E-Paper

মধুবনী থেকে পিংলার পটচিত্র, ক্যানভাসে কলকাতার রকের আড্ডাও, দুর্গাপুজোয় লোকশিল্পের গল্প বুনছেন গোপাল পোদ্দার

দুর্গাপুজোর ক্যানভাসে লোকশিল্পের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। গত ২৫ বছর ধরে থিমের ভাবনায় আঞ্চলিক শিল্পকে প্রাধান্য দিয়েছেন গোপাল পোদ্দার। কালের নিয়মে হারিয়ে যেতে বসা শিল্প, শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়েছেন আমবাঙালির। এ বারের পুজোতেও থাকছে সেই চমক।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:০২
গত ২৫ বছর ধরে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ পরিকল্পনা করছেন, থিম-শিল্পী গোপাল পোদ্দারের এ বারের শিল্পকর্ম মুগ্ধ করবে।

গত ২৫ বছর ধরে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ পরিকল্পনা করছেন, থিম-শিল্পী গোপাল পোদ্দারের এ বারের শিল্পকর্ম মুগ্ধ করবে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রোদ এসে ধুয়ে দিচ্ছে মাঠ-ঘাট, জলা-জঙ্গল। আকাশে আশ্বিনের নীল। মাটিতে কাশ, শিউলি। দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত। কোথাও প্রাত্যহিক কাজকর্মে মগ্ন গাঁয়ের লোকজনেরা। কোথাও শহরের ব্যস্ততার ছবি। ভোরের শহর জেগে উঠেছে ফুটন্ত চায়ের ধোঁয়ায়। সবই যেন হঠাৎই জীবন্ত হয়ে উঠেছে ক্যানভাসে। শিল্পীর রঙিন হাতে বিচিত্র তার রূপ। একে একে রঙে ভরে গিয়েছে ছোট ছোট ঘরগুলি। রং, তুলি, কাপড়ের ভাঁজে জীবনের আঁকিবুঁকি। তারই মাঝে টানা টানা চোখ, ত্রিনয়নের দীপ্তি— সে রূপের ছটাই আলাদা। এ সবই লোকশিল্পীদের তুলির টানে প্রাণ পেয়েছে ২০/ ১০ ক্যানভাসে। কোথাও পিংলার স্ক্রল পটচিত্রের নানা গল্প, কোথাও মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি চিত্রশিল্পের ঝলক, আবার কোথাও ওড়িশার পটচিত্র। আনন্দবাজার ডট কমের ‘আর্টচালা’-র উদ্যোগে লোকশিল্পী ও কারিগরদের নিয়ে হাতে আঁকা পাঁচ ভিন্ন রকম চিত্রপটের প্রদর্শনী হবে শহরের পাঁচ পুজোয়। রাজ্য, ভিন্ রাজ্যের লোকশিল্পীদের নিয়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের তত্ত্বাবধান করছেন যিনি, তাঁকে কলকাতা চেনে ‘থিম-শিল্পী’ নামেই। তিনি গোপাল পোদ্দার। লোকশিল্প, আঞ্চলিক ঐতিহ্য, দৃশ্যকাব্য-ভিত্তিক শৈল্পিক পরিবেশ সৃজনে দক্ষ। গত ২৫ বছর ধরে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ পরিকল্পনাতেও তাঁর অবদান রয়েছে।

পুজোর গন্ধ পেলেই বাঙালির মনকেমন করা শুরু হয়। কোথায় যে তা ধর্মের বাঁধন, শাস্ত্রের বিধান আলগা হয়ে সামাজিক উৎসব হয়ে ওঠে, আমজনতা তার খোঁজ চায় না। উৎসব ঘিরে বাণিজ্যের বিকাশ ঘটছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও তো হচ্ছে! শিল্পীদের ভাষায় যাকে বলে স্থাপনাশিল্প বা ইনস্টলেশন আর্ট, তার বিকাশ ঘটেছে নানা ভাবে। পুজোর স্থানটিকে স্থাপত্য-ভাস্কর্য-চিত্রশিল্পের নন্দনে জারিত করে তোলাই তো ‘থিম ভাবনা’র লক্ষ্য, এমনই মনে করেন শিল্পী গোপাল পোদ্দার। সেই ২০০১ সাল থেকে মণ্ডপ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। মণ্ডপের সাজসজ্জায় লোকশিল্পীদেরও যে প্রয়োজন রয়েছে, তা অনুভব করেন আগেই। ২০০৩ সাল থেকে তাঁর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় তৈরি মণ্ডপসজ্জায় থিম হিসেবে আঞ্চলিক শিল্পকে তুলে আনেন গোপালবাবু। তুলে আনেন লোকশিল্পীদেরও। তাঁদের নিখুঁত কারুকলায় সেজে ওঠে মণ্ডপ। শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ, নানা পুজোর থিমে লোকশিল্পের উপস্থাপনা মনে ধরে আমবাঙালির।

