দেবীর অধিবাস, বোধন পেরিয়ে মহাষ্টমীর সকালে এক অন্য আবেশ তৈরি হয় বাঙালির জীবনে। দুর্গাপুজোর বাকি দিনগুলি এক দিকে, আর অষ্টমী অন্য দিকে। এই দিনটির মাহাত্ম্য বাঙালির কাছে সবসময়েই বেশি। কারণ, অষ্টমীর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার বিষয়টি। ‘‘এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ নমঃ দক্ষযজ্ঞ বিনাশিন্যে মহাঘোরায়ৈ যোগিনী কোটিপরিবৃতায়ৈ ভদ্রকাল্যৈ ভগবত্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ” – মন্ত্রের অর্থ জানা থাক বা না-থাক, একমুঠো ফুল মায়ের পায়ে ছুড়ে দেওয়াতেই আনন্দ। কার নিশানা কত নিপুণ, পুরোহিতের টিকি টপকে কার আঁজলাভরা ফুল মায়ের পায়ের ঠিক কাছটিতে পৌঁছোল, তা নিয়ে ছদ্ম প্রতিযোগিতাও চলে। থালাভরা ফুলের সিংহভাগ কার হাতে গেল, আর কে পেলেন শুধু বেলপাতা, তা নিয়ে কিঞ্চিৎ ঝামেলা-ঝঞ্ঝাটও যে হয় না, তা নয়। আর যাদের নিয়ে এত হুলস্থুল, বছরের অন্যান্য দিন ফুলের প্যাকেটে গাঁদা, জবা, রজনীগন্ধার ভিড়ে তারাই এক কোনায় নিশ্চুপ হয়ে সেঁধিয়ে থাকে। অথচ পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার দিনে এদেরই জৌলুস কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বাঙালির পুজোর উপচারে এদের নাম ‘কুচো ফুল’। অর্থাৎ, নানা রকম ছোট ফুলের সমাহার।
কুচো ফুল কি ফুলের কুচোনো অংশ?
‘কুচো ফুল’ কথাটা বাঙালির অভিধানে পাকাপাকি জায়গায় করে নিয়েছে। অথচ, ‘কুচো ফুল’ কথাটির উল্লেখ শাস্ত্রে নেই। চন্দন, বেলপাতার সঙ্গে যে ফুলগুলি নিবেদন করা হয়, সেগুলিকেই একত্রে ‘কুচো ফুল’ বলা হচ্ছে। কুলীন ফুলগুলির সঙ্গে এক পংক্তিতে তারা না এলেও, যে কোনও পুজোই এদের ছাড়া অসম্পূর্ণ। এখন কথা হল, এই ‘কুচো ফুল’ আসলে কী?
কী কী থাকে কুচো ফুলে?
অনেকেই ভাবেন, ‘কুচো ফুল’ মানে কুচোনো ফুল। বড় বড় ফুলের পাপড়ি কুচিয়ে বা ছিঁড়ে মেশানো হয়। কিন্তু শাস্ত্র বলে পুজোয় কোনও ‘ছিন্ন’ বা ছেঁড়ে-ফাটা ফুল দেবতাকে নিবেদন করা নিষিদ্ধ। তাই ‘কুচো ফুল’ মানে ফুলের ছেঁড়া বা কুচোনো অংশ নয়। প্রতিটি ফুলই আস্ত। ‘কুচো’ শব্দটি এসেছে বাংলা ‘কুচ’ বা ‘ছোট’ রূপ থেকে। নিজস্ব পাপড়ি, বৃন্ত নিয়ে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ। ইদানীং অঞ্জলির থালায় যে ‘কুচো ফুল’-এর সমাহার দেখা যায়, তাতে কমবেশি মিলেমিশে থাকে শিউলি, টগর, সাদা-গোলাপি ও নানা রঙের নয়নতারা, জুঁই, বেল ফুল, জবার কুঁড়ি, অপরাজিতা, মাধবীলতা ও কাঠগোলাপের ছোট কুঁড়ি, ছোট গাঁদা, দোপাটি ইত্যাদি।
তবে শাস্ত্রে ‘কুচো ফুল’-এর ব্যাখ্যা খানিক অন্য রকম। সেখানে গাঁদার ছেঁড়া অংশ বা দোপাটির পাপড়ির কথা বলা হয়নি। ‘‘সূত্রেণ গ্রথিতং মাল্যং নানাপুষ্পসমন্বিতম্” — অর্থাৎ, যে মালা গেঁথে দেবীকে নিবেদন করা হবে, তাতে সব রকম ফুল থাকবে। পুজোয় পুষ্পমাল্য অর্পণের এটিই বিধি। এই সব রকমের ফুল বলতে কিছু বিশেষ ফুলের উল্লেখ আছে ‘কালিকা পুরাণ’-এ। এমনই বললেন দুর্গাপুজো বিষয়ক গবেষক ও সংস্কৃত ভাষা, সাহিত্য ব্যাকরণের অধ্যাপক নবকুমার ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, ‘‘‘কালিকা পুরাণ’-এ বলা হয়েছে দেবীর প্রিয় ফুল বকুল, নাগকেশর, কুন্দ, করবী, আকন্দ, পদ্ম ও রক্তপদ্ম। এ ছাড়াও জবা, রক্তপদ্ম ও বেলপাতা দেবীর অধিক প্রিয়। ‘শাক্তানন্দ তরঙ্গিণী’ গ্রন্থে বলা হচ্ছে, দেবীর পুজোয় জবা, করবী, অপরাজিতা ফুল বিশেষ প্রশস্ত। অর্থাৎ, এই ফুলগুলি উপচার হিসেবে দিলে দেবী খুব খুশি হন। ‘দুর্গাভক্তি তরঙ্গিনী’ গ্রন্থে আবার দ্রোণ পুষ্পেরও উল্লেখ আছে। দেবী দুর্গার অধিক প্রিয় এই ফুল।”
