড, আখরোট খাওয়া যেতে পারে। গরু বা মোষের দুধ সরাসরি না খাওয়াই ভাল। ডবল টোন্ড দুধ খাওয়া যেতে পারে।
সুষম ডায়েটে কী কী খেতে হবে?
ফল ছাড়া সুষম ডায়েট অসম্পূর্ণ। তবে ড্রাই ফ্রুটস নয়, খেতে হবে মরসুমি ফল। শসা, পেয়ারা, নাশপাতি, আনারস খেতে পারেন। লেবু জাতীয় ফল খেতে পারলে ভাল। রোজ একটা করে আমলকি বা পাতিলেবু খেলে ভিটামিন-সি পাওয়া যাবে, যা ত্বক ও চুল ভাল রাখবে। অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টের মধ্যে রঙিন শাকসব্জি প্রচুর পরিমাণে খেতে হবে। তা থেকে ফাইবারও পাওয়া যাবে।
রোগা হওয়ার ‘প্লেট থেরাপি’
রোগা হওয়ার সুষম ডায়েটে কী কী খাবেন তা যেমন জরুরি, তেমন কতটা খাবেন ও কোন সময়ে খাবেন, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে পুষ্টিবিদ বৃতী লাহিড়ীর মত, ‘‘অনেক সময়েই দেখা যায়, ওজন কমাতে গিয়ে অস্বাভাবিক ভাবে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়িয়ে ফ্যাট কমিয়ে অসম ডায়েট অনুসরণ করা হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। প্রয়োজনমতো ফ্যাট কমাতে হবে। কার্বোহাইড্রেট একেবারে বন্ধ করা চলবে না। এতে সামগ্রিক ভাবে ওজন কমলেও তার খারাপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে। তা ছাড়া কিছু দিন পর সেই ওজন আবার ফিরে আসে। তাই খাওয়া বাদ দেওয়া নয়, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং সময় ধরে খেতে হবে।’’
পেট ভরা জলখাবার
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে জলখাবার খেতে পারেন। তাতে থাকবে প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট। ডিম, দই, ছানা, সব্জি সেদ্ধ, রুটি-তরকারি বা ওট্স মেপে খেতে পারেন। রঙিন ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল না খাওয়াই ভাল।
ব্যালান্সড ডায়েট মানেই পরিমাণ বুঝে ও সময় ধরে করা উচিত।
দুপুরের খাওয়ার আগে স্যালাড
১২টা থেকে ১টার মধ্যে দুপুরের খাওয়া সেরে ফেলুন। ভারী খাবার খাওয়ার আগে জল পানের অভ্যাস করা ভাল। বৃতীর পরামর্শ, খাওয়ার শুরুতে শসা, টম্যাটো, গাজর বা পছন্দের সব্জি দিয়ে স্যালাড বানিয়ে খান। এর থেকে ফাইবার ঢুকবে শরীরে ও পেটও কিছুটা ভর্তি হবে। ওজন অনেকটা কমাতে চাইলে ভাতের পরিমাণ এক কাপে নিয়ে আসুন। রোজ ভাত না খেয়ে রুটি, এক কাপ ডাল, এক বাটি সব্জি, এক পিস মাছ বা ২ পিস মাংস মিলিয়ে মিশিয়ে খেতে পারেন।
স্মার্ট স্ন্যাকিং
দুধ দেওয়া চা-কফির বদলে এক কাপ গ্রিন টি বা লেবু চা, সঙ্গে একমুঠো স্যাঁকা চিনেবাদাম বা সেদ্ধ ছোলা খেতে পারেন। মুড়িমাখাও ভাল। তবে বাইরে থেকে কেনা চপ-শিঙাড়া আপাতত বাদ দিন। বদলে ঘরে কম তেলে চপ ভেজে খেতে পারেন এক-আধ দিন।
রাতের খাওয়া তাড়াতাড়ি