পাঁচ রাজ্যের লোকশিল্পের মিলমিশ হচ্ছে কলকাতার পাঁচ পুজোয়।

পাঁচ রাজ্যের লোকশিল্পের মিলমিশ হচ্ছে কলকাতার পাঁচ পুজোয়।

এ বছরে আর মণ্ডপ পরিকল্পনার সঙ্গে তেমন ভাবে জুড়ে নেই শিল্পী। বললেন, ‘‘২৫ বছর ধরে পুজোর পরিকল্পনা করছি। এ বছর আর সক্রিয় ভাবে পুজোর সঙ্গে জুড়ে নেই। আনন্দবাজার ডট কমের উদ্যোগে কলকাতার দুর্গাপুজো উপলক্ষে যে সাংস্কৃতিক-শিল্প উদ্যোগের প্রস্তাব করা হয়েছে, তার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করছি। ওয়ারলি চিত্রশিল্প, গোন্ড চিত্রশিল্প, মধুবনী চিত্রকলা, ওড়িশা ও বাংলার পটচিত্র নিয়ে পাঁচটি হাতে আঁকা ম্যুরালের একটি সিরিজের প্রদর্শনী হবে কলকাতার পাঁচটি পুজোয়। স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে সে আয়োজনেই ব্যস্ত। কারিগরেরা এসেছেন পাঁচ রাজ্য থেকে। প্রতিটি মণ্ডপে তাঁদের ২০/ ১০ মাপের ক্যানভাস দেওয়া হয়েছে। সেখানেই স্থানীয় চিত্রকলাকে ফুটিয়ে তুলছেন তাঁরা। ছবির আঁকার কাজ চলছে। বেশ কিছু মণ্ডপে তা প্রায় শেষের দিকেও।’’

থিমের পুজোর শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন লোকশিল্পই ঠাঁই পেত মণ্ডপে। বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা, কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, বর্ধমানের কাঠের শিল্প, ফুলিয়ার তাঁত, দিনাজপুরের মুখোশ, মেদিনীপুরের মাদুর আর পটচিত্র ছিল মণ্ডপসজ্জার অন্যতম প্রধান শিল্প। এখন তা রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়েছে। সেখানে মধ্যভারতে গোন্ড উপজাতির চিত্রকলা থেকে মহারাষ্ট্রের আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রাচীন ওয়ারলি আর্টও প্রাধান্য পাচ্ছে। মেদিনীপুরের পিংলার পটচিত্র থেকে বিহারের মধুবনী চিত্রকলা— সবই হয়ে উঠেছে থিমের অঙ্গ। যেমন দক্ষিণ কলকাতার ৬৬ পল্লির পুজোর থিম মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি পেন্টিং। গোপালবাবু জানালেন, ৪ জন কারিগর এসেছেন। মহারাষ্ট্রের উত্তর সহ্যাদ্রি অঞ্চলের ‘ওয়ারলি’ নামক উপজাতিদের এটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প। এই শিল্পে মূলত জ্যামিতিক আকার যেমন— বৃত্ত, ত্রিভুজ এবং বর্গক্ষেত্র ব্যবহার করে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নাচ, চাষাবাদ এবং উৎসবের ছবি দেওয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়। ৬৬ পল্লির মণ্ডপও তেমন ভাবেই সাজছে।

মধুবনী, ওয়ারলি থেকে গোন্ড চিত্রশিল্প— ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পীরা।

মধুবনী, ওয়ারলি থেকে গোন্ড চিত্রশিল্প— ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পীরা।

গোন্ড চিত্রকলা নিয়ে আগেও কাজ করেছেন বলে জানিয়েছেন গোপালবাবু। মধ্যপ্রদেশের গোন্ড আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রাচীন শিল্পকলার সঙ্গেও বাঙালির পরিচিতি ঘটবে এ বার। দমদম পার্ক তরুণ সঙ্ঘে ক্যানভাস সাজছে। এই চিত্রকলায় প্রকৃতি, গাছপালা, পশুপাখি এবং মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার গল্পকে ফুটিয়ে তোলা হয় সূক্ষ্ম রেখা ও বিন্দুতে। যে কোন লোকশিল্পই স্থানীয় মানুষজনের জীবনের কথা বলে। যেমন ওড়িশার পটচিত্র। পুরী থেকে কিছু দূরত্বে রঘুরাজপুর গ্রাম হল এই পটশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। হেরিটেজ তকমা পাওয়া ওই গ্রামের কয়েকটি পরিবার এখনও পটচিত্রের সঙ্গে জড়িত। সেটাই তাঁদের জীবিকা। কোনও রকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শিল্পকে বহন করে নিয়ে চলেছে পরিবারগুলি। সেখান থেকেই শিল্পীরা এসেছেন তাঁদের জীবনের গল্প বলতে। আর সেই ছবি প্রাণ পাচ্ছে হিন্দুস্তান পার্কের পুজোয়।