শাস্ত্রে ‘কুচো ফুল’-এর ব্যাখ্যা খানিক অন্য রকম।
কোনও শাস্ত্রেই এই ফুলগুলিকে ‘কুচো ফুল’ বলে উল্লেখ করা হয়নি, শুধু বলা হয়েছে দেবীর প্রিয় ফুল। এখন সেগুলিই একত্রিত করে পুজোয় নিবেদন করা হয়। নবকুমারবাবু বলছেন, ‘কুচো ফুল’ আসলে সব রকম ফুলের সমন্বয়। তবে এ সব ফুলের বেশির ভাগই এখন পাওয়া যায় না। আর যদিও বা পাওয়া যায়, তা হলে সেগুলি কুচো ফুলের মধ্যে দেওয়াও হয় না। সহজলভ্য যে সব ছোট ফুল বা যেগুলির চাষ বেশি হয়, সেগুলিই মিশিয়ে বিক্রি করা হয় ফুলের বাজারে। মরসুমভেদে আবার সেগুলি বদলেও যায়।
পুজোর আগে ফুলের চাহিদা এমনিতেই কয়েক গুণ বেড়ে যায়। মণ্ডপসজ্জা থেকে পুজোর উপকরণ হিসেবে গাঁদা, রজনীগন্ধা-সহ নানা ফুলের প্রয়োজন হয়। সেই সঙ্গে পদ্মের চাহিদাও বাড়ে। সেই বাজার ধরতেই পুজোর আগে থেকে জমি পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকেন ফুলচাষিরা। তাই আলাদা করে শাস্ত্র মেনে ‘কুচো ফুল’-এর চাষ করা সম্ভব হয় না বলেই জানালেন বাগনানের ফুল ব্যবসায়ী বাপ্পা মণ্ডল। শিউলি, টগর, দোপাটি, ছোট গাঁদা - যখন যেমন পাওয়া যায়, তা মিশিয়ে দেওয়া হয় ‘কুচো ফুল’-এর মধ্যে। বাপ্পা জানালেন, খামখেয়ালি আবহাওয়া সব বদলে দিচ্ছে। নিম্নচাপের বৃষ্টিতে ফুলের জমিতে জল দাঁড়িয়ে যায়। দ্রুত জল না নামলে গাছের গোড়া পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ফুল চাষ।
নদিয়া, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়ার মতো জেলাগুলিতে ফুলের চাষ হয়। ছোট গাঁদা বা রজনীগন্ধার জোগান আসে মূলত নদিয়া থেকে। পূর্ব মেদিনীপুরে চাষ হয় বেল, জুঁই ফুলের, আবার পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে আসে গাঁদা, গোলাপ। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তৃত গ্রামীণ এলাকায় প্রচুর পরিমাণে টগর, অপরাজিতা ও অন্যান্য ছোট ফুলের চাষ হয়।
হাওড়া জেলার মল্লিকঘাট ফুলবাজার এই ‘কুচো ফুল’ সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র। এ ছাড়া শিয়ালদহ ফুলবাজার এবং কোলাঘাট মোড়ের পাইকারি বাজার থেকে প্রতিদিন ভোরে হাওড়া ও কলকাতার বিভিন্ন স্থানীয় বাজারে ‘কুচো ফুল’ পৌঁছোয়। সাধারণ সময়ে এক কেজি ‘কুচো ফুল’-এর দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে থাকলেও, দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে (বিশেষ করে মহাষ্টমী ও মহানবমীতে) এর চাহিদা আকাশছোঁয়া হয়ে যায়।
পুজোর সময়ে কুচো ফুলের চাহিদা বাড়ে।
