পুজো এলেই বঙ্গললনাদের মন উড়ু উড়ু। আলমারিতে রাখা বাছাই করা শাড়ির ভান্ডার ঝালিয়ে নেওয়ার এই তো সময়! এমন নয় যে সারাবছর শাড়ি কেনা হয় না। তবে পুজোর শাড়ির গুরুত্ব আলাদা। সেখানে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চোখে পড়ার একটা ব্যাপার থাকে। পুজোয় বেছে বেছে সেই সব শাড়ি কেনা হয় যা একাধারে আধুনিক আবার একইসঙ্গে চিরকালীন ঐতিহ্যের হাত ধরে থাকে। সোজা কথায় যাকে বলে ‘ক্লাসিক’, তেমন শাড়ির কদর বাড়ে উৎসবে। আর তেমনই এক ‘ক্লাসিক’ শাড়ি হল তসর।
বাঙালি শৌখিনীর ওয়ার্ডরোবে যে শাড়ির জায়গা কখনওই কম পড়ে না, তা হল ওই তসর। নিভুনিভু সোনালি দ্যুতি আর কাগজের মতো হালকা খসখসে টেক্সচার— সব মিলিয়ে আভিজাত্যের আর আরামের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি হয় তসরে। কিন্তু সব তসর কি আর একরকম? মোটেই না। বাংলা থেকে ছত্তীসগঢ়, বিহার থেকে মহারাষ্ট্র— দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তসর বোনা হয় ভিন্ন ভিন্ন কায়দায়, আর তার প্রতিটিরই চরিত্র আলাদা আলাদা। কেনার আগে তাই একটু চিনে নেওয়া ভাল, কোন তসর ঠিক কেমন।
ভাগলপুরের গাছি তসর
‘সিল্ক সিটি’—ভাগলপুরের এই তকমা এমনি এমনি জোটেনি। এখানকার তসর তৈরি হয় অ্যান্থেরিয়া পাফিয়া প্রজাতির বুনো রেশমপোকার গুটি থেকে, যা কোনও ফার্মে নয়, বনজঙ্গলে বড় বড় গাছের পাতা খেয়েই বড় হয়। ভাগলপুরি তসরের সবচেয়ে বড় গুণ হল তার মসৃণ ভাব আর নিখুঁত বুনন—অন্যান্য তসরের তুলনায় এই কাপড়ে তসরের চেনা খসখসে ভাব থাকে কম, হাতে ধরলে অনেকটা রেশমের মতোই অনুভূতি হয়। সোনালি আভাও এতে অনেকখানি স্পষ্ট। বিশেষ করে কাপড় কাচার পরে জেল্লা আরও খোলে। ভাগলপুরে গাছি তসরের পাশাপাশি মুগা-তসর আর ঘিচা-তসরও বোনা হয়, তবে খাঁটি ভাগলপুরি গাছি তসরই জনপ্রিয়তায় বেশি এগিয়ে।
মূল্য: দাম শুরু হয় হাজার দুয়েক টাকা থেকে, হাতের কাজ আর জরির পরিমাণ বাড়লে দাম উঠে যেতে পারে দশ-বারো হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে যদি বিশেষ নকশাদার শাড়ি আলাদা করে বানানো এবং বোনানো হয়, তবে তার দাম লাখও পেরিয়ে যেতে পারে। তেমন শাড়ি বছরখানেক আগে পরেছিলেন মুকেশ অম্বানীর গৃহিণী নীতা অম্বানী। সেই শাড়ি বিশেষ ভাবে তৈরি করিয়েছিল তাঁর ব্র্যান্ড স্বদেশের শিল্পীরা।
মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ তসর
মহারাষ্ট্রের পূর্ব প্রান্তে, ভন্ডারা জেলা এবং বিদর্ভ অঞ্চলে তৈরি হয় বিদর্ভ তসর। এখনও বহু মানুষের কাছে এই তসর অচেনা, যদিও এই শাড়ি কোনও অংশে কম আকর্ষণীয় নয়। বিদর্ভ তসরের যে শাড়িটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, তা হল ‘কারভাটি কিনার শাড়ি’। করাতের দাঁতের মতো জ়িগজ়্যাগ পাড়ের জন্যই ওই নাম। সেটিই বিদর্ভ তসর শাড়ির বৈশিষ্ট্য। অবশ্য ওই পাড় আলাদা করে বোনা হয় খসখসে তসরের জমির উপর সাধারণত সুতো দিয়ে। মাটির লুম বা পিট-লুমে বোনা হয় এই শাড়ি। তসরের যে স্বাভাবিক রুক্ষ ভাব, সেটি এই শাড়িতে বেশ প্রকট। যেহেতু এই শাড়ির জনপ্রিয়তা এখনও মূলত হস্তশিল্প-প্রেমী আর তসরের সমঝদারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাই এটি বাজারে সহজলভ্য নয়—কিন্তু যাঁরা অন্যরকম কিছু খুঁজছেন, তাঁরা বিদর্ভ তসরের খোঁজ করে দেখতে পারেন।