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে রাতের খাওয়া সেরে নেওয়া ভাল। সম্ভব হলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাতের খাওয়া সেরে ফেলুন। দুপুরে যদি ভাত খান, তা হলে রাতে রুটি-তরকারি, মাছ, মাংস বা ডিমের কোনও একটি রাখতে পারেন। রাতে খিদে পেলে বিস্কুট, চিপ্স বা ভাজা খাবার না খেয়ে স্যুপ, স্যালাড খেলে ভাল।
মিষ্টি বাদ দেওয়ার দরকার নেই
পুজোয় মিষ্টি খাওয়া হবেই। তা ছাড়া মিষ্টি খেতে যাঁরা ভালবাসেন, তাঁরা পছন্দের মিষ্টি বাদ না দিয়ে অল্প করে খেতে পারেন। শুধু একের পর এক মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসটি এড়িয়ে চলুন। দিনে যে কোনও এক রকম মিষ্টি খেতে পারেন।
খাওয়ার পরে হাঁটা
সুষম ডায়েটের এটিও কিন্তু একটি অভ্যাস। সে জন্য ১০ হাজার পা হাঁটার প্রয়োজন নেই। কেবল খাবার খাওয়ার পরে ১০-১৫ মিনিট হেঁটে নিলে শরীরে মেদ জমতে পারে না, আবার হজমও দ্রুত হয়। এ ছাড়া প্রচুর পরিমাণে জল খেতে হবে। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুমও জরুরি। ডায়েটের সঙ্গেই নিয়ম করে শারীরচর্চা করতে হবে। মেদহীন, ছিপছিপে চেহারা সুষম ডায়েটের একমাত্র লক্ষ্য নয়, বরং রোগহীন, সুস্থসবল, চনমনে থাকাটাই কাম্য।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- লক্ষ্মীপুজো যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই হয় তা নয়, দেশের নানা প্রান্তে হয়, তবে পুজোর আচার ভিন্ন। মহারাষ্ট্রে তা লক্ষ্মী পূজন, গুজরাতে আবার চোপড়া পূজন। ওড়িশায় তা-ই গজলক্ষ্মীর আরাধনা। কোন রাজ্যে কেমন ভাবে লক্ষ্মী পুজো হয়?
- উত্তমকুমার নিষ্ঠাভরে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই এই পুজোর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো’। এখনও এই পুজো এ ভাবেই পরিচিত। পুজোর ঐতিহ্য এবং রীতি নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডা দিলেন উত্তম কুমারের ভাইঝি ও নাতনি।
- সময় করে বসে পুজোর জন্য আলপনা দেওয়া এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই, মফস্সলেও। ইদানীং সমাজমাধ্যমের রিলে হাতপাখা থেকে শুরু করে পুরনো শাড়ি, চায়ের টেবিল থেকে ডায়েরির মলাট কিংবা বসার ঘরের মেঝে, সর্বত্র আলপনা দিচ্ছেন হুজুগে মানুষজন।
-
শতবর্ষপ্রাচীন প্রতিমার পুজোর ভোগে ১০ রকমের খাবার! দেবাদৃতার ঘরোয়া লক্ষ্মীপুজো ঠিক কেমন হল
-
ঘরোয়া ভাবে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এ বার লক্ষ্মীপুজো শ্রীলেখার! দেবীর কাছে কোন বিশেষ প্রার্থনা করবেন তিনি?
-
‘মায়ের পছন্দ না হলে আমার হাত দিয়ে অন্য কিছু করান,’ অপরাজিতার বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় এ বার কী কী আয়োজন?
-
কেন জোড়া ইলিশ দেওয়া হয় লক্ষ্মীপুজোয়? তেল-মশলা ছাড়াই বানানো হয় ভোগপ্রসাদ, রন্ধনের নিয়মও আলাদা
-
লক্ষ্মীলাভে কেন পিছিয়ে বাংলা ছবি, কোন পথে আসবে সমৃদ্ধি? কী বলছেন প্রযোজক-পরিচালক-অভিনেতারা