হাওড়ার কোলে মার্কেটে ফুল বিক্রি করেন সন্তোষ। বাপ-ঠাকুরদাও এই কাজই করতেন। সন্তোষ জানালেন, ফুলের বাজারে আগুন লেগেছে। যে দোপাটি এবং ‘কুচো ফুল’ পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় ৪০ টাকা প্রতি কেজি দরে, সেটাই এ বছর বিকোচ্ছে ১০০ টাকায়। খুচরো বাজারে তা ১২০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করবে। অন্য সময়ে যেখানে ৪০-৫০ টাকায় এক কেজি লালচে গাঁদা ফুল পাওয়া যায়, তারই দাম এখন ৭০ টাকা। হলুদ গাঁদা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। অন্য সময়ে যার দাম থাকে ৩০-৪০ টাকা। পুজো চলাকালীন এক কেজি ভালো মানের ‘কুচো ফুল’-এর দাম ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। পাইকারি ফুল ব্যবসায়ীদের কথায়, পাইকারি বাজারে দাম বেশি থাকায় খুচরো বাজারেও বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো ফুলের দাম হাঁকাচ্ছেন। তবে দাম যতই হোক না কেন, বাঙালি ফুল কিনতে যে পিছপা হচ্ছেন না, সে কথাও স্বীকার করেছেন তাঁরা।
মফস্সলের পুজোয় ‘কুচো ফুল’-এর জোগান আসে বাড়ি বাড়ি থেকে। কেউ ভোর রাতে তুলবে শিউলি, কারও দায়িত্বে থাকে টগর বা নয়নতারা। শহরের পুজোর ছবিটা আলাদা। পুজোর ক’টা দিন হইহই করে সাজি ভরে শিউলি কুড়োনোর উন্মাদনা নেই। শিউলির গন্ধমাখা শৈশব অতীত হয়েছে, তবে পুষ্পাঞ্জলির আনন্দটা এখনও উপভোগ করেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। বললেন, ‘‘‘কুচো ফুল’ কী কী মিশিয়ে হয়, শাস্ত্রমতে তা বলতে পারব না। তবে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার থালায় স্তুপাকারে রাখা নানা রঙের ফুলগুলি বাঙালির আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।” পুজোর বাদ্য, পুজোর ধূপধুনো, পুজোর মন্ত্র, পুজোর ফুলের সঙ্গে একটি অপরিবর্তনীয়তার আভাস মিশে থাকে। মহাষ্টমীর সকালে থালাভর্তি রকমারি কুচো ফুলের স্পর্শে তা যেন নতুন করে জীবন পায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- লক্ষ্মীপুজো যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই হয় তা নয়, দেশের নানা প্রান্তে হয়, তবে পুজোর আচার ভিন্ন। মহারাষ্ট্রে তা লক্ষ্মী পূজন, গুজরাতে আবার চোপড়া পূজন। ওড়িশায় তা-ই গজলক্ষ্মীর আরাধনা। কোন রাজ্যে কেমন ভাবে লক্ষ্মী পুজো হয়?
- উত্তমকুমার নিষ্ঠাভরে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই এই পুজোর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো’। এখনও এই পুজো এ ভাবেই পরিচিত। পুজোর ঐতিহ্য এবং রীতি নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডা দিলেন উত্তম কুমারের ভাইঝি ও নাতনি।
- সময় করে বসে পুজোর জন্য আলপনা দেওয়া এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই, মফস্সলেও। ইদানীং সমাজমাধ্যমের রিলে হাতপাখা থেকে শুরু করে পুরনো শাড়ি, চায়ের টেবিল থেকে ডায়েরির মলাট কিংবা বসার ঘরের মেঝে, সর্বত্র আলপনা দিচ্ছেন হুজুগে মানুষজন।
-
শতবর্ষপ্রাচীন প্রতিমার পুজোর ভোগে ১০ রকমের খাবার! দেবাদৃতার ঘরোয়া লক্ষ্মীপুজো ঠিক কেমন হল
-
ঘরোয়া ভাবে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এ বার লক্ষ্মীপুজো শ্রীলেখার! দেবীর কাছে কোন বিশেষ প্রার্থনা করবেন তিনি?
-
‘মায়ের পছন্দ না হলে আমার হাত দিয়ে অন্য কিছু করান,’ অপরাজিতার বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় এ বার কী কী আয়োজন?
-
কেন জোড়া ইলিশ দেওয়া হয় লক্ষ্মীপুজোয়? তেল-মশলা ছাড়াই বানানো হয় ভোগপ্রসাদ, রন্ধনের নিয়মও আলাদা
-
লক্ষ্মীলাভে কেন পিছিয়ে বাংলা ছবি, কোন পথে আসবে সমৃদ্ধি? কী বলছেন প্রযোজক-পরিচালক-অভিনেতারা