মূল্য: হাতের বিশেষ কারুকাজের জন্য এই তসরের দাম মোটামুটি দশ থেকে আঠারো-উনিশ হাজার টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করে।
ছত্তীসগঢ়ের কোসা সিল্ক
ছত্তীসগঢ়ে তসরকে ডাকা হয় ‘কোসা’ নামে, আর এই নামের নেপথ্যেই লুকিয়ে কোসা শাড়ির গল্প। রায়গড়, কোরবা, চম্পার মতো জায়গায় কোস্টা বা দেবাঙ্গন তাঁতি সম্প্রদায় বহু প্রজন্ম ধরে হাতে গুটি পাকিয়ে সুতো বার করেন নানা গাছে বেড়ে ওঠা বুনো রেশম পোকার গুটি থেকে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় থাই-রিলিং। ওই সম্প্রদায়ের নামেই শাড়ির নাম কোসা। আর তাদের হাতের টানে সুতো বার করার বিশেষ পদ্ধতি থেকেই কোসা সিল্কের আলাদা চরিত্রের সূচনা। সাধারণ তসরের চেয়ে এটি তুলনায় বেশি ভারী, শক্ত গঠনের আর এর সোনালি রঙের আভাও বেশ স্পষ্ট। এতে ভাঁজ পড়ে সুন্দরভাবে, আর সেই জন্যই বিয়েবাড়ি, পুজো বা অনুষ্ঠানে কোসা শাড়ির কদর বেশি। আসল কোসা চেনার একটা উপায় হল এর পাড় আর আঁচল—এগুলি ছাপা হয় না। বাড়তি সুতো দিয়ে বোনা থাকে। এই শাড়ি নিজস্ব জিআই ট্যাগও পেয়েছে।
মূল্য: সাড়ে চার-পাঁচ হাজার টাকা থেকে কোসা সিল্কের দাম শুরু হয়। তবে নকশা এবং জরির কাজ যত সূক্ষ্ম আর বেশি, ততই বাড়বে দাম। কোনও কোনও কোসা সিল্ক শাড়ির দাম পঞ্চাশ হাজারও ছুঁতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের তসর
বাংলার তসরের নিজস্ব একটা বুনন পদ্ধতি আছে, যা এ রাজ্যের তসরকে একটু বেশিই কাগজের মতো খসখসে অনুভূতি দেয়। হাতে ধরলে মনে হবে খুব পাতলা কোনও কাগজ ধরে আছেন। অথচ গায়ে পরলে এর চেয়ে আরামের কিছু নেই। এই অতিরিক্ত মিহি আর হালকা ভাবই পশ্চিমবঙ্গে বোনা তসরকে অন্য রাজ্যের তসর থেকে আলাদা করে দেয়। তাছাড়া হালকা ওজন, সূক্ষ্ম বুনন আর নরম সোনালি আভার জন্যও পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদার মতো জায়গায় বোনা তসরের আলাদা কদর রয়েছে শাড়িপ্রেমীদের মধ্যে। বাংলার তসর গরমে পরে আরাম, আবার আভিজাত্য আর লাবণ্যেরও কমতি নেই। এর উপর কাঁথা স্টিচ, বালুচরী মোটিফ, রেশমসুতোর বুনন, ব্লক-প্রিন্ট মিশিয়ে নানা রকমের তসর শাড়ি বোনা হয় এ রাজ্যে, যা বাংলার তসরকে করে তোলে আরও বৈচিত্রময়।
মূল্য: দাম শুরু আড়াই তিন হাজার টাকা থেকে, তবে এমব্রয়ডারি, হাতের কাজ, কাঁথা স্টিচ, সুতোর বুনন এবং ব্লক প্রিন্টের ভিত্তিতে দাম অনেকটাই বাড়তে পারে।
ঘিচা তসর