২০/ ১০ মাপের ক্যানভাসে রং-তুলি দিয়ে আঁকছেন চিত্রশিল্পীরা।

২০/ ১০ মাপের ক্যানভাসে রং-তুলি দিয়ে আঁকছেন চিত্রশিল্পীরা।

মধুবনী চিত্রকলার প্রদর্শন যে কলকাতায় আগে হয়নি তা নয়, তবে এ বার হচ্ছে নতুন ধারায়। নতুন ভাবনায়। এমন ভাবনার কারিগর গোপালবাবু। তাঁর শিল্পকর্ম জানিয়ে তুলছে অনাবিল পুরনো স্মৃতি। হাতিবাগান সর্বজনীনের পুজোই তার প্রমাণ। সীতার রাজ্যের চিত্রকলায় সেজে উঠছে কলকাতা। মধুবনী পেন্টিংয়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে কলকাতার হলুদ ট্যাক্সি। মিথিলার এই লোকশিল্পের ক্যানভাসে ঠাঁই পাচ্ছে পুরনো কলকাতার রকের আড্ডা, চায়ের ঠেক, রিকশা, ট্রাম থেকে ফুচকাওয়ালা। বিহার থেকে আসা পাঁচ জন শিল্পীর তুলির টানে কলকাতা মিলেমিশে যাচ্ছে মধুবনীর শৈলীতে। বেহালা নতুন দলে আবার বাংলার পটচিত্রকেই প্রাধান্য দিয়েছেন থিম-শিল্পী। মেদিনীপুরের পিংলার পটচিত্রই সেখানে মুখ্য উপজীব্য। পটুয়া পাড়ার জনাপাঁচেক শিল্পী কলকাতার মণ্ডপে এসে কাজ করছেন। পটচিত্রের নিজস্ব অঙ্কনরীতিতে সেজে উঠছে ক্যানভাস।

কাঠের কাজ, পাথরের কাজ, বেনারসের পুতুলশিল্প নিয়েও কাজ করেছেন গোপালবাবু। ২০১৩ সালে হাতিবাগান নবীন পল্লির পুজো মাতিয়েছিলেন করাচির বিখ্যাত ট্রাক-আর্টের সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানি শিল্পীরা। সে ভাবনাও ছিল তাঁরই। আর্ট গ্যালারিতে শিল্পের রসাস্বাদনের কথা যাঁদের মনে থাকে না— তাঁরাই ভরিয়ে তুলেছেন পুজো প্রাঙ্গণ, যা কার্যত শিল্প-প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছে। গোপাল পোদ্দার তাঁদেরই একজন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে শিল্পীর, শিল্পের যোগসূত্র তৈরি করে চলেছেন বছরের পর বছর ধরে। তাতে লাভও হচ্ছে। তা হল রুচির বদল, নতুন রুচির জন্ম। লোকশিল্প এ ভাবেই জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠছে। মেদিনীপুরের চিত্রকরের পট, মুলেট, টেরাকোটা, ডোকরা, মাদুর হয়ে উঠছে বাঙালির গৃহসজ্জার অঙ্গ। যা এক সময়ে ছিল হাতোগোনা মানুষের আলোচনার বিষয়, তা এখন গণচর্চার রূপ পাচ্ছে। এখানেই গোপাল পোদ্দারের মতো শিল্পীদের সাফল্য।

সংক্ষেপে
  • লক্ষ্মীপুজো যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই হয় তা নয়, দেশের নানা প্রান্তে হয়, তবে পুজোর আচার ভিন্ন। মহারাষ্ট্রে তা লক্ষ্মী পূজন, গুজরাতে আবার চোপড়া পূজন। ওড়িশায় তা-ই গজলক্ষ্মীর আরাধনা। কোন রাজ্যে কেমন ভাবে লক্ষ্মী পুজো হয়?
  • উত্তমকুমার নিষ্ঠাভরে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই এই পুজোর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো’। এখনও এই পুজো এ ভাবেই পরিচিত। পুজোর ঐতিহ্য এবং রীতি নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডা দিলেন উত্তম কুমারের ভাইঝি ও নাতনি।
  • সময় করে বসে পুজোর জন্য আলপনা দেওয়া এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই, মফস্‌সলেও। ইদানীং সমাজমাধ্যমের রিলে হাতপাখা থেকে শুরু করে পুরনো শাড়ি, চায়ের টেবিল থেকে ডায়েরির মলাট কিংবা বসার ঘরের মেঝে, সর্বত্র আলপনা দিচ্ছেন হুজুগে মানুষজন।
Art Durga Puja Theme

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy