ক্লান্ত দিনে, একগাদা কাজের চাপে কখনও মনে হয় ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমায় দেখানো ভূতের রাজার জুতোজোড়া যদি মিলত, তালি মেরে চলে যেতে পারতেন নিমেষে, যেখানে মন চায়!
ভ্রমণপিপাসুদের মনে এমন বাসনা থাকা স্বাভাবিক। বিশেষত হাঁসফাস করা শহুরে জীবনে, সফর যেন মুক্তিরই নামান্তর। অনেকের কাছে দুর্গাপুজো নিয়ে আসে সেই খুশি। পুজোর ছুটি বেরিয়ে পড়ার চাবিকাঠি। তা হলে দেরি না করে পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলুন। চলুন ওড়িশা-ঝাড়খণ্ড সীমানার ‘সারান্ডা’য়, যা পরিচিত ‘সাতশো পাহাড়ের দেশ’ নামে। এখানে রয়েছে প্রকৃতির আদিমতা, লাল মাটির গন্ধ। হো এবং মুন্ডারি ভাষায় ‘সারান্ডা’ শব্দের অর্থ সাতশো পাহাড়ের দেশ। অসংখ্য পাহাড় থাকায়, এই জায়গার এমন নামকরণ।
সাহিত্যের পাতার সারান্ডার জঙ্গল, মেঘাতুবুরু, কিরিবুরু থেকে সূর্যাস্ত যেমন মুগ্ধ করবে, তেমনই আদিবাসী হাটে খুঁজে পাবেন ‘আরণ্যক’ জীবনের ছবি। রাতে গাড়ি নিয়ে কলকাতা থেকে সফর শুরু করলে, পৌঁছে যাবেন ভোরেই। কলকাতা থেকে বড়বিল সড়কপথে দূরত্ব পড়বে ৩৭৫ থেকে ৪০০ কিলোমিটারের মতো। নির্ভর করবে, কোন রাস্তায় যাবেন, তার উপর। ভোর চারটে-পাঁচটে নাগাদ গাড়ি ছুটিয়ে দিতে পারলে, ফাঁকা রাস্তায় হু-হু করে এগিয়ে যেতে পারবেন। দুই-তিনটি রুটে যাওয়া যায়। তবে কলকাতা, খড়গপুর, বহরাগোড়া, জামসোলা, যশীপুর, জোডা হয়ে গেলে দূরত্ব পড়বে ৩৭৫ কিলোমিটারের মতো। আর বহরাগোড়া, ধলভূমগড়, জাদুগোড়া, হলদীপোখর, চাইবাসা হয়ে গেলে দূরত্ব দাঁড়াবে ৪০০ কিলোমিটার। সফর সাজাতে পারেন বড়বিল থেকেই।
ঝিঙ্কিরার ঝর্না। ছবি:সংগৃহীত।
বড়বিল পৌঁছোতেই বিকেল হয়ে যেতে পারে। তাই সেই রাতটি বড়বিলে থেকে যেতে পারেন। আবার দিন তিনেকের সফরের জন্য পাকাপাকি আস্তানাটিও বড়বিল হতে পারে। এখানে ভাল মানের হোটেল মিলবে।
রাতটা বিশ্রাম করে, সকালের জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ুন ঝিঙ্কিরার ঝর্না হয়ে মেঘাতুবুরু-কিরিবুরু হয়ে থলকোবাদ অরণ্যের দিকে।
বড়বিল শহর ছাড়িয়ে বোলানির রাস্তা ধরে এগোলেই শুরু হবে জঙ্গল। পাকা সড়কের ধারে ছোট ছোট গ্রাম। লোকজন হাতেগোনা। যেতে যেতেই দৃশ্যগোচর হবে স্তূপাকৃতি লৌহচূর্ণ। তা থেকেই মেলে লোহা। সে সব পার করে আরও এগোলে ঝিঙ্কিরা। দূরত্ব ১২ কিলোমিটারের মতো। যেখানে গাড়ি দাঁড়ায় সেখান থেকে দৃশ্যগোচর হয় বয়ে যাওয়া ক্ষীণ জলস্রোত। শুরুতে মনে হতেই পারে, এই দেখতে শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে এত দূর ছুটে আসা! ভুল ভাঙবে জলস্রোতের উৎস সন্ধানে মিনিট দশেক পায়ে পায়ে এগোলেই। উঁচু পাহাড়ের উপর থেকে ঝরে পড়ছে ঝিঙ্কিরা জলপ্রপাত। সূর্যরশ্মি জলে বিচ্ছুরিত হয়ে মেলে ধরেছে রামধনুর সাত রং। বড় বড় গাছের পাতা ঢেকেছে মিহি লৌহকণায়। জলের মধ্যে লোহার চূর্ণ।
সাতশো পাহাড়ের দেশ সারান্ডা। ছবি: সংগৃহীত।
ঝিঙ্কিরা ছেড়ে গন্তব্য ঘাঘীরথী জলপ্রপাত। মেঘাতুবুরু-কিরিবুরুর রাস্তা ধরে প্রায় ১৫ কিলোমিটার রাস্তা। এই পথে যেতে হলে মেঘাতুবুরু থেকে বন দফতরের অনুমতি অত্যাবশ্যক। প্রত্যেকের পরিচয়পত্র দেখে কাগজে ছাপ্পা পড়লে তবেই এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি মেলে। এই পথে দেখা যায় লোহার খনিও। পাহাড়ের গা থেকে অনবরত লোহা খনন করেছে যন্ত্র। খানিক এগোলেই ঘন হয়ে ওঠে বন। তারই মধ্যে সশব্দে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় ঘাঘীরথী। সুবিশাল অরণ্যরাজির মধ্যে ধাপে ধাপে সিঁড়ি। টিকিট কাটলে ওঠার সুযোগ মেলে ‘নেচার ট্রেল’ বা ঝুলন্ত সেতুতে। পা ফেললেই কেঁপে ওঠে সেতু। এখান থেকে বনানী ও জলপ্রপাতের দৃশ্য মনে রাখার মতোই। ঝিঙ্কিরার মতো ঘাঘীরথীর উচ্চতা ততটা না হলেও, জঙ্গলের পরিবেশ সেই সৌন্দর্যে বাড়তি মাত্রা যোগ করে। এখানেই অদূর ভবিষ্যতে বন দফতরের আধুনিক পর্যটক আবাস তৈরি হতে চলেছে।
ঘাঘীরথীর ঝুলন্ত সেতু। ছবি: সংগৃহীত।
ঘাঘীরথী দেখে চলুন থলকোবাদের অরণ্যে। বন দফতরের যে বিশ্রামাবাস আছে থলকোবাদের জঙ্গলে, তা আরও প্রায় ২০ কিলোমিটার। পাহাড়ি রাস্তা পাথুরে, রয়েছে খানাখন্দ। সুতরাং গাড়িও সে রকম হওয়া চাই। গহীন অরণ্যে বন্যপ্রাণ দেখার তেমন সুযোগ না মিললেও রয়েছে ভালু গুহা, নজরমিনার। এই জঙ্গল, পথঘাটের কোনও কোনও অংশ হাতি চলাচলের পথ। এই সব জায়গায় পর্যটকদের আনাগোনা সেই অর্থে কমই। তাই পুজোয় খানিক নিরালা চাইলে সারান্ডা হতাশ করবে না।
ঘাঘীরথীর ঝর্না। ছবি:সংগৃহীত।
থলকোবাদের অরণ্যে বনবাংলোয় থাকতে চাইলে আগাম বুকিং করে আসতে হবে। যদি থাকতে না চান, জঙ্গলপথে ঘুরে ফিরে আসুন মেঘাতুবুরুর সানসেট পয়েন্টে। রেলিংঘেরা বাঁধানো চত্বর। তার ঠিক নীচে পাহাড়ের ঢাল নেমেছে অতল খাদে। নীচে ঘন বন। সামনে ঢেউখেলানো অনুচ্চ পাহাড় স্তরে স্তরে সাজানো। সাতশোটি পাহাড় রয়েছে কি না জানা নেই, তবে হয়তো এই জায়গার জন্যই নাম সাতশো পাহাড়ের দেশ।
এই পথেই বিশেষ বিশেষ দিনে আদিবাসী হাট বসে। সন্ধ্যায় একপেট খিদে নিয়ে সেখানেও ঢুঁ মারতে পারেন। মহুয়া দিয়ে খাবার জন্য গ্রামের মহিলা গুলগুলা (আটার তৈরি বড়া) বানিয়ে আনেন। ফুচকা থেকে ঘুগনি, চপ, ছোলার চাট সবই মিলবে এখানে। শহুরে ছোঁয়া লেগেছে হাটেও, তাই রোল, চাউমিনও আর ব্রাত্য নয়। মেঘাতুবুরু এবং কিরিবুরুতে ‘সেল’-এর দু’টি অতিথি নিবাস রয়েছে। চাইলে তার মধ্যে কোনও একটি বুক করে রয়ে যেতে পারেন। অরণ্য ঘেরা কিরিবুরু, মেঘাতুবুরুর রূপ মনভোলানো। না হলে ফিরুন বড়বিলেই।
মুর্গ মহেশ্বর মন্দির সংলগ্ন জলধারা। —নিজস্ব চিত্র।
ভ্রমণসূচি অবশ্য এখানেই শেষ নয়। বড়বিল থেকে জিন্দাল রোড ধরে মোটামুটি ১২ কিলোমিটার গেলে ঠাকুরানি পাহাড়ের পায়ের নীচে জটেশ্বরের মন্দির। মন্দিরের পাশে ঝর্না। পাহাড়ের মাথা থেকে অনবরত জল পড়ে তৈরি হয়েছে ছোট্ট জলাধার। মন্দির শিবের থান। নিত্যপূজা হয়। গা বেয়ে পাহাড়ের উপরে উঠেছে সিঁড়ি। উপরে গুহামুখ বন্ধ পাথরে। তবে সেখানেও যে পুজো হয়, ত্রিশূল, পাথরে লেপা সিঁদুর তার প্রমাণ।
জটেশ্বরের অদূরেই সুবিশাল জলাশয়। তার বিস্তৃতিও নেহাত কম নয়। বড়বিল থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে দেওঝরে রয়েছে মুর্গমহেশ্বর। শিবের মন্দির। এমন নামকরণের হেতু স্পষ্ট না হলেও, এর স্থানমাহাত্ম্য স্থানীয়দের কাছে যথেষ্ট। মন্দিরসংলগ্ন চত্বরে পাহাড়ের উপর থেকে কয়েক হাত অন্তর একই সঙ্গে ঝরে পড়েছে তিনটি জলধারা। স্থানীয়দের কাছে এই জলধারা খুবই পবিত্র। বড়বিলে তিন রাত থাকলেই মোটামুটি ঘোরা সম্ভব। চতুর্থ দিন সকালবেলাই বেরিয়ে পড়ুন কলকাতার উদ্দেশে। সন্ধের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন।
কোথায় থাকবেন?
বড়বিলে একাধিক হোটেল রয়েছে। বিভিন্ন মানের হোটেল মিলবে। তাই থাকার জায়গা পাওয়ার সুযোগ এখানেই বেশি। মেঘাতুবুরু, কিরিবুরুতেও সেলের গেস্টহাউস আছে, তবে থাকার জায়গা সীমিত। থলকোবাদে বনবাংলো মিলবে। আগে থেকে বুকিং করে যেতে হবে।
কী ভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে বড়বিলের দূরত্ব ৩৭২-৪০০ কিলোমিটারের মতো। খড়গপুর-বহরাগোড়া হয়ে একাধিক রাস্তা গিয়েছে। জোডার রাস্তা ধরলে পড়বে ১৬ এবং ৪৯ নম্বর জাতীয় সড়ক। খড়গপুর, ঘাটশিলা, চাইবাসা হয়ে ১৬, ৪৯, ১৮ এবং ২২০ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরেও যেতে পারেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- লক্ষ্মীপুজো যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই হয় তা নয়, দেশের নানা প্রান্তে হয়, তবে পুজোর আচার ভিন্ন। মহারাষ্ট্রে তা লক্ষ্মী পূজন, গুজরাতে আবার চোপড়া পূজন। ওড়িশায় তা-ই গজলক্ষ্মীর আরাধনা। কোন রাজ্যে কেমন ভাবে লক্ষ্মী পুজো হয়?
- উত্তমকুমার নিষ্ঠাভরে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই এই পুজোর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো’। এখনও এই পুজো এ ভাবেই পরিচিত। পুজোর ঐতিহ্য এবং রীতি নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডা দিলেন উত্তম কুমারের ভাইঝি ও নাতনি।
- সময় করে বসে পুজোর জন্য আলপনা দেওয়া এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই, মফস্সলেও। ইদানীং সমাজমাধ্যমের রিলে হাতপাখা থেকে শুরু করে পুরনো শাড়ি, চায়ের টেবিল থেকে ডায়েরির মলাট কিংবা বসার ঘরের মেঝে, সর্বত্র আলপনা দিচ্ছেন হুজুগে মানুষজন।
-
শতবর্ষপ্রাচীন প্রতিমার পুজোর ভোগে ১০ রকমের খাবার! দেবাদৃতার ঘরোয়া লক্ষ্মীপুজো ঠিক কেমন হল
-
ঘরোয়া ভাবে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এ বার লক্ষ্মীপুজো শ্রীলেখার! দেবীর কাছে কোন বিশেষ প্রার্থনা করবেন তিনি?
-
‘মায়ের পছন্দ না হলে আমার হাত দিয়ে অন্য কিছু করান,’ অপরাজিতার বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় এ বার কী কী আয়োজন?
-
কেন জোড়া ইলিশ দেওয়া হয় লক্ষ্মীপুজোয়? তেল-মশলা ছাড়াই বানানো হয় ভোগপ্রসাদ, রন্ধনের নিয়মও আলাদা
-
লক্ষ্মীলাভে কেন পিছিয়ে বাংলা ছবি, কোন পথে আসবে সমৃদ্ধি? কী বলছেন প্রযোজক-পরিচালক-অভিনেতারা