এ তসর একটু অন্যরকম। রেশমগুটি থেকে সুতো বার করার পর যে ছোট আঁশ পড়ে থাকে, সেগুলো ফেলে না দিয়ে তা জুড়েই তৈরি করা হয় ঘিচার সুতো। তার পরে সেই সুতো দিয়ে বোনা হয় শাড়ি। ফলে এই শাড়ির টেক্সচার হয় একটু বেশিই অমসৃণ। মসৃণ তসরের তুলনায় ঘিচা অনেক বেশি ‘রাফ অ্যান্ড রাস্টিক’, হাতের ছোঁয়া স্পষ্ট বোঝা যায় কাপড় ছুঁলেই। তবে সেইখানেই লুকিয়ে এ শাড়ির সৌন্দর্য। রোজের পরার ক্যাজ়ুয়াল শাড়ি হিসাবে ঘিচার অন্যরকম আবেদন রয়েছে। এতে জাঁকজমকের চেয়ে সারল্যই বেশি।
মূল্য: ঘিচার দাম তুলনামূলক নাগালের মধ্যে—দু-আড়াই হাজার টাকা থেকেই ভাল ঘিচা তসর পাওয়া যায়।
আসলে তসর সিল্ক তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য। তসর সিল্কের জন্য প্রয়োজনীয় রেশমপোকাও কোনও বন্ধ ঘরে বা ফার্মে চাষ করা যায় না। প্রাকৃতিক পরিবেশে অর্জুন, আসান বা শাল গাছের পাতা খেয়ে বেড়ে ওঠা রেশমপোকা নিজের চারপাশে লালা দিয়ে একটি শক্ত ডিম্বাকৃতি গুটি বা কোকুন তৈরি করে। জঙ্গল থেকে সেই কোকুন সংগ্রহ করে গরম জলে ফুটিয়ে নরম করা হয়, যাতে ভিতরের প্রাকৃতিক আঠা গলে গিয়ে সুতো সহজে আলগা হয়ে আসে। অনেক সময়ে পোকাটিকে অক্ষত অবস্থাতেও বের হতে দেওয়া হয়। সেই ধরনের তসরকে বলা হয় ‘অহিংস’ তসর। তার পর সেই ফাঁকা কোকুন সেদ্ধ করে দক্ষ কারিগররা হাত দিয়ে বা চরকায় সুতো টেনে বের করেন এবং হস্তচালিত তাঁতে বুনে তোলেন তসর শাড়ি। শাড়ির দুনিয়ায় তাই তসরের মর্যাদা আলাদাই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- লক্ষ্মীপুজো যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই হয় তা নয়, দেশের নানা প্রান্তে হয়, তবে পুজোর আচার ভিন্ন। মহারাষ্ট্রে তা লক্ষ্মী পূজন, গুজরাতে আবার চোপড়া পূজন। ওড়িশায় তা-ই গজলক্ষ্মীর আরাধনা। কোন রাজ্যে কেমন ভাবে লক্ষ্মী পুজো হয়?
- উত্তমকুমার নিষ্ঠাভরে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই এই পুজোর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো’। এখনও এই পুজো এ ভাবেই পরিচিত। পুজোর ঐতিহ্য এবং রীতি নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডা দিলেন উত্তম কুমারের ভাইঝি ও নাতনি।
- সময় করে বসে পুজোর জন্য আলপনা দেওয়া এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই, মফস্সলেও। ইদানীং সমাজমাধ্যমের রিলে হাতপাখা থেকে শুরু করে পুরনো শাড়ি, চায়ের টেবিল থেকে ডায়েরির মলাট কিংবা বসার ঘরের মেঝে, সর্বত্র আলপনা দিচ্ছেন হুজুগে মানুষজন।
-
শতবর্ষপ্রাচীন প্রতিমার পুজোর ভোগে ১০ রকমের খাবার! দেবাদৃতার ঘরোয়া লক্ষ্মীপুজো ঠিক কেমন হল
-
ঘরোয়া ভাবে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এ বার লক্ষ্মীপুজো শ্রীলেখার! দেবীর কাছে কোন বিশেষ প্রার্থনা করবেন তিনি?
-
‘মায়ের পছন্দ না হলে আমার হাত দিয়ে অন্য কিছু করান,’ অপরাজিতার বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় এ বার কী কী আয়োজন?
-
কেন জোড়া ইলিশ দেওয়া হয় লক্ষ্মীপুজোয়? তেল-মশলা ছাড়াই বানানো হয় ভোগপ্রসাদ, রন্ধনের নিয়মও আলাদা
-
লক্ষ্মীলাভে কেন পিছিয়ে বাংলা ছবি, কোন পথে আসবে সমৃদ্ধি? কী বলছেন প্রযোজক-পরিচালক-অভিনেতারা